নিউইয়র্ক, ২৮ আগস্ট (আইএএনএস): কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ক্ষেত্রে ভারত খুব একটা অগ্রগতি করতে পারেনি বলে মন্তব্য করেছেন কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা সাম পিত্রোদা। তাঁর মতে, ভারতীয় প্রযুক্তিবিদরা বিশ্বজুড়ে এআই শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও একটি দেশ হিসেবে এআই নিয়ে ভারতের নীতি, দিশা এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে এখনও বড় ঘাটতি রয়েছে।
আইএএনএস-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে পিত্রোদা বলেন, “এআই-এর ক্ষেত্রে ভারত খারাপ অবস্থানে রয়েছে। এটা বলতে আমার খারাপ লাগছে। ভারতীয়রা এআই-এর ক্ষেত্রে ভালো অবস্থানে রয়েছেন। এই দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।”
তিনি বলেন, “এআই-কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক ভারতীয় মেধা কাজ করছে। কিন্তু একটি দেশ হিসেবে আমরা খুব সামান্যই অগ্রগতি করেছি। এআই নিয়ে আমাদের কোনও নীতি নেই, কোনও নির্দিষ্ট দিশা নেই। প্রশাসনিক ব্যবস্থায়ও আমরা এআই ব্যবহার করতে পারিনি।”
ভারতের টেলিকম ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা পিত্রোদার মতে, এআই-এর ক্ষেত্রে ভারতের অগ্রগতি বিচার করা উচিত সাধারণ মানুষের সমস্যার সমাধানে এই প্রযুক্তি কতটা কাজে লাগছে, তার ভিত্তিতে।
দেশের বিপুল সংখ্যক বিচারাধীন মামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এআই ব্যবহার করে যদি আদালতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা মামলাগুলির দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়, সেটিই হবে প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার। তাঁর কথায়, “আমি কি এআই ব্যবহার করে আমার আদালতের মামলাগুলি নিষ্পত্তি করতে পারি? শেষ করতে পারি? আদালতের মামলাগুলি মেটাতে এআই নিয়ে একটি বিশেষ প্রযুক্তি মিশন নেওয়া যায় কি? সেটা করতে পারলে আমি খুব খুশি হব।”
শুধু আর্থিক বাজার, ব্যাঙ্কিং বা পশ্চিমা দেশগুলির সমস্যার সমাধানে এআই ব্যবহারের পরিবর্তে ভারতের নিজস্ব সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পিত্রোদা বলেন, “এআই কীভাবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি করবে? কীভাবে স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতি করবে? এআই কি স্বাস্থ্য পরিষেবার খরচ কমাতে পারে? আমাদের কৃষকদের জন্য এআই কীভাবে সহায়ক হতে পারে? এগুলিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।”
ভারতের জন্য তৈরি প্রযুক্তির বিশ্বব্যাপী প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও তা নাকচ করে দেন পিত্রোদা। তাঁর মতে, ভারতের সমস্যার সমাধানের জন্য তৈরি প্রযুক্তি একই ধরনের সমস্যায় থাকা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলিরও কাজে আসতে পারে।
তিনি বলেন, “ভারতের জন্য তৈরি করলে তা বিশ্বের জন্যও তৈরি হয়ে যায়। আজ প্রতিটি পণ্যই বৈশ্বিক পণ্য। বিষয়টি নির্ভর করে আপনি কোন সমস্যার সমাধান করতে চাইছেন তার ওপর।”
ভারতের বিচারব্যবস্থায় বিপুল মামলাজটের পাশাপাশি লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে দেশীয় প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ওপর জোর দেন পিত্রোদা।
নিজের আগের কাজের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “আমি অবশ্যই দেশীয় প্রযুক্তির উন্নয়নের পক্ষে। আমরা সি-ডট-এ তা করেছি। ৪৫ বছর আগেই আমরা এই কাজ শুরু করেছিলাম।”
তাঁর মতে, সেই সময় দেশীয় প্রযুক্তির উন্নয়নের উদ্যোগ দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে সহায়তা করেছিল, যা পরবর্তীকালে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
পিত্রোদা বলেন, “আমরা মানবসম্পদ তৈরি করেছিলাম। সেই মানবসম্পদই আজ আমাদের কাজে এসেছে। তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে ৭০ লক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে, অন্তত ৭০ লক্ষ পরিবার তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে ভারতের স্বীকৃতি এসেছে। এর পেছনে রয়েছে ভারতের মানবসম্পদ।”
ধনী দেশগুলির বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক সমস্যার পরিবর্তে দরিদ্র দেশগুলির বাস্তব সমস্যার সমাধানে ভারতের দক্ষ প্রযুক্তিবিদদের কাজে লাগানোর পক্ষেও সওয়াল করেন তিনি।
পিত্রোদা বলেন, “আমাদের দরিদ্র মানুষের সমস্যার সমাধান করতে হবে। গত ৪০ বছর ধরে আমি বলে আসছি, বিশ্বের সেরা মেধাবীরা ধনী মানুষের সমস্যার সমাধানে ব্যস্ত, যাঁদের অনেক সমস্যাই আসলে সমাধানের প্রয়োজন নেই। ফলে দরিদ্র মানুষের সমস্যাগুলি প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায় না।”
টেলিকম ইঞ্জিনিয়ার ও নীতিনির্ধারক হিসেবে পরিচিত সাম পিত্রোদা ভারতের টেলিকম উন্নয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর আমলে সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অব টেলিম্যাটিক্স বা সি-ডট প্রতিষ্ঠা এবং দেশের সরকারি টেলিকম পরিষেবার সম্প্রসারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের আমলে তিনি ন্যাশনাল নলেজ কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কংগ্রেসের নেতাদের প্রযুক্তি ও জননীতি সংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে আসছেন পিত্রোদা। টেলিকম, ডিজিটাল পরিকাঠামো, জ্ঞানব্যবস্থা এবং উন্নয়নের জন্য প্রযুক্তির ব্যবহারের মতো বিষয় তাঁর কাজের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র।



















