নয়াদিল্লি/আহমেদাবাদ, ১ অক্টোবর (আইএএনএস): দুবাই থেকে তেল আভিভগামী ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ বিমানের ককপিটে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও অসীম সাহস ও উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে ১৭৪ জন যাত্রীর প্রাণ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরকে প্রশংসায় ভাসালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র পটেল। উড্ডয়নের সময় ককপিটে সহ-পাইলটের সঙ্গে হিংসাত্মক সংঘর্ষে গুরুতর আহত হওয়ার পরও মচ্ছর বিমানটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরে বিমানটি সৌদি আরবের তাবুকে জরুরি অবতরণ করে।
গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র পটেল বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরের সাহসিকতার প্রশংসা করে বলেন, গুজরাট এবং গোটা দেশ তাঁর জন্য অত্যন্ত গর্বিত। গুরুতর আহত অবস্থাতেও আক্রমণকারীর বিরুদ্ধে লড়াই করে তিনি একটি বড় দুর্ঘটনা এড়াতে সাহায্য করেছেন এবং ১৭৪ জন যাত্রীর জীবন রক্ষা করেছেন বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।
ভূপেন্দ্র পটেল বলেন, “তিনি একজন গর্বিত ভারতীয় এবং তাঁর শিরায় গুজরাটি রক্ত বইছে—তিনি আমাদের দৃঢ়তা ও সাহসের প্রকৃত প্রতিফলন।” গুজরাটি বংশোদ্ভূত এই সাহসী সন্তান আন্তর্জাতিক মঞ্চে গোটা দেশকে গর্বিত করেছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে মচ্ছরের অসাধারণ সাহসিকতাকে স্যালুট জানিয়ে তাঁর দ্রুত ও সম্পূর্ণ সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করেন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও ক্যাপ্টেন মচ্ছরকে ‘হিরো’ হিসেবে অভিহিত করে তাঁর সাহস ও দৃঢ়তার প্রশংসা করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভয়াবহ বিপদের মুখে এবং গুরুতর আহত হওয়া সত্ত্বেও মচ্ছর অন্যদের জীবন রক্ষা করতে অসীম সাহস ও অটুট সংকল্প দেখিয়েছেন। তাঁর সাহসিকতার কারণে শতাধিক মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে এবং একটি বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে জানান মোদী। তিনি ক্যাপ্টেন মচ্ছরের দ্রুত সুস্থতা, নতুন শক্তি ও সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রার্থনা করেন।
ঘটনাটি ঘটে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দেওয়া ফ্লাইদুবাইয়ের বোয়িং ৭৩৭ বিমানে। বিমানে ১৭০-এরও বেশি যাত্রী ছিলেন। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উড্ডয়নের পর ককপিটে ক্যাপ্টেন মচ্ছর ও তাঁর সহ-পাইলটের মধ্যে হিংসাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অভিযোগ, সহ-পাইলট মচ্ছরকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন এবং বিমানের নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেন।
এই সংঘর্ষের সময় বিমানটির উচ্চতা দ্রুত কমে যায় বলে জানা গেছে। গুরুতর আহত অবস্থাতেও মচ্ছর ককপিটের দরজা খুলে দেন, যাতে একজন ক্রু সদস্য এবং কয়েকজন যাত্রী ভিতরে প্রবেশ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেন এবং অন্য পাইলটকে আটকে রাখা সম্ভব হয়। এরপর বিমানটির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা হয়।
পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পর বিমানটি গন্তব্য ইসরায়েলের দিকে না গিয়ে সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবুকের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করে। যাত্রীদের সবাই নিরাপদে রয়েছেন বলে জানানো হয়। দুই পাইলটকেই চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। পরে রিয়াদে ভারতীয় দূতাবাস জানায়, ক্যাপ্টেন মচ্ছরের অবস্থা স্থিতিশীল।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও ক্যাপ্টেন মচ্ছরের সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন। ককপিটের সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে মচ্ছর, যাত্রী এবং ক্রু সদস্যরা যে ভূমিকা পালন করেছেন, তারও প্রশংসা করা হয়। তবে ঘটনার সঠিক কারণ, সহ-পাইলটের হামলার উদ্দেশ্য এবং ককপিটের ভিতরে ঠিক কীভাবে ঘটনাগুলি ঘটেছিল, তা এখনও তদন্তাধীন। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনও ধরনের জল্পনা না করার জন্য ফ্লাইদুবাইয়ের পক্ষ থেকেও সতর্ক করা হয়েছে।
ঘটনার পর ইসরায়েলগামী এবং ইসরায়েল থেকে পরিচালিত ফ্লাইদুবাইয়ের বিমান পরিষেবা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার কথা জানিয়েছে বিমান সংস্থাটি। জরুরি অবতরণের পর যাত্রীদের পরবর্তী পর্যায়ে ইসরায়েলে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরের পেশাগত জীবনও দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। তাঁর পেশাগত প্রোফাইল অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুনে ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেওয়ার আগে তিনি এক দশকেরও বেশি সময় ভারতের কম খরচের বিমান সংস্থা স্পাইসজেটে কাজ করেছেন। ২০১১ সালে স্পাইসজেটে যোগ দিয়ে তিনি লাইন-ট্রেনিং ক্যাপ্টেন এবং সিনিয়র কমান্ডারসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। ২০২২ সালে তিনি ফ্লাইদুবাইয়ে ডাইরেক্ট-এন্ট্রি ক্যাপ্টেন হিসেবে যোগ দেন।
পেশাগত জীবনে তাঁর ১৩ বছরেরও বেশি বাণিজ্যিক বিমান চালানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং বোয়িং ৭৩৭ বিমানে প্রায় ১০ হাজার ঘণ্টা উড্ডয়নের অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে বিভিন্ন পেশাগত তথ্যসূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁর বিমান চালানোর পেশায় আসার গল্পও বেশ উল্লেখযোগ্য। পরিবারের টেক্সটাইল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত পড়াশোনা দিয়ে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হলেও পরে বিমান চালানোর প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। একটি ম্যানেজমেন্ট কোর্স চলাকালীন বিমান চলাচল সংক্রান্ত একটি সেমিনারে অংশ নেওয়ার পর তিনি উড্ডয়ন পেশার প্রতি আকৃষ্ট হন বলে এক পডকাস্টে জানিয়েছিলেন। এরপর তিনি নিউজিল্যান্ডে পাইলট প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় ১৬-১৭ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল বলেও তিনি জানিয়েছিলেন। শুরুতে তাঁর মা বিমান চালানোর পেশা বেছে নেওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন, যদিও তাঁর বাবা সিদ্ধান্তটিকে তুলনামূলকভাবে সমর্থন করেছিলেন।
ফ্লাইদুবাই জানিয়েছে, এফজেড১০৭৩ বিমানের ফ্লাইট ডেকে একটি ঘটনা ঘটেছিল এবং সেই কারণেই বিমানটিকে তাবুকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। নিরাপদে অবতরণের পর ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনার বিভিন্ন দিক নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে বিমান সংস্থাটি।
এদিকে গুরুতর আহত হয়েও বিপদের মুহূর্তে যাত্রীদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য ক্যাপ্টেন মচ্ছরের প্রশংসায় সরব হয়েছে ভারত। প্রধানমন্ত্রী মোদী থেকে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী পটেল—দু’জনেই তাঁর সাহসিকতাকে ভারতের গর্ব হিসেবে তুলে ধরেছেন। ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে তাঁর ভূমিকার ফলে একটি সম্ভাব্য বড় বিমান দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য।



















