নয়াদিল্লি, ৭ অক্টোবর (আইএএনএস): ভারতের পাইলটের সাহসিকতা নিয়ে যেমন আজ বিশ্বজুড়ে আলোচনা হচ্ছে, তেমনই খুব শীঘ্রই ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ বিমান নিয়েও বিশ্ব কথা বলবে বলে মন্তব্য করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বুধবার নয়াদিল্লিতে ‘বিকশিত ভারত সংকল্প সভা’-য় বক্তব্য রাখতে গিয়ে ফ্লাইদুবাইয়ের ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের সাহসিকতার প্রশংসা করেন তিনি।
৩০ সেপ্টেম্বর বিমানে ছিনতাইয়ের চেষ্টা রুখে দিয়ে ১৭০ জনেরও বেশি যাত্রীর জীবন বাঁচানোর জন্য ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছেন। তাঁর সাহসিকতার প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ যেমন ভারতের পাইলট বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন, তেমনই একদিন ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ বিমান নিয়েও গোটা বিশ্ব আলোচনা করবে।
মোদি বলেন, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বর্তমানেই দূরদর্শী নীতি তৈরি করতে হবে এবং তার বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাতে হবে। দেশের সামনে একাধিক সমস্যা থাকলেও ভারতের ১৪০ কোটি মানুষই সেই সমস্যার সমাধানের শক্তি বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর কথায়, এখন বিশ্রাম নেওয়ার সময় নয়, উৎসাহ ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার এবং দেশের প্রতি নিজেদের উৎসর্গ করার সময়।
দেশের যুবশক্তিকে ভারতের সবচেয়ে বড় সুযোগগুলির একটি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতিহাস ভারতকে যে বিপুল যুবশক্তি দিয়েছে, সেই সুযোগ কোনওভাবেই হাতছাড়া করা উচিত নয়। যুবসমাজের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশকে উন্নয়নের নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে।
তিনি বলেন, বিকশিত ভারত ও আধুনিক ভারত গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় প্রতিটি পদক্ষেপই নেওয়া হচ্ছে। ভারতের যুবসমাজকে স্টার্টআপ থেকে খেলাধুলা—সব ক্ষেত্রেই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলায় ভারতকে বিশ্বপরিচিতি অর্জন করতে হবে। একদিন কোনও ভারতীয়কে চাঁদের মাটিতে পা রাখতে হবে। জেনেটিক্স ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের মতো অত্যাধুনিক ক্ষেত্রে ভারতকে নেতৃত্ব দিতে হবে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর ক্ষেত্রে ভারতকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠতে হবে।
একইসঙ্গে ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় জায়গা করে নেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর লক্ষ্য, বিশ্ব যেন ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ পণ্যের জন্য গর্ববোধ করে এবং ভারতীয় পণ্য কিনতে আগ্রহী হয়। ভারতীয় কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য যেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের খাবারের টেবিলে পৌঁছয়, সেই লক্ষ্যেও এগোতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন, জল ব্যবস্থাপনা কিংবা দরিদ্রদের ক্ষমতায়নের মতো ক্ষেত্রেও বিশ্বের দেশগুলি যেন ভারতের সমাধান গ্রহণ করে—এমন প্রত্যাশা প্রকাশ করেন মোদি। আগামী বছরগুলিতে দেশের সম্মিলিত শক্তি ও মনোযোগ এই লক্ষ্যগুলির দিকে পরিচালিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারত ১৪০ কোটি স্বপ্নের দেশ। দেশের শক্তির কোনও সীমা নেই, মানুষের আকাঙ্ক্ষারও কোনও শেষ নেই। সম্ভাবনার কোনও অভাব নেই, প্রয়োজন শুধু প্রতিটি পদক্ষেপ ও প্রচেষ্টাকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করে এগিয়ে যাওয়া।
স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রসঙ্গ তুলে মোদি বলেন, দেশের মানুষ আত্মত্যাগ করেছিলেন বলেই ভারত স্বাধীনতা অর্জন করেছে। এখন বিকশিত ভারত গড়ে তুলতে প্রত্যেক নাগরিককে দেশের জন্য বাঁচতে হবে।
