ওয়াশিংটন, ৯ ডিসেম্বর: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিলেন। এবার তাঁর নিশানায় ভারতীয় চাল। ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, ভারত আমেরিকায় চাল ‘ডাম্পিং’ করছে এবং তিনি এ পরিস্থিতি “দ্রুত সামলে নেবেন” বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর দাবি, বাড়তি শুল্ক আরোপই ‘সহজ সমাধান’। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে—যা বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় অন্যতম সর্বোচ্চ হার।
ট্রাম্প এই মন্তব্য করেন হোয়াইট হাউজে কৃষি খাতের প্রতিনিধি ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে আয়োজিত এক রাউন্ডটেবিল বৈঠকে, যেখানে কৃষকদের জন্য ১২ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা প্যাকেজও ঘোষণা করা হয়। বৈঠকে তিনি ভারতীয় বাণিজ্যনীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং জানতে চান ভারত চাল রপ্তানিতে কোনো ছাড় পাচ্ছে কি না। উত্তরে জানানো হয়, ভারত এখনও কোনো বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে না এবং বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে।
ট্রাম্প বলেন, “তাদের ডাম্পিং করা উচিত নয়। এটা আমি শুনেছি, অনেকেই বলেছে। তারা এটা করতে পারে না।” আলোচনায় উঠে আসে ভারতকে নিয়ে চলমান বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা মামলাও।
গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ-এর প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, ট্রাম্পের নতুন শুল্ক হুমকি মূলত মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি-কেন্দ্রিক, বাণিজ্যিক যুক্তি নয়। ২০২৫ অর্থবছর–এ যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের চাল রপ্তানি ছিল মাত্র ৩৯২ মিলিয়ন ডলার—যা ভারতের মোট চাল রপ্তানির মাত্র ৩ শতাংশ। এর মধ্যে ৮৬ শতাংশই প্রিমিয়াম বাসমতি। ভারতীয় চাল ইতিমধ্যেই মার্কিন বাজারে প্রায় ৫৩ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়ছে।
জিটিআরআই জানায়, নতুন শুল্ক ভারতীয় রপ্তানিকারকদের তেমন ক্ষতি করবে না, কারণ ভারতের বাজার বহুমুখী। বরং এতে আমেরিকান গ্রাহকদেরই চালের দাম আরও বাড়বে। একই বৈঠকে ট্রাম্প কানাডা ও অন্যান্য দেশের কৃষিপণ্যের ওপরও উচ্চ শুল্ক আরোপের ইঙ্গিত দেন।
সংস্থাটির পরামর্শ—ভারতের উচিত এই মন্তব্যকে নির্বাচনী মৌসুমের রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা, এবং এমন হুমকির জবাবে কোনো রেয়াত না দেওয়া।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের মন্তব্যের পর ভারতীয় রাইস এক্সপোর্টার্স ফেডারেশন একটি পরিস্কার ব্যাখ্যা দেয়। সংস্থার সহ-সভাপতি দেব গর্গ বলেন, “ভারতের চাল রপ্তানি শিল্প শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক। মার্কিন বাজার গুরুত্বপূর্ণ হলেও ভারতের রপ্তানি বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত।”
আইআরইএফ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের বাসমতি রপ্তানি ছিল ৩৩৭.১০ মিলিয়ন ডলার (২,৭৪,২১৩.১৪ মেট্রিক টন), যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ভারতের জন্য চতুর্থ বৃহত্তম বাসমতি বাজারে পরিণত করেছে। আর নন-বাসমতি রপ্তানি হয়েছে ৫৪.৬৪ মিলিয়ন ডলার (৬১,৩৪১.৫৪ মেট্রিক টন)।
আইআরইএফ জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় চালের মূল ক্রেতা উপসাগরীয় ও দক্ষিণ এশীয় প্রবাসী জনগোষ্ঠী। ভারতীয় খাবারের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে বাসমতির চাহিদাও বাড়ছে। মার্কিন বাজারে দেশীয় চাল ভারতীয় বাসমতির বিকল্প নয়—কারণ এর ঘ্রাণ, গঠন, স্বাদ ও দীর্ঘায়ন গুণ সম্পূর্ণ আলাদা।
সাম্প্রতিক শুল্ক সংশোধনের আগে ভারতীয় চালের ওপর আমদানি শুল্ক ছিল ১০ শতাংশ, যা এখন বেড়ে হয়েছে ৫০ শতাংশ। তবু রপ্তানি চালু রয়েছে, কারণ আমেরিকান বাজারে ভারতীয় বাসমতির চাহিদা অপরিবর্তিত।
আইআরইএফ জানায়, বাড়তি শুল্কের বোঝার সিংহভাগই বহন করছেন মার্কিন ক্রেতারা, কারণ খুচরা দামের বৃদ্ধি তাদের পক্ষেই চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে ভারতীয় কৃষক ও রপ্তানিকারকদের আয় মোটের ওপর স্থিতিশীল রয়েছে।

