গুয়াহাটি, ১১ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গঠিত বিধিবদ্ধ তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশে বিলম্বের অভিযোগ তুলে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের হস্তক্ষেপ চাইলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া ও গবেষকরা। তদন্তের ফলাফল প্রকাশ্যে আনা এবং গোটা বিষয়টির স্বচ্ছ ও সময়বদ্ধ নিষ্পত্তির দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
পড়ুয়া ও গবেষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের কাছে একটি প্রতিনিধিত্বপত্র জমা দিয়ে সেটি কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের সচিব এবং উচ্চশিক্ষা দফতরের অতিরিক্ত সচিবের কাছে পাঠানোর অনুরোধ করেছেন। তাঁদের দাবি, তদন্ত রিপোর্ট এবং তার ভিত্তিতে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে দ্রুত স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করতে হবে।
তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৯৩-এর ৯ নম্বর ধারার অধীনে এই বিধিবদ্ধ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক শম্ভু নাথ সিংয়ের কার্যকাল-সহ একাধিক বিষয় তদন্তের আওতায় ছিল। পড়ুয়ারা তাঁদের প্রতিনিধিত্বপত্রে প্রাক্তন উপাচার্যকে ‘পলাতক’ বলেও উল্লেখ করেছেন।
প্রতিনিধিত্বপত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং ২০২৬ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা ছিল। পড়ুয়াদের দাবি, কমিটি ইতিমধ্যেই তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রিপোর্ট জমা দিয়েছে। কিন্তু সেই রিপোর্টের ফলাফল এবং তার ভিত্তিতে নেওয়া কোনও সিদ্ধান্ত এখনও প্রকাশ্যে আনা হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ, অর্থের ঘাটতি, দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা এবং ২০২৫ সালের স্নাতক ব্যাচের সমাবর্তন অনুষ্ঠান নিয়ে বিলম্বের মতো একাধিক অমীমাংসিত বিষয়ও তাঁরা তুলে ধরেছেন।
পড়ুয়াদের প্রশ্ন, দুর্নীতির অভিযোগ তুলে যারা বিষয়গুলি সামনে এনেছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবেই কি এই সমস্যাগুলির নিষ্পত্তিতে এত দীর্ঘসূত্রিতা করা হচ্ছে? তাঁরা তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ, প্রাক্তন উপাচার্যের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা স্পষ্ট করা, অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায় নির্ধারণ, বকেয়া অর্থ ছাড় এবং ২০২৫ সালের সমাবর্তন নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তের দাবি জানিয়েছেন।
এছাড়াও কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের কাছ থেকে লিখিতভাবে তাঁদের প্রতিনিধিত্বপত্র গ্রহণের স্বীকৃতি এবং দাবিগুলির বিষয়ে উত্তর চেয়েছেন পড়ুয়ারা। তাঁদের অভিযোগের সন্তোষজনক সমাধান না হলে আন্দোলন আরও তীব্র করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা। প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার মতো কর্মসূচিও নেওয়া হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
পড়ুয়ারা আরও জানিয়েছেন, তাঁদের অভিযোগের যথাযথ সমাধান না হলে বিভিন্ন তথ্য অনুসন্ধান ও তদন্ত কমিটির সামনে জমা দেওয়া নথি এবং প্রমাণাদি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে পারেন সংশ্লিষ্ট অংশীদাররা।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত একটি নাগরিক সম্মেলনের কথাও প্রতিনিধিত্বপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে শিক্ষাবিদ, তথ্য জানার অধিকার আন্দোলনের কর্মী, মানবাধিকারকর্মী, অবসরপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্টের বিচারপতিদের নিয়ে একটি স্বাধীন জন-তদন্ত কমিটি গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল বলে পড়ুয়ারা জানান।
তাঁদের বক্তব্য, এই দাবিগুলির মূল উদ্দেশ্য হল তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে স্বচ্ছতা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং সংশ্লিষ্ট সকলের আস্থা পুনরুদ্ধার করা।
তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা প্রশাসনিক সংকট এবং তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক শম্ভু নাথ সিংয়ের বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই বিধিবদ্ধ তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম, প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভেঙে পড়া, শিক্ষাক্ষেত্রে সমস্যা এবং দীর্ঘদিন ক্যাম্পাসে অনুপস্থিত থাকার মতো অভিযোগ উঠেছিল।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া ও শিক্ষকদের প্রতিবাদ ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় সরকার বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করে। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রক তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। একইসঙ্গে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তৎকালীন উপাচার্যকে ছুটিতে যেতে এবং সমস্ত দায়িত্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
মণিপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এন. লোকেন্দ্র সিংকে প্রধান করে গঠিত ওই কমিটিতে নাগাল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক জগদীশ কুমার পট্টনায়ক এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সচিব অধ্যাপক মনীশ আর. যোশী সদস্য ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান পরিস্থিতি এবং উপাচার্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ-সহ সংশ্লিষ্ট সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয় কমিটিকে।
এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য তথা অসমের রাজ্যপালের নির্দেশে একটি প্রাথমিক তথ্য অনুসন্ধানও করা হয়েছিল।



















