নয়াদিল্লি, ৭ অক্টোবর (আইএএনএস): এশিয়ান গেমসে ৬৫ কেজি ফ্রিস্টাইল কুস্তিতে সোনা জয়ের পর ওজন কমানোর কঠোর ডায়েট থেকে কিছুটা মুক্তি পেয়েই হরিয়ানার খাঁটি দেশি স্বাদে মজেছেন ভারতীয় কুস্তিগীর সুজিত কালকাল। জাপান থেকে দেশে ফেরার পর মায়ের তৈরি চুরমা ও ক্ষীরই সবচেয়ে বেশি খেয়েছেন বলে জানিয়েছেন ২৩ বছর বয়সী এই এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন।
এশিয়ান গেমসে সুজিতের সোনা ভারতের কুস্তিতে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটায়। ২০১৮ সালের জাকার্তা এশিয়ান গেমসে বজরং পুনিয়া ও ভিনেশ ফোগাটের পর এশিয়ান গেমসে ভারতের হয়ে কুস্তিতে সোনা জিতলেন সুজিত। ৬৫ কেজি ফ্রিস্টাইলের ফাইনালে তাজিকিস্তানের আবদুলমাজিদ কুদিয়েভের বিরুদ্ধে এক সময় ২-৯ পিছিয়ে পড়েও দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে ১০-৯ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নেন তিনি।
বুধবার স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়া বা সাই-এর আয়োজিত এক সাংবাদিক বৈঠকে প্রথম ‘চিট মিল’ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে সুজিত বলেন, বাড়ি থেকে দূরে থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার কারণে তিনি মায়ের তৈরি চুরমা খুব মিস করেন। হরিয়ানার চরখি দাদরি জেলার বাসিন্দা সুজিত বর্তমানে সাই সোনেপতে প্রশিক্ষণ নেন।
সুজিত বলেন, “আমি বাড়ি ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই মা আমার জন্য চুরমা ও ক্ষীর পাঠিয়েছিলেন। আমি সোনেপতে বাড়ি থেকে দূরে প্রশিক্ষণ নিই, তাই মা মাঝেমধ্যেই এগুলো পাঠান। জাপান থেকে ফেরার পর সবচেয়ে বেশি চুরমা ও ক্ষীরই খেয়েছি। ভারতেও আমি চুরমা মিস করি, কারণ মায়ের সঙ্গে থাকি না এবং প্রশিক্ষণের জন্য বাড়ি থেকে দূরে থাকতে হয়।”
২০২৬ সালে এখনও পর্যন্ত অপরাজিত রয়েছেন সুজিত। এশিয়ান গেমসের আগে ২০২৫ সালের অনূর্ধ্ব-২৩ বিশ্ব কুস্তি চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ২০২৬ সালের এশিয়ান কুস্তি চ্যাম্পিয়নশিপে ৬৫ কেজি বিভাগে সোনা জিতেছিলেন তিনি। এছাড়া ফেব্রুয়ারিতে আলবেনিয়ায় অনুষ্ঠিত ইউডব্লিউডব্লিউ র্যাঙ্কিং সিরিজেও সোনা জেতেন এই ভারতীয় কুস্তিগীর।
তবে তাঁর এই সাফল্যের পথ মোটেই সহজ ছিল না। ২০২৩ সালে এশিয়ান গেমসের দলে জায়গা পাওয়ার জন্য ন্যায্য ট্রায়ালের দাবিতে তাঁকে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল। সেই সময় ভারতীয় কুস্তির দায়িত্বে থাকা অ্যাডহক কমিটি বজরং পুনিয়াকে সরাসরি দলে জায়গা দিয়েছিল। নিজের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে আদালতের পথ বেছে নিতে হয় সুজিতকে।
এর পর ২০২৪ সালের এপ্রিলেও বড় ধাক্কা আসে। সহকুস্তিগীর দীপক পুনিয়ার সঙ্গে অলিম্পিক কোয়ালিফায়ারে অংশ নিতে বিশকেক যাওয়ার পথে সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে প্রবল বৃষ্টি ও বন্যার কারণে বিমান চলাচল ব্যাহত হয়। দু’জনই দুবাইয়ে আটকে পড়েন। শেষ পর্যন্ত তাঁরা বিশকেকে পৌঁছন, কিন্তু ততক্ষণে সকালের ওজন মাপার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। ফলে আয়োজকদের নিয়ম অনুযায়ী তাঁদের প্রতিযোগিতায় নামার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
এইসব তিক্ত অভিজ্ঞতার দিকে ফিরে তাকিয়ে ২০২৩ সালের সেই সুজিতকে কী বার্তা দেবেন, যিনি নিজের অধিকারের জন্য আদালতে লড়াই করেছিলেন—এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে এবং কঠোর পরিশ্রম চালিয়ে যেতে হবে। ঈশ্বর ন্যায়বিচারে দেরি করতে পারেন, কিন্তু তা কখনও অস্বীকার করেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। অতীত আঁকড়ে থাকলে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে তিনি জানান।
