চিরনিদ্ৰায় দীর্ঘ মেয়াদের মুখ্যমন্ত্রী অসম রাজনীতির দুরন্ত তরুণ, শোকস্তব্ধ রাজ্য

গুয়াহাটি, ২৩ নভেম্বর (হি.স.) : সহস্রজনকে শোকাহত করে চিরনিদ্রায় অসমের প্ৰাক্তন মুখ্যমন্ত্ৰী তরুণ গগৈ। আজ সোমবার সন্ধ্যা ৫:৩৪ মিনিটে গুয়াহাটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইহলোক ত্যাগ করে পরলোকে গমন করেছেন ৮৬ বছরের তরুণ। এই দুঃসংবাদ দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা। আজ সন্ধ্যায় দ্বিতীয় বার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর স্বাস্থ্যর খোঁজ নিতে হাসপাতালে এসেছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এখানে আসার পর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ তাঁকে এই দুঃসংবাদ দিয়েছেন। অধ্যক্ষের উদ্ধৃতি দিয়ে মন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর মৃত্যু সংবাদ সাংবাদিকদের সামনে ঘোষণা করেন। মৃত্যুর সময় আইসিইউ-এর ভিতরে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ছিলেন তাঁর সাংসদ-পুত্র গৌরব গগৈ, মেয়ে চন্দ্ৰিমা ও জামাতা।

এদিন সকালে গুয়াহাটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল (জিএমসিএইচ)-এর তিনতলায় আইসিইউতে পত্নী, পুত্র-কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে অসমের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা প্রবীণ কংগ্রেস নেতা বছর ৮৬-এর তরুণ গগৈয়ের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়ে মেডিক্যাল টিমের সঙ্গে আলোচনা করে বাইরে এসে অশ্রুসিক্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা জানিয়েছিলেন, প্ৰতি মুহূৰ্তে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে। কেবলমাত্র সামান্য ব্রেন ফাংশন ছাড়া শরীরের প্রতিটি অঙ্গ ডিজঅর্ডার হয়ে পড়েছে। হার্টের ক্রিয়া কিছুটা রয়েছে, তবে তা প্যাসমেকারের বলে। মোদ্দা কথায়, তিনি এখন যখন-তখন, যমের সঙ্গে লড়াই করছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং দশ জনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দল।

তরুণ গগৈয়ের ১৫ বছরের রাজত্বের তাঁর অতি ঘনিষ্ঠ এবং প্রভাবশালী মন্ত্রী তথা নয়নের মণি বর্তমান বিজেপি নেতা ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা জানিয়েছিলেন, মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশনে রেখে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। টিউবের সহায়তায় কৃত্ৰিম ভেন্টিলেশনে তাঁকে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে হচ্ছে। টানা অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে, তার পরও ৮০ থেকে ৮৫-র বেশি মাত্রায় উঠছে না অক্সিজেন। শরীরে পটাশিয়ামের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় গতকাল বিকেল সাড়ে তিনটা থেকে ছয়ঘণ্টা ডায়ালেসিস করা হয়েছে। আজ আর ডায়ালেসিসের পর্যায়ে নেই রোগী। এককথায় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সম্পূর্ণ যান্ত্রিক মেশিনের বলে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। তাই তিনি সর্বশক্তিমানের কাছে আকুল প্রার্থনা জানাচ্ছিলেন তরুণ গগৈকে শীঘ্র সুস্থ করে জীবন দান করুন। এছাড়া রাজ্যবাসীকে তাঁর পুনর্জীবন কামনা করে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতেও আহ্বান জানিয়েছিলেন হিমন্তবিশ্ব।

মন্ত্রী জানান, চিকিৎসকরা তাঁদের সর্বোত্তম প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। এখানে চিকিৎসদের দল এবং ভিডিও কনফারেন্সিঙে দিল্লির এইমস-এর ডাক্তারদের সঙ্গে ঘন ঘন যোগাযোগ করা হচ্ছিল। তাঁদের পরামর্শ অনুযায়ী জিএমসিইচ-এর মেডিক্যাল টিম তাঁর চিকিৎসা করেছে। তবে যা পরিস্থিতি, তাতে মনে হচ্ছে ডাক্তারদের হাতে আর কিছুই নেই, ভগবানের আশীর্বাদ ছাড়া।

