নয়াদিল্লি, ৬ অক্টোবর (আইএএনএস): মাদক পাচারের বিরুদ্ধে ভারতীয় সংস্থাগুলির লড়াই অব্যাহত থাকলেও মিয়ানমার থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে মাদক পাচার ক্রমেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার আধিকারিকদের মতে, মিয়ানমারের মাদক কার্টেলগুলি উত্তর-পূর্বের অশান্তি ও সংঘাতকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের নেটওয়ার্ক আরও বিস্তৃত করছে।
কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদি সরকারের মাদকমুক্ত ভারত গড়ার প্রচেষ্টায় পাকিস্তান থেকে পরিচালিত মাদক কার্টেলগুলি ক্রমাগত চাপে রয়েছে। দাউদ ইব্রাহিম ও হাজি সালিমের মতো অপারেটরদের সঙ্গে যুক্ত একাধিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়াতেও সাফল্য এসেছে। তবে উত্তর-পূর্ব ভারতের দুর্গম ভূখণ্ড ও সীমান্তের একাধিক অংশে নজরদারির জটিলতার কারণে এই অঞ্চল এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
এক আধিকারিকের মতে, মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের সীমান্তই বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা। তালিবান শাসনে আফগানিস্তানে আফিম চাষ নিষিদ্ধ হওয়ার পর মিয়ানমারভিত্তিক কার্টেলগুলির জন্য পরিস্থিতি আরও অনুকূল হয়েছে। তাঁর দাবি, মিয়ানমার বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পরিমাণে আফিম উৎপাদনকারী দেশগুলির মধ্যে রয়েছে। ২০২৫ সালে সেখানে আফিম চাষের এলাকা বেড়ে ৫৩,১০০ হেক্টরে পৌঁছেছিল।
মাদক পাচার রুখতে নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো (এনসিবি) এবং অসম রাইফেলস যৌথভাবে কাজ করছে। গত দুই-তিন বছরে তাদের অভিযানে একাধিক বড় মাদক চালান ধরা পড়েছে। ভারত ও মিয়ানমারও মাদক পাচার বন্ধে একাধিক দফায় আলোচনা করেছে এবং একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। তবে মিয়ানমারে মাদক কার্টেলগুলির ব্যাপক বিস্তারের কারণে সমস্যার সমাধান সময়সাপেক্ষ হবে বলে মনে করছেন আধিকারিকরা।
এক আধিকারিকের দাবি, মিয়ানমারের মাদক কার্টেলগুলির আর্থিক ক্ষমতা বিপুল। তাদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ কোনও কোনও সরকারের সম্পদের চেয়েও বেশি হতে পারে। ফলে একাধিক চালান ধরা পড়লেও বিপুল অর্থের জোরে তারা দ্রুত নতুন সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।
ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর এক আধিকারিকের মতে, মিয়ানমারের মাদক কার্টেলগুলি বিশেষ করে মণিপুর-সহ উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলির সংঘাত ও অশান্তিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। অশান্ত পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা সংস্থাগুলি হিংসা নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত থাকায় মাদক কারবারিরা সেই সুযোগে বড় পরিমাণে মাদকের চালান উত্তর-পূর্ব ভারতে ঢোকায় বলে দাবি তাঁর।
২০২৫ সালে মিয়ানমার থেকে উদ্ভূত মাদক কারবারের মাত্রাকে ‘নাটকীয়’ বলে উল্লেখ করেছিল এনসিবি। ২০২৬ সালের মার্চে কেন্দ্র লোকসভায় জানায়, উত্তর-পূর্বের একাধিক রাজ্যে মাদক বাজেয়াপ্তের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অসমে ৩১,৭০৬ কেজি এবং ত্রিপুরায় ৪৬,৩৪৬ কেজি মাদক বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। মিজোরামে ২০২৪ সালে ১,৯৬৭ কেজি থেকে ২০২৫ সালে তা বেড়ে ২,২৩৩ কেজি হয়েছে বলে জানানো হয়।
আধিকারিকদের মতে, বিপুল পরিমাণ মাদক বাজেয়াপ্ত হলেও সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। গোয়েন্দা রিপোর্টে ২০২৬ সালে মিয়ানমারের কার্টেলগুলি উৎপাদন প্রায় তিনগুণ বাড়িয়েছে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
মিয়ানমারের কার্টেলগুলি শুধু আফিম নয়, বিপুল পরিমাণ সিন্থেটিক মাদকও তৈরি করছে। বিশেষ করে মেথামফেটামিন বড় পরিমাণে ভারতে পাচার হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আধিকারিকরা। দেশের অভ্যন্তরে এই মাদকের চাহিদাও পাচারকারীদের উৎসাহিত করছে।
মোরে-তামু সীমান্ত মাদক কার্টেলগুলির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট। পাশাপাশি ভারত-মিয়ানমার সীমান্তের বিস্তীর্ণ অংশের ভঙ্গুর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, জঙ্গল ও পাহাড়ি ভূখণ্ডের কারণে ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলির অভিযানও অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।



