সুজিত বলেন, তিনি অতীত নিয়ে বেশি ভাবেন না। বিশকেশের সেই ঘটনা তাঁর কাছে একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো ছিল। বন্যা এসে যাওয়ার পর সেখানে তাঁদের কিছু করার ছিল না। তাই তাঁর কাজ ছিল চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। একইভাবে এশিয়ান গেমসের ফাইনালেও ২-৯ পিছিয়ে পড়ার পর শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যাওয়াকেই তিনি নিজের দায়িত্ব মনে করেছিলেন।
তিনি বলেন, “ফাইনালে পিছিয়ে থাকলেও আমার কাজ ছিল শেষ পর্যন্ত লড়াই করা। নিজের মধ্যে যতটা শক্তি ছিল, সবটা দিয়ে লড়েছি এবং দেশের জন্য সোনা জিতেছি।”
এশিয়ান গেমসের সাফল্যের পরও অবশ্য বিশ্রামের সুযোগ খুব বেশি পাচ্ছেন না সুজিত। চলতি মাসের ২৪ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত কাজাখস্তানের আস্তানায় অনুষ্ঠিত হবে বিশ্ব কুস্তি চ্যাম্পিয়নশিপ। সেখানে ৬৫ কেজি বিভাগে আরও একটি সোনা জেতাই এখন তাঁর লক্ষ্য।
বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের প্রস্তুতি নিয়ে সুজিত বলেন, এই প্রতিযোগিতা এশিয়ান গেমসের তুলনায় আরও কঠিন এবং এমনকি অলিম্পিকের থেকেও কঠিন হতে পারে। কোনও নির্দিষ্ট প্রস্তুতি পরিকল্পনা না করে আগের প্রতিযোগিতাগুলিতে যে ভুলগুলি হয়েছে, সেগুলি শুধরে নেওয়ার ওপরই জোর দিচ্ছেন তিনি।
এশিয়ান গেমসের সোনা জয়ের পর দীপাবলি কীভাবে কাটাবেন—এই প্রশ্নেরও নিজের মতো করে উত্তর দিয়েছেন সুজিত। তাঁর কাছে দেশের হয়ে সোনা জেতাই দীপাবলি।
সুজিত বলেন, “দেশের জন্য এশিয়ান গেমসে সোনা জেতাই আমার কাছে দীপাবলি। এখনও পর্যন্ত হোলি বা দীপাবলিতে বাড়িতে থাকতে পারিনি, কারণ সবসময় কোনও না কোনও প্রতিযোগিতা থাকে। বাবা বলেন, তুমি যদি সোনা নিয়ে বাড়ি ফেরো, সেটাই দীপাবলি এবং হোলি। এবারও দীপাবলির সময় একটি প্রতিযোগিতা রয়েছে। যদি সোনা জিততে পারি, সেটাই আমার দীপাবলি হবে।”
এশিয়ান গেমসের ফাইনালে নিজের নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের কথাও জানান সুজিত। প্রথম পর্বে তিনি ২-৯ পিছিয়ে ছিলেন। ম্যাচের শেষ দিকে মাত্র এক মিনিট ৪০ সেকেন্ড বাকি থাকতে তিনি ব্যবধান কমিয়ে ৮-৯ করেন। এরপর আরও দুই পয়েন্টের টেকডাউনে এগিয়ে গিয়ে ১০-৯ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেন।
নিজের লড়াই সম্পর্কে সুজিত জানান, ফাইনালের শুরুতে তিনি ঠিকমতো ওয়ার্ম-আপ করতে পারেননি। ফলে শুরুতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে ছিল না। দ্বিতীয় পর্বে প্রতিপক্ষের ওপর ভালো গ্রিপ তৈরি করার পর তাঁর প্রতিটি আক্রমণ সফল হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে সোনা জয় করেন।
বিদেশে প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। এশিয়ান গেমস ও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের প্রস্তুতির জন্য রাশিয়া ও আর্মেনিয়ায় প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছিলেন সুজিত। সেখানে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ, এশিয়ান গেমস এবং অলিম্পিক পদকজয়ী কুস্তিগীরদের সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার সুযোগ তাঁর প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।
সুজিত টিওপিএস, সাই এবং ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনকে বিদেশে প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান। তাঁর মতে, পদক জয়ের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাশিয়ায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, এশিয়ান গেমস ও অলিম্পিক পদকজয়ীদের সঙ্গে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেক কিছু শেখার সুযোগ হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এশিয়ান গেমসের সাফল্যের পর মায়ের চুরমা-ক্ষীরের স্বাদ থেকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের সোনার লক্ষ্যে—সুজিত কালকালের সামনে এখন নতুন চ্যালেঞ্জ। তবে অতীতের হতাশাকে পিছনে ফেলে আত্মবিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম এবং দেশের জন্য সাফল্য অর্জনের সংকল্প নিয়েই এগিয়ে চলেছেন এই তরুণ ভারতীয় কুস্তিগীর।



