এদিকে অসমের প্রায় ছয় দশকের পোড় খাওয়া রাজনীতিক টানা পনেরো বছরের মুখ্যমন্ত্রী (প্রাক্তন)-র পুনর্জীবন কামনা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল। প্ৰাক্তন মুখ্যমন্ত্ৰী তরুণ গগৈয়ের দ্রুত স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটার পরিপ্ৰেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্ৰী সৰ্বানন্দ সনোয়াল যাবতীয় সরকারি কাৰ্যসূচি বাতিল করে ডিব্রুগড় থেকে এসে সোজা গুয়াহাটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এসেছেন।

২০০১ সালে প্ৰথমবারের মতো অসমের মুখ্যমন্ত্ৰীর পদে অধিষ্ঠিত তরুণ গগৈ রাজ্যের ইতিহাসে টানা তিন মেয়াদের মুখ্যমন্ত্ৰী হয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী প্ৰথম রাজনীতিক। ছাত্ৰকাল থেকে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত প্ৰাক্তন মুখ্যমন্ত্ৰী তরুণ গগৈয়ের জন্ম তদানীন্তন শিবসাগর জেলার যোরহাটের রঙাজান চা বাগানে, ১৯৩৪ সালের ১১ অক্টোবর। তাঁর বাবা ছিলেন রঙাজান বাগানের চিকিৎসক ডা. কমলেশ্বর গগৈ, মা ছিলেন উষা গগৈ। প্রসঙ্গত উষা গগৈ ছিলেন অসমের পাপড়ি কবি খ্যাত গণেশ গগৈয়ের কনিষ্ঠা বোন।

২৬ নম্বর রঙাজান নিম্ন বুনিয়াদী বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করে তরুণ গগৈ ১৯৪৯ সালে যোরহাট সরকারি হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন। পরে উজান অসমের বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জগন্নাথ বরুয়া মহাবিদ্যালয়ে ভরতি হয়ে ওই কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্ৰি প্রাপ্ত হন। এর পর গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনের ডিগ্ৰি গ্ৰহণ করেন তিনি। ১৯৭২ সালে গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্ৰাণীবিদ্যার স্নাতকোত্তর ডিগ্ৰিধারী তরুণ গগৈ ১৯৭২ সালে ডলি গগৈয়ের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তরুণ গগৈয়ের দুই সন্তান, একজন পুত্র গৌরব গগৈ এবং কন্যা চন্দ্রিমা গগৈ। পুত্ৰ গৌরব গগৈ কলিয়াবরের দ্বিতীয়বারের সাংসদ। কন্যা চন্দ্রিমা জামাতার সঙ্গে থাকেন আমেরিকায়।

ছাত্রাবস্থা থেকে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রয়াত তরুণ গগৈ পরবর্তীতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্ৰেসে যোগদান করে সক্ৰিয় রাজনীতিতে অংশগ্ৰহণ করেন। ১৯৬৭ সালে যোরহাট পুরসভার নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং এর পর তিনি মোট ছয়বার সাংসদ নির্বাচত হয়েছিলেন তিনি। ১৯৭১, ১৯৭৭, এবং ১৯৮৩ সালে যোরহাট লোকসভা আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। এর পর ১৯৯১ সালে কলিয়াবর লোকসভা আসনে বিজয়ী হয়ে লোকসভায় যান এবং পিভি নরসিংহ রাও কেন্দ্ৰীয় মন্ত্ৰিসভার প্রথমে খাদ্য দফতরের, পরে খাদ্য সংবরণ দফতরের স্বতন্ত্ৰ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০১ সালে অসমের মুখ্যমন্ত্ৰীর আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত কলিয়াবরের সাংসদ হিসেবে দীৰ্ঘদিন কাৰ্যনিৰ্বাহ করেছিলেন তরুণ গগৈ। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালে দুবছরের কাৰ্যকালে অসমের মাৰ্ঘেরিটা বিধানসভা ক্ষেত্র থেকে বিধায়ক নিৰ্বাচিত হয়েছিলেন। পরে ২০০১ সালের পর থেকে আমৃত্যু যোরহাটের তিতাবর বিধানসভা এলাকা থেকে টানা চারবার অসম বিধানসভায় নিৰ্বাচিত হয়েছিলেন তরুণ গগৈ।

