নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ২৮ জানুয়ারী৷৷ শিল্পের উন্নয়নই হচ্ছে কোনও রাজ্যের স্বনির্ভরতার মূল ভিত্তি৷ আমাদের রাজ্যেও শিল্পের উন্নয়নের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে৷ কারণ শিল্প বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাক’তিক সম্পদ রয়েছে৷ আজ আগরতলার হাপানিয়ায় নবনির্মিত আধুনিক সর্বসুুবিধাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক ইণ্ডোর প্রদর্শনী কেন্দ্রের উদ্বোধন করে একথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব৷ তিনি বলেন, ত্রিপুরাতে রয়েছে কুটির শিল্পের নানা রকম রসদ৷ এখানে কারুশিল্পের বিভিন্ন ইউনিট থাকার পাশাপাশি রয়েছে ধূপকাঠি তৈরির দক্ষতাসম্পন্ন কারিগর এবং আগর গাছ৷ এছাড়াও রয়েছে প্রাক’তিক গ্যাস, প্রাক’তিক সম্পদ এবং বিদ্যতের বিপুল সম্ভার৷ তিনি বলেন, এই আন্তর্জাতিক ইণ্ডোর প্রদর্শনী কেন্দ্রের মাধ্যমে প’থিবীর বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পপতি, বিশেষ’, ছোট কিংবা বড় নির্মাণ সংস্থার কনসালটেন্ট ত্রিপুরাতে আসবেন৷ রাজ্যে পরিকাঠামোর যে উন্নয়ন হচ্ছে এই সেন্টারটি তারই প্রমাণ৷

তিনি বলেন, বহির্রাজ্যের ছোট বড় শিল্পপতিদের রাজ্যে শিল্প স্থাপনে আগ্রহী করে তোলার লক্ষ্যে রাজ্য সরকার সিঙ্গেল উইণ্ডো সিস্টেম চালু করেছে৷ বহির্রাজ্যের শিল্প উদ্যোগীদের যেন কোনও প্রকার হয়রানি হতে না হয় সেই উদ্দেশ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানান৷ তিনি বলেন, বিগত দিনে শিল্পায়নের উদ্দেশ্যে আসা শিল্পপতিদের তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন অফিসের পাশাপাশি নেতাদের কাছেও যেতে হতো৷ বর্তমান রাজ্য সরকার এই ব্যবস্থাপনার সমাপ্তি ঘটিয়ে সিঙ্গেল উইণ্ডো সিস্টেম চালু করেছে৷
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, শিল্পপতিদের মধ্যে বর্তমানে ইতিবাচক মনোভাবের স’ষ্টি হয়েছে৷ ওরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে বর্তমান রাজ্য সরকার শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে তাদের পাশে রয়েছে৷ তিনি আরও বলেন, দক্ষতার বিচার করে যে কারিগর যে শিল্পে দক্ষ তাকে সেই শিল্পেই নিয়োগ করা হবে৷ এভাবেই রাজ্যে শিল্পের উন্নয়ন ঘটবে এবং রোজগারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে৷ সেই দিশাতেই কাজ করছে রাজ্য সরকারের শিল্প ও বাণিজ্য দপ্তর৷ তিনি পরিসংখ্যান দিয়ে জানান, বিগত বছরে দেশ-বিদেশ থেকে শিল্প-বাণিজ্য মেলায় ৮৫টি স্টল অংশগ্রহণ করেছিলো৷ কিন্তু এবার দেশ-বিদেশ থেকে মোট ১৭০টি স্টল অংশগ্রহণ করছে৷ আন্তর্জাতিক স্টলের সংখ্যা আগে ২১ ছিলো যা এবার ২৫০ হয়েছে৷ সরকারি স্টল আগে ছিলো ১২টি এবার হয়েছে ২৬টি৷ স্থানীয় ব্যবসায়ীগণের স্টল আগেরবার ছিলো ৩৬টি এবার হয়েছে ৭৪টি৷
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বিগত দিনগুলিতে রাজ্যের যুবক-যুবতীরা রোজগারের পথ হিসেবে সরকারি চাকরিকে বেছে নিতে চাইতো৷ কিন্তু বর্তমানে এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে৷
যুবক-যুবতীরা ছোট ছোট শিল্পায়নের মাধ্যমে নিজেরা স্বনির্ভর হওয়ার পাশাপাশি অন্যদেরকেও স্বনির্ভর হতে সাহায্য করছে৷ ইতিমধ্যেই ৮২০টি এন্টারপ্রেনারশিপ নতুন রেজিস্ট্রেশন করিয়েছে৷ এর মাধ্যমে প্রায় ৪ হাজার লোকের রোজগারের পথ সুুগম হয়েছে৷ তিনি বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ছোট ছোট স্ব-উদ্যোগীদের উৎপাদিত পণ্য সামগ্রী সহজভাবে বাজারজাত করার লক্ষ্যে সরকার অধীনস্থ জি ই এম (গভর্নমেন্ট ই-মার্কেট)-এর মাধ্যমে সরাসরি ক্রয় বিক্রয় করার ব্যবস্থা নিয়েছেন৷
