নয়াদিল্লি, ২৫ আগস্ট (আইএএনএস): বর্ষাকালীন অধিবেশনে বারবার সংসদের কার্যক্রম ব্যাহত করার অভিযোগে মঙ্গলবার বিরোধীদের তীব্র আক্রমণ করলেন কেন্দ্রীয় সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু। তিনি বলেন, সংবিধান বিরোধীদের সরকারকে প্রশ্ন করার অধিকার দিয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক দাবি পূরণ না হলে বারবার সংসদের কার্যক্রম অচল করে দেওয়ার ক্ষমতা দেয়নি।
‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে রিজিজু বলেন, সংসদ কোনও রাজনৈতিক দলের নয়, এটি ভারতের জনগণের। তিনি দাবি করেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও আইন নিয়ে সরকার বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং তাঁদের মতামত শোনার সুযোগও দিয়েছে। কিন্তু বিরোধীরা কাঠামোবদ্ধ বিতর্কের সুযোগ প্রত্যাখ্যান করে পরে সংসদের কম কার্যকারিতার জন্য সরকারকেই দায়ী করছে।
বর্ষাকালীন অধিবেশনের পরিসংখ্যান তুলে ধরে রিজিজু জানান, লোকসভা নির্ধারিত সময়ের মাত্র ১৫ শতাংশ এবং রাজ্যসভা ৩৩ শতাংশ সময় কার্যকর ছিল। লোকসভায় প্রশ্নোত্তর পর্ব বরাদ্দ সময়ের মাত্র ১ শতাংশ এবং রাজ্যসভায় ১২ শতাংশ সময় চলেছে বলেও তিনি দাবি করেন।
রিজিজু বলেন, বিরোধীদের অবস্থান অত্যন্ত ‘নিন্দনীয়’—প্রথমে সংসদ অচল করা, তারপর সেই সময় নষ্ট হওয়ার ঘটনাকেই সরকারের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা।
তিনি বলেন, সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখার সাংবিধানিক অধিকার বিরোধীদের রয়েছে। তাঁরা প্রশ্ন করতে, সমালোচনা করতে, প্রতিবাদ জানাতে, সংশোধনী আনতে এবং সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন। কিন্তু রাজনৈতিক দাবি পূরণ না হলে সংসদকে ‘বন্ধ’ করে দেওয়ার কোনও অধিকার তাঁদের নেই।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আরও দাবি করেন, সরকার বিরোধীদের বিভিন্ন উদ্বেগ শুনেছে, আইন নিয়ে আলোচনা করেছে, সংশোধনী এনেছে এবং যুক্তিসঙ্গত দাবিগুলিও মেনে নিয়েছে। তবে তাঁর অভিযোগ, বিরোধীরা সংসদ অচল করে দিয়ে পরে সরকারকে স্বৈরাচারী বলে অভিযোগ করছে।
জন্তর মন্তরে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনার বিরোধীদের দাবির প্রসঙ্গও তুলে ধরেন রিজিজু। তাঁর দাবি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ওই বিষয়ে আলোচনায় সম্মতি জানিয়েছিলেন এবং নির্দিষ্ট সময়ও দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন বলে দাবি করেন তিনি।
রিজিজুর অভিযোগ, রাহুল গান্ধী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রস্তাবকে ‘লেকচার’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁর প্রশ্ন, সত্যিই যদি বিরোধীদের আলোচনা থেকে বঞ্চিত করা হতো, তাহলে ২৪ ঘণ্টার আলোচনার প্রস্তাব গ্রহণ না করে সেটিকে ‘লেকচার’ বলা হল কেন?
রাহুল গান্ধীর সংসদীয় উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন রিজিজু। তাঁর দাবি, ১৭তম লোকসভায় রাহুল গান্ধীর উপস্থিতি ছিল ৫১ শতাংশ। তিনি জাতীয় গড় ৪৬.৭ শতাংশের তুলনায় আটটি বিতর্কে অংশ নেন, ৯৯টি প্রশ্ন করেন এবং কোনও প্রাইভেট মেম্বার বিল আনেননি বলেও রিজিজু দাবি করেন।
রিজিজু বলেন, এরপরও রাহুল গান্ধী সরকার ‘গণতন্ত্র ধ্বংস করেছে’ বলে অভিযোগ করছেন। বিদেশের বিভিন্ন মঞ্চে ভারতের গণতন্ত্র নিয়ে অভিযোগ করলেও সংসদে এসে সরকারের কাছে জবাবদিহি চাইতে তিনি যথেষ্ট আগ্রহী নন বলেও কটাক্ষ করেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী।
বিরোধীরা সরকার কোনও কথা শোনে না—এই অভিযোগও খারিজ করেন রিজিজু। তিনি ফরেন কন্ট্রিবিউশন (রেগুলেশন) সংশোধনী বিলের উদাহরণ দিয়ে বলেন, বিরোধীদের উদ্বেগের পর বিলটি যৌথ সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু পরে বিরোধীরা সম্পূর্ণ বিল প্রত্যাহারের দাবি জানায় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নিট পরীক্ষা নিয়ে আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের সঙ্গে সরকারের আলোচনার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন রিজিজু। পাশাপাশি অনশনরত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গেও সরকারের প্রতিনিধিদের আলোচনা এবং তাঁকে চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে চলার আবেদন জানানোর কথা উল্লেখ করেন তিনি।
রিজিজুর বক্তব্য, প্রতিবাদ হয়েছে, নাগরিক সমাজের উদ্বেগ শোনা হয়েছে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেছেন, লিখিত আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, সংসদে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে এবং আইন আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। তাঁর মতে, এটিই গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ও জবাবদিহির উদাহরণ।
শেষে রিজিজু বলেন, সংসদ শুধু সরকার বা বিরোধীদের নয়—এটি ভারতের জনগণের। নির্বাচনে জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেটকে বিরোধীরা নিজেদের ইচ্ছেমতো সংসদ অচল করে স্থগিত করতে পারে না। তাঁর কথায়, সংসদের ভিতরের যুক্তির জায়গা স্লোগান দিয়ে পূরণ করা যায় না এবং বিতর্ক বা ভোটে সরকারকে হারাতে না পারলে ‘হট্টগোলের মাধ্যমে’ সংসদকে হারাতে দেওয়া যায় না।



