২০০১ সালে অসম বিধানসভা নিৰ্বাচনে অসম গণ পরিষদ নেতৃত্বাধীন প্ৰফুল্লকুমার মহন্তের সরকারকে ধরাশায়ী করে তরুণ গগৈয়ের নেতৃত্বে অসমে কংগ্ৰেস সরকার গঠিত হয়। সে সময় অসমের প্ৰশাসনিক, রাজনৈতিক থেকে শুরু করে অর্থব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিল। উগ্রপন্থীরা মথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। ওই সব গোটা অব্যবস্থাকে শক্ত হাতে মোকাবিলা করে রাজ্যের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নত করেন তিনি। পরবৰ্তীতে ২০০৬ সালের নির্বাচনের পর ফের অসমের মুখ্যমন্ত্ৰীর পদে অধিষ্ঠিত হন তোখড় রাজনীতিক গগৈ। পরবর্তী মেয়াদ ২০১১ সালে অসম বিধানসভা নিৰ্বাচনেও তাঁর নেতৃত্বে কংগ্ৰেস বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে।

কিন্তু ২০১৬ সালের নির্বাচনে প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়ায় অসমের রাজনীতি থেকে উড়ে যায় কংগ্ৰেস। দুর্নীতি এবং দলীয় বিবাদে জৰ্জরিত কংগ্ৰেস সরকারের পতন হয় এবং তরুণ গগৈয়ে দীৰ্ঘ ১৫ বছরের মুখ্যমন্ত্ৰিত্বেরও অবসান ঘটে।

কংগ্ৰেসের একনিষ্ঠ সেবক তরুণ গগৈ ১৯৭৬ সালে প্ৰথমবারের মতো সৰ্বভারতীয় কংগ্ৰেস কমিটির যুগ্ম-সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। ১৯৮৩ সালে বিভক্ত ইন্দির কংগ্ৰেসের সৰ্বভারতীয় যুগ্ম-সম্পাদক এবং ১৯৮৫ সালে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব লাভ করেন। ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত কংগ্ৰেস (ই)-এর অসম প্ৰদেশ কমিটির সভাপতি, ১৯৯৬ সালে দ্বিতীয়বারের মতো অসম প্ৰদেশ কংগ্ৰেস কমিটির সভাপতি ছিলেন। এছাড়া প্ৰাক্তন মুখ্যমন্ত্ৰী তরুণ গগৈ কেন্দ্ৰীয় সরকারের বেশ কয়েকটি কমিটির সদস্য হিসেবেও কাৰ্যনিৰ্বাহ করেছেন। কেন্দ্ৰীয় সরকারের বৈদেশিক পরিক্ৰমা কমিটি, পেট্ৰোলিয়াম ও প্ৰাকৃতিক গ্যাস মন্ত্ৰালয়ের পরামৰ্শদাতা কমিটি, রেলওয়ে ইত্যাদি কয়েকটি কমিটির সদস্য হিসেবে নিয়োজিত হয়েছিলেন প্রয়াত গগৈ।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, গত ২৬ আগস্ট রাতে কোভিড-১৯ পজিটিভ ধরা পড়েছিল অসমের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈয়ের শরীরে। ওইদিন রাতেই তাঁকে গুয়াহাটি মেডিক্যাল কলেজ হাসাপাতালের আইসিইউতে নিয়ে ভরতি করা হয়। তাঁর উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঁচ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের একটি টিম গঠন করে দিয়েছিলেন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা। স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকলে দিল্লির এইমস থেকে বিশেষজ্ঞ এনে তাঁর স্বাস্থ্যের পরীক্ষা করানো হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে কোভিড-১৯ টেস্টে তাঁর রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। কিন্তু কার্ডিওর পাশাপাশি অন্য রোগের উপসর্গ থাকায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের তাঁর চিকিৎসার জন্য নিয়োগ করা হয়েছিল।

এর পর দু মাসের মাথায় গত ২৫ অক্টোবর বিকেল চারটায় মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়া হয়েছিল রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কংগ্রেস নেতা তরুণ গগৈকে। হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়ে সোজা তাঁকে দিশপুরে তাঁর সরকারি আবাসে নিয়ে যাওয়া হয়। গুয়াহাটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তিনজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের নিয়মিত অবজার্ভেশনে ছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু আবার স্বাস্থ্যের অবনতি হলে তাঁকে ১ নভেম্বর জিএমসিএইচ-এ এনে ভরতি করা হয়েছিল।

গত শনিবার থেকে তাঁর শরীরের অবস্থা দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছিল। তবে গতকাল সকালে সামান্য চোখ খুলেছিলেন তিনি। এর পর রাত থেকে ক্রমশ স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকলে গোটা রাজ্য উৎকণ্ঠায় ছিল। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী থেকে শুরু করে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়েছেন তাঁর ছেলে গৌরব গগৈয়ের কাছে। কিন্তু আজ সন্ধ্যায় তাঁর পরলোক গমনের খবর চাউর হলে শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েছে অসম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *