News Flash

  • Home
  • ত্রিপুরা
  • কালবৈশাখীর তাণ্ডবে বিপর্যস্ত বিদ্যুৎ পরিকাঠামো, ক্ষয়ক্ষতি ২ কোটি ছাড়িয়ে, নিরবচ্ছিন্ন পরিষেবায় বদ্ধপরিকর বিদ্যুৎ নিগম
Image

কালবৈশাখীর তাণ্ডবে বিপর্যস্ত বিদ্যুৎ পরিকাঠামো, ক্ষয়ক্ষতি ২ কোটি ছাড়িয়ে, নিরবচ্ছিন্ন পরিষেবায় বদ্ধপরিকর বিদ্যুৎ নিগম

আগরতলা, ২৫ মার্চ: চৈত্রের আগমনী লগ্নেই আচমকা নেমে আসা কালবৈশাখীর তাণ্ডব যেন মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ করে দিয়েছিল রাজ্যের বেশ কয়েকটি জেলার স্বাভাবিক জনজীবন। মার্চ মাসের দ্বিতীয় পক্ষ শুরুর আগেই আকাশ ভেঙে পড়া ঝড়-বৃষ্টির এই দুর্যোগে রাজ্যের বিদ্যুৎ পরিষেবা কার্যত লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে। তবে বিপর্যয়ের সেই গভীর অন্ধকার কাটিয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতিকে অনেকটাই স্বাভাবিক করে তুলতে সক্ষম হয়েছে ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেড—এটাই সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর। কিন্তু পরিকাঠামোগত ক্ষতি সারিয়ে উঠতে নিগমকে বেশ বেগ পেতে হবে আগামী দিনে। গত ১৩ই মার্চ থেকে শুরু হওয়া কালবৈশাখীর দাপট এবং টানা ভারী বর্ষণে রাজ্যের আটটি জেলার বিদ্যুৎ পরিকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোথাও রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল গাছ উপড়ে পড়ে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে দিয়েছে, কোথাও আবার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে একের পর এক বৈদ্যুতিক খুঁটি। গ্রামীণ জনপদ থেকে শুরু করে শহুরে অঞ্চল—ত্রিপুরার বিস্তীর্ণ এলাকা কয়েকদিনের জন্য অন্ধকারে ডুবে যায়। বিশেষ করে ধলাই, ঊনকোটি এবং খোয়াই জেলার মতো এলাকাগুলিতে ঝড়ের তাণ্ডব এতটাই প্রবল ছিল যে, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন হাই ভোল্টেজ লাইন ছিঁড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। অনেক জায়গায় ট্রান্সফর্মার বিকল হয়ে যাওয়ায় গোটা এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।