মুখ্যমন্ত্রী এই জি ই এম-এর মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করে ছোট ছোট স্ব-উদ্যোগীদের সরাসরি ক্রয় বিক্রয়ের এই সুুবিধা নেওয়ার উপর গুরুত্বারোপ করেন৷ তিনি বলেন, রাজ্যে রেল সংযোগের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি এসেছে৷ সেই সঙ্গে জলপথেও যোগাযোগের ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে৷ পরিবহণ খরচ কমে গেলে রাজ্যে শিল্পায়ন ঘটবে৷ সেই দিশাতেই রাজ্য সরকার সোনামুড়ায় গোমতী নদীতে জেটি নির্মাণ করে আগামী ১ বছরের মধ্যে জলপথে পণ্যবাহী জাহাজ রাজ্যে প্রবেশ করানোর জন্য উদ্যোগী হয়েছে৷ এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শিল্পপতিরা শিল্পায়নে উদ্যোগী হয়ে উঠবেন৷ কারণ আমাদের রাজ্যে শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, দক্ষতা সম্পন্ন কারিগর এবং উদার মানসিকতা সম্পন্ন সরকার রয়েছে৷ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দিশাকে সামনে রেখে ত্রিপুরা মডেল স্টেট হয়ে উঠবে বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন৷ মুখ্যমন্ত্রী এবছর নয়াদিল্লিতে প্রজাতন্ত্র দিবস অনুষ্ঠানে রাজ্যের ট্যাবলু প্রথম স্থান অধিকার করায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে এবং রাজ্যবাসীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন৷ অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী এ বছরের পদ্মশ্রী প্রাপক রাজ্যের রশেম বাদক শিল্পী থাংগা ডার্লংকে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় ঘর এবং মুখ্যমন্ত্রী ত্রাণ তহবিল থেকে দেড় লক্ষ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দেন৷ অনুষ্ঠানে শিল্পীকে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে মারক উপহার দিয়ে সংবর্ধনা জানান মুখ্যমন্ত্রী৷
অনুষ্ঠানে ত্রিপুরা শিল্প উন্নয়ন নিগম লিমিটেডের চেয়ারম্যান টিংকু রায় বলেন, অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় রাজ্য যেন পিছিয়ে না পড়ে সেই উদ্দেশ্যে এই সেন্টারটি চালু করা হচ্ছে৷ সমস্ত আধুনিক সুুযোগ সুুবিধা সম্পন্ন এই হলটি গড়ে তোলা হয়েছে৷ আন্তর্জাতিক স্তরে সেমিনার, প্রদর্শনী আয়োজন করার জন্য যে সুুযোগ সুুবিধা প্রয়োজন তার সব ব্যবস্থা এই সেন্টারটিতে করা হয়েছে৷ অনুষ্ঠানে বিধায়ক রামপ্রসাদ পাল বলেন, এই পরিকাঠামোর মাধ্যমে হাপানিয়া এলাকার মানুষের বিশ্বের মানুষের কাছে পরিচয়ের সুুযোগ তৈরি হয়েছে৷ অনুষ্ঠানে এছাড়া বক্তব্য রাখেন শিল্প ও বাণিজ্য দপ্তরের প্রধান সচিব এল এইচ ডার্লং৷ স্বাগত ভাষণ দেন শিল্প ও বাণিজ্য দপ্তরের অধিকর্তা সন্দীপ আর রাঠোর৷ ধন্যবাদসূচক বক্তব্য রাখেন ত্রিপুরা শিল্প উন্নয়ন নিগম লিমিটেডের ও এস ডি বাস্তুকার রাজেশ কুমার দাস৷ এছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের রশেম শিল্পী পদ্মশ্রী প্রাপক থাংগা ডার্লং৷ অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রীর হাতে একটি রশেম বাদ্যযন্ত্র তুলে দেন পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত রাজ্যের রশেম শিল্পী থাংগা ডার্লং৷
উল্লেখ্য, ২৮৩ একর এলাকা জড়ে নির্মিত এই আধুনিক সুুবিধাযুক্ত আন্তর্জাতিক ইণ্ডোর প্রদর্শনী কেন্দ্রটি নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে ৬৬৫২ কোটি টাকা৷ এর মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের ১৬ কোটি এবং রাজ্য সরকারের প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে৷ এই প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ৬৬০০ বর্গমিটার আয়তন বিশিষ্ট শীততাপ নিয়ন্ত্রিত প্রদর্শনী কেন্দ্র, ৪২০০ বর্গমিটার আয়তন বিশিষ্ট শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবসা কেন্দ্র, ২৫০ আসন বিশিষ্ট অডিটোরিয়াম, ৩৭০ বর্গমিটার এলাকায় রেস্টুরেন্ট, সভাকক্ষ এবং অফিস কক্ষ, থাকার সুুবিধা, ৩০০ বর্গমিটার এলাকা জড়ে মাল্টিপারপাস (বহুমুখী) হল, পোডিয়াম, এইচ ভি এ সি ইউনিট-এর পরিষেবার জায়গা, ইলেকট্রিক্যাল রুমস, বি এস এন এল অফিস৷ অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী ত্রিপুরা দক্ষতা উন্নয়ন দপ্তর এবং ত্রিপুরা পর্যটন উন্নয়ন নিগমের প্রদর্শনী স্টলগুলির ফিতা কেটে উদ্বোধন করেন৷