ঢাকা, ৩০ জানুয়ারি (হি.স.) : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গত কয়েক বছর বাংলাদেশে বিরোধী দল বিএনপি তাদের ভারত-বিরোধিতার পুরনো লাইন ত্যাগ করার নানা ইঙ্গিত দিয়েছে। ভারত বিরোধিতা ও সাম্প্রদায়িকতা বিএনপি রাজনীতির প্রধান ভিত্তি হলেও এ সময়ে সেটা অনুপস্থিত ছিল, নির্বাচনে প্রচারণায় এই দুই ইস্যু আসেইনি। কিন্তু সম্প্রতি সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশী হত্যার বিরুদ্ধে হঠাৎ তারা সরব হয়ে ওঠে। বিএনপির অন্দরমহল থেকে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, নেতাদের ব্যাপক চেষ্টা সত্ত্বেও তারা শেষ পর্যন্ত ভারতকে একেবারেই পাশে পায়নি। প্রশ্ন উঠছে, বিএনপি কি সেই অতীতেই ফিরে যাচ্ছে ?

বিএনপির অন্দরমহলের সঙ্গে ঘনিষ্ট কয়েকজন সাংবাদিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তি বলেছেন, ২০১৪ সালে ভারতে নির্বাচনে বিজেপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর নরেন্দ্র মোদির কাছে আওয়ামি লিগের আগেই তড়িঘড়ি অভিনন্দন বার্তা পাঠান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। কয়েকজন বিএনপি নেতা এই বার্তা নিয়ে ছুটে যান ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনে। এর পর থেকে বিএনপি ভোল পাল্টাতে শুরু করে। তারা ধরে নিয়েছিলেন, আওয়ামি লিগ রাজনৈতিকভাবে বরাবরই কংগ্রেসের ঘনিষ্ঠ। দিল্লিতে ক্ষমতার পালা বদলের পর বিজেপির নেতৃত্বে নতুন সরকারকে বিএনপির পাশে পাওয়া যাবে। বিএনপি নেতারা ঘনঘন দিল্লি সফর করেন ও বিজেপি নেতাদের আশ্বস্ত করতে নানা ধরনের বার্তা পাঠান। তাতে এটা পরিষ্কার ছিল যে তারা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে শুরু করতে চান। উল্লেখ্য, আগের বছর ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় ঢাকা সফরে এলে বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে বিএনপি সুপ্রিমোর সঙ্গে একটা বৈঠকের আয়োজন হয়। কিন্তু প্রণববাবু ঢাকায় অবস্থানকালেই হরতালের দোহাই দিয়ে সেই বৈঠকটি বাতিল করেন খালেদা। আভাস পাওয়া গিয়েছিল, তাদের জোট শরিক যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামির চাপে খালেদা এই বৈঠক বাতিল করেন। ভারত সরকার এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত অপমানজনক মনে করেছে। বিএনপি ভারতের সাথে সম্পর্কের অবনতি মেরামত করতে বিজেপি সরকারের ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা শুরু করে নির্বাচনের পর। ভারতে গিয়ে বিএনপি নেতারা দেখাসাক্ষাৎ শুরু করেন ক্ষমতাসীন বিজেপির বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা (যাদের অন্যতম দলের সাধারণ সম্পাদক রাম মাধব) এবং দিল্লির বিভিন্ন থিঙ্কট্যাঙ্কের প্রতিনিধিদের সঙ্গে। বিএনপি নেতারা আশা করেছিলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিজেপি কংগ্রেসের জুতোয় পা গলাবে না। কিন্তু সবই বৃথা যায়, নরেন্দ্র মোদীর সরকারের আমলে বরঞ্চ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে।
বাংলাদেশে একাদশ নির্বাচনের আগে বিএনপি নেতারা অন্তত ধারণা করেছিলেন, নির্বাচনে শেখ হাসিনার আওয়ামি লিগকে খোলাখুলি সমর্থন না-করে ভারত অন্তত একটা নিরপেক্ষতা বজায় রাখুক, বস্তুত সেটাই ছিল দিল্লির কাছে বিএনপির অনুরোধ। সম্ভবত সে কারণেই তিস্তা চুক্তির মতো ইস্যুকেও তারা নির্বাচনে একেবারেই ব্যবহার করেনি। কিন্তু বিএনপি নেতৃত্বের ক্ষোভ,শেষ পর্যন্ত ভারতের ভূমিকায় এমন কিছুই দেখা যায়নি যা বিএনপিকে বিন্দুমাত্র খুশি করতে পারে।
দিল্লির বিভিন্ন থিঙ্ক ট্যাঙ্কের শীর্ষ ব্যক্তি ও বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের কারো কারো অভিমত যা ঢাকায় পাওয়া যাচ্ছে, তাতে বলা হচ্ছে, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কই আসলে এই সমস্যার মূলে। নির্বাচনে জামায়াতকে বিএনপি ছাড়েনি। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় জামায়াত নেতারা বিএনপির প্রতীক নিয়েই নির্বাচন করেন। ঢাকায় পাওয়া খবরে জানা যাচ্ছে, গবেষকরা বলছেন, ব্যাপারটা হল বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আগে পরিষ্কার করুক। ওটা নিয়ে তারা লুকোচুরি খেলেই যাচ্ছে। যে রাজাকারদের বিএনপি আজীবন তোষামোদ করে এসেছে তাদের প্রতি অবস্থান পরিষ্কার না-করলে ভারতেরও যে বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক রাখা সম্ভব নয়, এটা বুঝতে হবে। তাছাড়া বিএনপি বা খালেদা জিয়ার আমলে ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলোকে নিরাপদে বাংলাদেশ ভূখন্ডে আশ্রয় দান ও বাংলাদেশ ভূখন্ড থেকে কার্যক্রম চালাতে দেয়া এবং সেই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আলফার দশ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালানের ঘটনা ভারতের ভুলে যাওয়ার কথা নয়। আলফা অস্ত্র এনেছিল বিএনপি সরকারের সক্রিয় সহায়তায়, এটা গোপন কিছু ছিল না। বিএনপির কোনো কোনো নেতা ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের স্বাধীনতা সংগ্রামী বলেও অভিহিত করেছেন।
স্বাভাবিকভাবে দুদেশের সম্পর্ক নিয়ে দিল্লির এই ইঙ্গিত নতুন নয়। কিন্তু বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগে রাজি হয়নি। বিএনপি নেতারা অবশ্য ভারতকে এই আশ্বাসও দিয়েছিলেন,বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে জিতলে জামায়াত নতুন সরকারে থাকবে না। তাতেও শেষ পর্যন্ত ‘ভবী ভোলেনি’।