নয়াদিল্লি, ৬ জুলাই (আইএএনএস): ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে সোমবার তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, আধুনিক ভারতের খুব কম নেতার মধ্যেই মেধা, জনসেবা এবং নৈতিক দৃঢ়তার এমন অনন্য সমন্বয় দেখা গিয়েছে।
১৯০১ সালের ৬ জুলাই কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ, আইনজীবী ও রাজনীতিক। স্বাধীনতার পর ভারতের রাজনৈতিক চিন্তাধারার বিকাশে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি সুপরিচিত। পরবর্তীকালে এই জনসংঘ থেকেই ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) উত্থান ঘটে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর নিবন্ধে লেখেন, “৬ জুলাই জাতীয়তাবাদ ও নিঃস্বার্থ সেবার আদর্শে বিশ্বাসী অগণিত মানুষের কাছে একটি বিশেষ দিন। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন সাহস, আত্মত্যাগ এবং মাতৃভূমির প্রতি অটল অঙ্গীকারের এক চিরন্তন উদাহরণ।”
মোদী বলেন, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের পরিবারে জন্ম হলেও ড. মুখোপাধ্যায় আরাম-আয়েশের জীবন বেছে নেননি। বরং দেশের সেবাকেই জীবনের লক্ষ্য করেছিলেন।
তিনি আরও বলেন, ঔপনিবেশিক শাসন, সাম্প্রদায়িকতা এবং বিভিন্ন মানবিক সংকটের সময় তিনি কখনও নীরব দর্শক হয়ে থাকেননি। ব্যক্তিগত জীবনে সন্তান ও স্ত্রীর মৃত্যু-সহ একাধিক গভীর শোকের মুখোমুখি হলেও তা তাঁর জাতিসেবার সংকল্পকে আরও দৃঢ় করেছিল।
প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, ড. মুখোপাধ্যায়ের জনজীবনের মূল আদর্শ ছিল “অখণ্ড ভারত”। দেশভাগের সময় পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ধরে রাখতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। পরবর্তীতে একই বিশ্বাস থেকেই তিনি জম্মু ও কাশ্মীর প্রশ্নে আন্দোলনে নামেন। বন্দিত্ব বা একাকীত্ব তাঁকে দমাতে পারেনি এবং শেষ পর্যন্ত বন্দি অবস্থাতেই তাঁর মৃত্যু হয়।
মোদী বলেন, “২০১৯ সালে অনুচ্ছেদ ৩৭০ ও ৩৫(এ) বাতিলই ছিল তাঁর আত্মত্যাগের প্রতি সবচেয়ে উপযুক্ত শ্রদ্ধার্ঘ্য।”
ড. মুখোপাধ্যায়ের শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য হিসেবে তিনি দেশপ্রেম ও আধুনিক ভাবনার প্রতিফলন ঘটিয়ে একাধিক সংস্কার চালু করেছিলেন। গ্রন্থাগার উন্নয়ন, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, কৃষিশিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ক্রীড়া ও ছাত্রকল্যাণে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর উদ্যোগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা দিবস হিসেবে ২৪ জানুয়ারি পালনের প্রথা শুরু হয় এবং সেই উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে একটি গান রচনার অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ড. মুখোপাধ্যায় ভারতের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি বিকল্প রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। কংগ্রেসের সর্বব্যাপী প্রভাবের সময়েও তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশের অগ্রগতির জন্য বিকল্প রাজনৈতিক মতের প্রয়োজন রয়েছে।
স্বাধীন ভারতের প্রথম শিল্প ও সরবরাহমন্ত্রী হিসেবে তাঁর অবদানের কথাও তুলে ধরেন মোদী। তিনি বলেন, দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন, সিন্দ্রি সার কারখানা এবং শিল্পনীতি প্রণয়নের মাধ্যমে আধুনিক শিল্প ভারতের ভিত্তি গড়ে তুলতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। একই সঙ্গে তাঁত, কুটির শিল্প, কারিগর ও বস্ত্রশিল্পের বিকাশেও তিনি সমান গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী জানান, আত্মনির্ভর ভারতের ভাবনা থেকেই সিন্দ্রি কারখানা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন ড. মুখোপাধ্যায়। বহু বছর অবহেলিত থাকার পর বর্তমান সরকারের আমলে সেটির পুনরুজ্জীবনে অবদান রাখতে পেরে তিনি গর্বিত।
মোদী আরও বলেন, মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ড. মুখোপাধ্যায় জাতি গঠনের স্বার্থে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু জাতীয় স্বার্থে ভিন্ন পথের প্রয়োজন অনুভব করলে তিনি মর্যাদার সঙ্গে মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করেন।
সংবিধানের প্রথম সংশোধনী প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ড. মুখোপাধ্যায় এটিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর আঘাত বলে মনে করেছিলেন এবং এর তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর দাবি, পরবর্তীকালে জরুরি অবস্থা এবং ৪২তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে সেই আশঙ্কাই সত্য প্রমাণিত হয়।
১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ এবং ১৯৪২ সালে মেদিনীপুরের ঘূর্ণিঝড়ের সময় ড. মুখোপাধ্যায়ের মানবিক ভূমিকারও প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দুর্গতদের জন্য ত্রাণশিবির ও খাবারের ব্যবস্থা করতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন এবং ঔপনিবেশিক সরকারের উদাসীনতার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।
নিবন্ধের শেষে প্রধানমন্ত্রী ড. মুখোপাধ্যায়ের ছাত্রদের উদ্দেশে দেওয়া বার্তা উদ্ধৃত করে বলেন, “যে কাজই করো, তা আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পূর্ণ করো। নিজের সর্বোচ্চটা না দেওয়া পর্যন্ত কখনও সন্তুষ্ট হয়ো না।”
তিনি বলেন, “উন্নত ভারতের লক্ষ্যে এগিয়ে চলার পথে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে একটি শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ, আত্মবিশ্বাসী ও সহমর্মী ভারত গড়ে তোলার মাধ্যমে।”



















