সিডনি, ১৮ আগস্ট— অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল কোর্ট কুয়ান্টাস এয়ারওয়েজকে কোভিড-১৯ মহামারীর শুরুতে অবৈধভাবে ১,৮২০ জন গ্রাউন্ড স্টাফ ছাঁটাই করার দায়ে ৯০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার (৫৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) জরিমানা করেছে, যা দেশটির ইতিহাসে শ্রম আইনের সর্ববৃহৎ লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই জরিমানাটি ১২০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার (৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ক্ষতিপূরণের অতিরিক্ত, যা কুয়ান্টাস আগেই প্রাক্তন কর্মীদের দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল, যখন হাই কোর্ট সাতজন বিচারকের সর্বসম্মত রায়ে কুয়ান্টাসের আপিল খারিজ করে দেয় এবং আদালত জানিয়ে দেয় যে, ছাঁটাই সম্পূর্ণ বেআইনি ছিল। আদালতের বিচারক মাইকেল লি তাঁর রায়ে বলেন, ২০২০ সালের শেষদিকে ব্যাগেজ হ্যান্ডলার এবং ক্লিনারদের চাকরি আউটসোর্স করা শুধু বেআইনি ছিল না, বরং এটি দেশের ১২০ বছরের শ্রম আইন ইতিহাসে সবচেয়ে “গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যাপক লঙ্ঘন” হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
বিচারক লি রায়ে আরও উল্লেখ করেন, কুয়ান্টাসের পক্ষ থেকে যে ক্ষমা প্রকাশ করা হয়েছে তা “আসল অনুশোচনার চেয়ে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ক্ষুণ্ণ হওয়ার পরিণতির প্রতি উদ্বেগ” বলেই প্রতীয়মান হয়েছে। তিনি বলেন, কুয়ান্টাস একদিকে জনসমক্ষে দুঃখপ্রকাশ করলেও, অন্যদিকে আদালতে দাঁড়িয়ে বলেছে, প্রাক্তন কর্মীদের কোনও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, যা প্রতিষ্ঠানটির “অবিরাম ও আক্রমণাত্মক” আইনি কৌশলের প্রতিচ্ছবি। বিচারক জানান, এই ধরনের কর্পোরেট আচরণে কঠোর বার্তা দেওয়া দরকার এবং কুয়ান্টাস এই কাজে প্রতি বছর ১২৫ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয়ের প্রত্যাশা করলেও, আইন লঙ্ঘনের দায়ে এখন তাদের বড়সড় মূল্য দিতে হচ্ছে।
এ মামলার বিশেষ একটি দিক হলো, কোনও সরকারি সংস্থা কুয়ান্টাসের এই আচরণের বিরুদ্ধে তদন্তে আগ্রহ না দেখালেও ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের নিরলস প্রচেষ্টাতেই মামলাটি আদালতে পৌঁছায়। বিচারক রায়ে নির্দেশ দেন, এই ইউনিয়নকে জরিমানার ৫০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার প্রদান করা হবে, কারণ তারা না থাকলে কুয়ান্টাসের বেআইনি কার্যকলাপ জনসমক্ষে আসতো না। তিনি বলেন, “ইউনিয়নের উদ্যোগ ছাড়া, একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী নিয়োগকর্তার এমন বৃহৎ বেআইনি কার্যকলাপ অপ্রকাশিত থেকে যেত।” মামলার বাকি ৪০ মিলিয়ন ডলার জরিমানা কোথায় যাবে, তা নির্ধারণের জন্য ভবিষ্যতে আরেকটি শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
রায়ের পর কুয়ান্টাসের প্রধান নির্বাহী ভেনেসা হাডসন, যিনি ছাঁটাইয়ের সময় কোম্পানির চিফ ফিনান্সিয়াল অফিসার ছিলেন, এক বিবৃতিতে বলেন, “আমরা আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইছি আমাদের ১,৮২০ জন প্রাক্তন কর্মী এবং তাদের পরিবারের প্রতি, যারা এই সিদ্ধান্তের ফলে কষ্ট পেয়েছেন। বিশেষ করে মহামারীর মত একটি অনিশ্চিত সময়ে এই সিদ্ধান্ত তাদের জন্য চরম দুঃখজনক ছিল।” তিনি আরও বলেন, “গত ১৮ মাসে আমরা আমাদের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া সংস্কারের জন্য কাজ করছি এবং কর্মী ও গ্রাহকদের বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করাকে আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে নিয়েছি।”
এদিকে, ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের জাতীয় সচিব মাইকেল কেইন বলেন, “এই রায় শুধু একটি ঐতিহাসিক বিজয় নয়, এটি প্রতিটি অস্ট্রেলিয়ান কর্মীর জন্য এক স্পষ্ট বার্তা—যদি কোনও নিয়োগকর্তা বেআইনি আচরণ করে, তাকে শাস্তির সম্মুখীন হতেই হবে।” তিনি আরও বলেন, “আমরা একটি কর্পোরেট দৈত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি, যারা বরাবরই নিষ্ঠুরতা দেখিয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার পেয়েছি।” উল্লেখ্য, কুয়ান্টাস এর আগেও স্বীকার করেছে যে তারা কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে ৮,০০০-এর বেশি বাতিল হওয়া ফ্লাইটের টিকিট বিক্রি করে ভোক্তা প্রতারণায় লিপ্ত হয়েছিল। সেই মামলায়ও তারা বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হয়।
এই বহুল আলোচিত রায় কেবল কুয়ান্টাসের জন্য নয়, অস্ট্রেলিয়ার সামগ্রিক শ্রমনীতি ও কর্পোরেট জবাবদিহিতার জন্য একটি যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