এই পরিস্থিতিতে ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেডের সামনে চ্যালেঞ্জ ছিল একদিকে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির হিসাব সামলানো, অন্যদিকে দ্রুত বিদ্যুৎ পরিষেবা পুনরুদ্ধার করা। নিগমের ব্যবস্থাপক অধিকর্তা বিশ্বজিৎ বসু জানিয়েছেন, এবারের এই অকাল দুর্যোগে সংস্থাটি প্রায় ২ কোটি টাকারও বেশি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, রাজ্যের আটটি জেলার প্রতিটি সার্কেলেই কমবেশি পরিকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে।
তিনি জানান, ১৩ই মার্চ থেকে ২২শে মার্চ পর্যন্ত চলা এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে রাজ্যজুড়ে প্রায় ৯০ কিলোমিটারেরও বেশি পরিবাহী তার সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়াও ৪০০-রও বেশি বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে পড়েছে এবং অন্তত ৩৭টি ট্রান্সফর্মার সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে গেছে। এমনকি উত্তর ত্রিপুরার মতো এলাকায় সাব-স্টেশনগুলিও ঝড়ের দাপট থেকে রক্ষা পায়নি।
সার্কেলভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান তুলে ধরে বিশ্বজিৎ বসু জানান, ধলাই সার্কেলে প্রায় ২৫ কিলোমিটার লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ১৭টিরও বেশি খুঁটি ভেঙে পড়েছে, যার ফলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকারও বেশি। ঊনকোটি সার্কেলে ৪৩.৯ কিলোমিটার তার ছিঁড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ২২টি খুঁটি এবং ৫টি ট্রান্সফর্মার সম্পূর্ণ বিকল হয়ে পড়েছে। খোয়াই সার্কেলে পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ—প্রায় ৫৩ কিলোমিটার লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ৪৪টি খুঁটি এবং ১১টি ট্রান্সফর্মার অকেজো হয়ে যায়।
অন্যদিকে সিপাহীজলা সার্কেলে ১৩ এবং ১৮ মার্চের ঝড়ে মোট ১০৬টি খুঁটি ভেঙে পড়ে, ২৬.৯ কিলোমিটার লাইন ছিঁড়ে যায় এবং ৮টি ট্রান্সফর্মার ও ৮টি সাবস্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দক্ষিণ ত্রিপুরা সার্কেলে সর্বোচ্চ সংখ্যক, অর্থাৎ ১০৯টি বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে পড়েছে এবং ৩৭.৩ কিলোমিটার তারের ক্ষতি হয়েছে। গোমতী সার্কেলে ৯.৩৩ কিলোমিটার লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ৭৫টি খুঁটি এবং ১৩টি ট্রান্সফর্মার বিকল হয়েছে। উত্তর ত্রিপুরা সার্কেলে ১৬ কিলোমিটার লাইন এবং ১৮টিরও বেশি খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সাথে ৪টি সাবস্টেশনও ঝড়ের কবলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এত বিশাল ক্ষয়ক্ষতির পরেও যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে, তা হল ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেডের নিরলস পরিষেবা মনোভাব। প্রতিকূল আবহাওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি—সবকিছুকে উপেক্ষা করে নিগমের কর্মীরা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজে নেমে পড়েন। দিন-রাত এক করে তারা ছিঁড়ে পড়া তার মেরামত করেছেন, উপড়ে পড়া খুঁটি সরিয়ে নতুন খুঁটি স্থাপন করেছেন এবং বিকল ট্রান্সফর্মার মেরামতের কাজ চালিয়ে গেছেন।
ফলস্বরূপ, অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ১ থেকে ৩ দিনের মধ্যেই বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। যে কারণে এত বড় বিপর্যয়ের পরেও সাধারণ মানুষকে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হয়নি। এই দ্রুত পরিষেবা পুনরুদ্ধার নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে, রাজ্যের বিদ্যুৎ ভোক্তাদের প্রতি ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেড কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জানা গেছে, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিদ্যুৎ পরিকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট জেলার জেলাশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে।
বিশ্বজিৎ বসু সাধারণ মানুষের প্রতি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, দুর্যোগের সময় ছেঁড়া তার বা ক্ষতিগ্রস্ত বৈদ্যুতিক খুঁটির কাছাকাছি যাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। এ ধরনের কিছু নজরে এলে তাৎক্ষণিকভাবে নিকটস্থ বিদ্যুৎ নিগম কার্যালয়ে জানাতে তিনি সকলের কাছে আবেদন জানান। তিনি আরও জানান, নিগমের কর্মীরা সর্বদা প্রস্তুত রয়েছেন এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সক্ষম। বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হলেও, এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠে পরিকাঠামোকে সম্পূর্ণভাবে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেড যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তাদের কাজের মধ্য দিয়ে।

সবশেষে বলা যায়, প্রকৃতির এই অপ্রতিরোধ্য রুদ্ররূপের সামনে একদিকে যেমন ক্ষতবিক্ষত হয়েছে পরিকাঠামো, অন্যদিকে তেমনি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে মানুষের সেবা করার এক অদম্য মানসিকতা। আর সেই মানসিকতার নামই—ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেড।

Releated Posts

বাম নেতা তপন দাসের বাড়িতে হামলা, ছুটে গেলেন বিরোধী দলনেতা

আগরতলা, ৯ মে : নির্বাচনোত্তর সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন জিরানিয়ায় বাম নেতা তপন দাস। তাঁর বাড়িতে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র…

ByByNews Desk May 9, 2026

বর্তমান প্রজন্মকে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা-চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে: শিল্পমন্ত্রী

আগরতলা, ৯ মে: তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের উদ্যোগে আজ রবীন্দ্র কাননে প্রভাতী কবি প্রনাম অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। অনুষ্ঠানের…

ByByNews Desk May 9, 2026

জমি জবরদখল করে রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ ঘিরে উত্তেজনা, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ

আগরতলা, ৯ মে: বিলোনীয়া মহকুমার ঋষ্যমুখ ব্লকের দক্ষিণ মতাই গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার মুসলিমপাড়ায় জোতের জমির উপর রাস্তা নির্মাণকে…

ByByNews Desk May 9, 2026

অটো থেকে চুরি হওয়া ২০ লক্ষ টাকার স্বর্ণালংকার উদ্ধার, গ্রেফতার দুই

আগরতলা, ৯ মে : আগরতলার সরকার নার্সিংহোম সংলগ্ন এলাকা থেকে একটি অটো গাড়ি থেকে চুরি হওয়া প্রায় ২০…

ByByNews Desk May 9, 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top