তিনি বলেন, নাগরিকরা এগিয়ে গেলে দেশও এগিয়ে যাবে। মানুষ নতুন কিছু শিখলে দেশেরও অগ্রগতি হবে। দেশের জন্যই সংকল্প, পরিশ্রম, শক্তি ও নিষ্ঠা উৎসর্গ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ভারতীয়রা উদ্ভাবন করলে তা দেশের জন্য, গবেষণা করলে দেশের জন্য এবং নতুন কিছু সৃষ্টি করলেও দেশের জন্য—এই ভাবনাই বিকশিত ভারতের ভিত্তি হওয়া উচিত।
একই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, শেখার আগ্রহ তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এখনও নিজেকে একজন ছাত্র হিসেবেই মনে করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, যত বেশি তিনি শিখবেন, দেশের জন্য কিছু করার সক্ষমতাও তত বাড়বে।
নিজের স্কুলজীবনের কথা স্মরণ করে মোদি বলেন, গুজরাটের ভাদনগরে স্কুলে পড়ার সময় বিভিন্নভাবে শিক্ষকেরা তাঁদের শিক্ষা দিতেন এবং তিনি সবসময় প্রথম সারিতে থাকা ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন। সেই সময় থেকেই শেখার প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়, যা আজও অব্যাহত রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করেন তিনি। এ কারণেই ওই দিন মন্দিরে প্রার্থনা করার সময় নিজের জন্যও একটি প্রার্থনা করেছেন—যেন তাঁর শেখার ক্ষমতা কখনও কমে না যায়। তাঁর মতে, যত বেশি শেখা সম্ভব হবে, তত বেশি দেশের জন্য কাজ করার সামর্থ্য তৈরি হবে।
নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর মনে এখন কেবল কৃতজ্ঞতার অনুভূতি রয়েছে। জীবনের প্রতিটি মানুষ এবং প্রতিটি ঘটনা তাঁকে কোনও না কোনও শিক্ষা দিয়েছে। যারা তাঁকে জিততে সাহায্য করেছেন, তাঁরা তাঁকে বিনয়ী থাকতে শিখিয়েছেন। যারা তাঁকে পিছনে ফেলেছেন, তাঁরা আবার উঠে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিয়েছেন। শুভাকাঙ্ক্ষীরা উৎসাহ দিয়েছেন এবং সমালোচকরা আত্মসমালোচনার সুযোগ করে দিয়েছেন।
যারা তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁরা তাঁকে আস্থার শক্তি বুঝিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন মোদি। অন্যদিকে, যারা তাঁর বিরোধিতা করেছেন, তাঁদের কাছ থেকে গণতন্ত্রের শক্তি সম্পর্কে শিক্ষা পেয়েছেন বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, জীবনের প্রতিটি সংকট তাঁর ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়েছে, প্রতিটি সাফল্য দেশের প্রতি তাঁর দায়িত্ববোধ আরও গভীর করেছে এবং প্রতিটি অর্জন তাঁকে আরও বড় লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস ও সংকল্প দিয়েছে। তাঁর কথায়, জীবনের কোনও ঘটনাই বৃথা যায়নি; প্রতিটি ঘটনাই তাঁকে কিছু না কিছু শিখিয়েছে।
মোরবি বন্যার অভিজ্ঞতা তাঁকে দিন-রাত ত্রাণ ও সেবামূলক কাজে যুক্ত থাকার পথ দেখিয়েছিল বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। ভুজ ভূমিকম্প তাঁকে পুনর্গঠনের কাজে অবিচল থাকার শিক্ষা দিয়েছে। চন্দ্রযান তাঁকে ব্যর্থতার পর আবার উঠে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিয়েছে এবং কোভিড-১৯ মহামারি তাঁকে দেশের সম্মিলিত চেতনার গুরুত্ব বুঝিয়েছে।
মিডিয়ার ভূমিকাও তুলে ধরে মোদি বলেন, তিক্ত ও মধুর—দুই ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই সংবাদমাধ্যম তাঁকে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়েছে। জীবনের প্রতিটি যাত্রা তাঁকে নীতি প্রণয়নে সংবেদনশীলতা আনার পথ দেখিয়েছে বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি গ্রাম এবং দেশের প্রতিটি দরিদ্র মানুষ তাঁকে শিখিয়েছেন যে সম্পদ সীমিত হতে পারে, কিন্তু স্বপ্ন বড় হওয়া উচিত এবং সংকল্প দৃঢ় হওয়া দরকার।
দেশবাসীর আস্থা ও তাঁদের পরিশ্রমকে নিজের “সবচেয়ে বড় শক্তি” বলে উল্লেখ করেন মোদি। তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি নাগরিকের তাঁর ওপর সবচেয়ে বেশি অধিকার রয়েছে। পরপর ২৫ বছর তাঁকে দেশের মানুষের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্যও তিনি কৃতজ্ঞতা জানান।
মোদি বলেন, ২৫ বছরের জনআস্থা এবং এই দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। তবে এই সম্পদ শুধু তাঁর নয়, দেশের। ভারতের প্রতিটি নাগরিকই এই সম্পদের অংশীদার। —আইএএনএস



















