আগরতলা, ৮ এপ্রিল: কখনও বিদ্যুৎ মানেই ছিল দূরের কোনও বড় প্ল্যান্ট, বিশাল যন্ত্রপাতি আর অনিশ্চয়তার ছায়া। কিন্তু ছবিটা বদলাচ্ছে দ্রুত। এখন শক্তির উৎস উঠে এসেছে মানুষের নিজের বাড়ির ছাদে। আর সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ—রাজ্যে পিএম সূর্য ঘর মুফত বিজলি যোজনার মাধ্যমে ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সীমা অতিক্রম। সংখ্যাটা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং একটি দৃষ্টিভঙ্গির বদল। এই সাফল্য দেখিয়ে দিয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন আর কেবল নিগম কিংবা সরকারের একার কাজ নয়—এটি এখন সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা এক সম্মিলিত শক্তি আন্দোলন।
ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেডের ব্যবস্থাপক অধিকর্তা বিশ্বজিৎ বসু জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই ২,৯৩৩ জন গ্রাহক নিজেদের বাড়ির ছাদ, টিনের চাল কিংবা উঠোনকে ছোট ছোট বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পরিণত করেছেন। এই উদ্যোগ মিলিয়ে মোট উৎপাদন ১০ মেগাওয়াট পেরিয়েছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়—১৮ হাজারের বেশি মানুষ ইতিমধ্যে এই প্রকল্পে নাম নথিভুক্ত করেছেন, যা ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত করছে।
বিদ্যুৎ সচিব অভিষেক সিং, আইএএস এই সাফল্যকে আরও বড় লক্ষ্য পূরণের প্রথম ধাপ হিসেবে দেখছেন। তিনি জানান, এই প্রকল্পকে এখন ‘মিশন মোডে’ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য পরিষ্কার—প্রতিটি জেলায়, প্রতিটি মহল্লায়, যত বেশি সম্ভব বাড়িকে সৌর বিদ্যুতের আওতায় আনা। তাঁর মতে, ১০ মেগাওয়াট কেবল শুরু। সামনে ৫০ মেগাওয়াটের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, এবং আমরা সেই লক্ষ্য অর্জনে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
বিদ্যুৎ মন্ত্রী রতন লাল নাথ এই সাফল্যকে রাজ্যের শক্তি ইতিহাসে টার্নিং পয়েন্ট বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর কথায়, প্রাকৃতিক গ্যাসের সীমাবদ্ধতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আমরা বিকল্প শক্তির দিকে যে অগ্রগতি করেছি, তা শুধু একটি প্রকল্পের সাফল্য নয়—এটি রাজ্যের আত্মনির্ভরতার পথচলার শুরু। তিনি বিদ্যুৎ নিগমের প্রকৌশলী থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি সেই সমস্ত গ্রাহকদেরও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন, যারা নিজেদের উদ্যোগে এই পরিবর্তনের অংশীদার হয়েছেন। এখানেই থেমে নেই বার্তা। মন্ত্রী সরাসরি রাজ্যের সাধারণ মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন—আপনার ছাদ খালি পড়ে থাকলে সেটিকে শক্তির উৎসে পরিণত করুন। বিদ্যুৎ বিল শূন্যে নামানোর পাশাপাশি নিজেরাই বিদ্যুৎ উৎপাদক হয়ে উঠুন।
এই যোজনার বাস্তব চিত্র আরও আকর্ষণীয়। ইতিমধ্যেই হাজার হাজার পরিবার তাদের মাসিক বিদ্যুৎ বিল শূন্যে নামিয়ে এনেছেন। শুধু তাই নয়, অনেকেই অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রিডে বিক্রি করে বাড়তি আয়ের পথও খুলে ফেলেছেন। অর্থাৎ, বিদ্যুৎ এখন আর শুধু খরচের খাতা নয়—এটি আয়ের উৎসও হয়ে উঠছে।
একটি ১ কিলো ওয়াটের সোলার প্ল্যান্ট মাসে প্রায় ১০০ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, যা একটি সাধারণ পরিবারের চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট। সরকারি ভর্তুকি থাকায় প্রাথমিক খরচও অনেকটাই কমে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ২,৩৯৭ জন গ্রাহক ভর্তুকি পেয়েছেন, যার মোট পরিমাণ ২০ কোটিরও বেশি টাকা।
জেলাভিত্তিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, আগরতলা শহর এই উদ্যোগে এগিয়ে। বিদ্যুৎ নিগমের ১ নম্বর সার্কেলে একাই ১,৬৭১ জন গ্রাহক যুক্ত হয়েছেন। পশ্চিম জেলায় বিদ্যুৎ নিগমের দুই নং সার্কেলে মোট ১৮৬ জন, গোমতি জেলায় ২৪২ জন, দক্ষিণ জেলায় অর্থাৎ বিলোনিয়া সার্কেলে ২৬১ জন, সিপাহীজলা জেলায় ১৫৫ জন, উত্তর ত্রিপুরা তথা ধর্মনগর সার্কেলে ৮৮ জন, ধলাই জেলায় ৯০ জন, খোয়াই জেলায় ৮৯ জন এবং ঊনকোটি জেলায় মোট ১২১ জন বিদ্যুৎ গ্রাহক এই যোজনায় বাড়িতে সূর্যালোকের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছেন। জেলা গুলোতে ধীরে ধীরে বাড়ছে অংশগ্রহণ, যা এই প্রকল্পের বিস্তারের স্পষ্ট ইঙ্গিত।
প্রকল্পের প্রসারে প্রশাসনও মাঠে নেমেছে। বিভিন্ন বিদ্যুৎ সাব-ডিভিশনে বিশেষ শিবিরের মাধ্যমে নাম নথিভুক্তকরণ চলছে। আগরতলায় বিদ্যুৎ নিগমের কর্পোরেট অফিসে খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম, যেখানে সরাসরি তথ্য ও রেজিস্ট্রেশনের সুবিধা মিলছে। সব মিলিয়ে, রাজ্যের বিদ্যুৎ খাতে যা ঘটছে, তাকে নিছক উন্নয়ন বললে কম বলা হয়। এটি এক ধরনের নীরব বিপ্লব—যেখানে প্রতিটি বাড়ি একটি সম্ভাব্য পাওয়ার স্টেশন, প্রতিটি পরিবার একটি শক্তির উৎস।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছেন বিদ্যুৎ মন্ত্রী রতন লাল নাথ এবং বিদ্যুৎ সচিব অভিষেক সিং আইএএস এবং নিগমের ব্যবস্থাপক অধিকর্তা বিশ্বজিৎ বসু, যাদের নেতৃত্বে প্রকল্পটি প্রশাসনিক সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠছে।
শেষ কথা একটাই—সূর্য তো প্রতিদিনই উঠছে। আপনি কি সেই আলোকে শুধু রোদ হিসাবে দেখেই যাবেন, নাকি সেটাকে নিজের শক্তিতে রূপান্তর করবেন, সিদ্ধান্ত আপনার।



















