নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ২৯ জানুয়ারি ৷৷ জ্বলন্ত বিষয়াবলি যেগুলি মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে সেগুলি থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে রাখবার উদ্দেশ্যে সংসৃকতির নামে এখন উদ্যমতা চলছে৷ রবিবার রাজ্যভিত্তিক লোক সংসৃকতি উৎসবের মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার এনিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন৷ বলেন, সংসৃকতিকে পরিকল্পিতভাবে কব্জা করার প্রয়াস চলছে৷ আর তাতে মিডিয়া বিশেষ করে ইলেকট্রনিক মিডিয়া এইভাবে নব প্রজন্মের মননে এবং চিন্তনকে নিয়ন্ত্রণে রাখার অপ্রয়াস অব্যাহত রেখেছে৷
সংসৃকতি নিয়ে যখন আলোচনা তখন মুখ্যমন্ত্রী যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণভাবে এর অপসংসৃকতিতে রূপান্তরের বিষয়ে চিন্তা ব্যক্ত করেছেন৷ তাঁর বক্তব্য, লোকসংসৃকতি হচ্ছে শিক্ষা ও সংসৃকতির যে সৌধ তার মূল ভিত্তি৷ কিন্তু একশবছর আগে যা ছিল সেটাকেই বহন করে চলতে হবে, এই ভাবনা নিয়ে চললে সংসৃকতির মূল চিন্তা তার পরিপন্থী হবে৷ মুখ্যমন্ত্রী মনে করেন, সংসৃকতি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনা৷ কিন্তু তথাকথিত উত্তর আধুনিকতার কথা এখন যেটা বলা হচ্ছে এর দৌলতে আমরা যা দেখছি তাতে অতীত ভুলিয়ে দিয়ে বর্তমান জীবন সমাজের যার জ্বলন্ত বিষয়াবলি জীবনকে প্রভাবিত করছে তার থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে রাখবার উদ্দেশ্যে সংসৃকতির নামে এখন উদ্যমতা চলছে৷ একটা বিকৃত মানসিকতা তৈরির চেষ্টা চলছে৷ বিশেষ করে নব প্রজন্মকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা হচ্ছে৷ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, তাতে আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতা, অসহিষ্ণুতা এবং একই সাথে ঘৃণা, বিদ্বেষ, লোভ, প্রলোভন যেগুলি মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী সে নেতিবাচক দিকগুলি পরিলক্ষিত হচ্ছে৷ তাঁর বক্তব্য, এই ভাবনা থেকে শুধু আমাদের দেশ নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরে শিক্ষা ও সংসৃকতির অঙ্গনকে কব্জা করার জন্য পরিকল্পিত প্রয়াস চলছে৷ আর তাতে মিডিয়া বিশেষ করে ইলেকট্রনিক মিডিয়া যেটা বিজ্ঞানের অসাধারণ আবিষ্কার তাকে কব্জা করার কাজ করছে৷ কারণ, পঁুজিপতিদের পরিচালনায় মিডিয়াগুলি তাদের মতো করে আমাদের নব প্রজন্মে মননে এবং চিন্তনকে নিয়ন্ত্রণে রাখবার অপপ্রয়াস অব্যাহত রেখেছে৷ তাই মুখ্যমন্ত্রী চর্চার মধ্য দিয়ে নতুন নতুন ভাবনা বিষয়কে অঙ্গীভূত করে সংসৃকতিতে সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর এবং সুরক্ষিত করার চেষ্টা যেমন করতে হবে তেমনই সেটাকে ধরে যা কিছু নতুন ভাবনা সেটা দেখে নিয়ে কোনটা সহায়ক নির্ধারণ করার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন৷
এই পরিপ্রেক্ষিতেই রাজ্যে যে সব শিল্পীরা লোক সংসৃকতির সাথে যুক্ত তাদেরকে নিয়ে মানবিক মূল্যবোধের চেতনাকে প্রসারিত করতে একটা নতুন আঙ্গিকে গ্রামস্তর থেকে লোক সংসৃকতি উৎসবের সূচনা করতে হল৷ তথ্য ও সংসৃকতি দপ্তর এই কাজটা শুরু করেছে৷ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এই কাজে মাটির কাছাকাছি যারা আছেন তারা একটি একটি কঠিন গুরু দায়িত্ব পালন করছেন৷ তথ্য ও সংসৃকতি দপ্তর এখানে পরিচালনার ভূমিকায় কাজ করছে৷
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এই কর্মসূচীতে সাফল্য আছে৷ মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার এই ধরণের কর্মকান্ডে শহরবাসীদের মাটির কাছাকাছি থাকা সংসৃকতিকেও যুক্ত করতে দপ্তরকে পরামর্শ দেন৷ নগর পঞ্চায়েত ও পুর পরিষদ এলাকার ওয়ার্ডগুলিকে নিয়েও এ ধরণের অনুষ্ঠান করা যেতে পারে৷ প্রতি বছর না হলেও এক বছর অন্তর তথও ও সংসৃকতি দপ্তর শুধু গ্রাম স্তরে যেন এ ধরণের লোক সংসৃকতি উৎসবের আয়োজনের উদ্যোগ নেয়৷ এতে সুস্থ সংসৃকতির পরিবেশকে কলুষিত করার যে প্রয়াস চলছে তার বিরুদ্ধে নিঃসন্দেহে এক সদর্থক ভূমিকা নিতে পারবে৷
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সংসৃকতি হচ্ছে আকাশের মতো আদিগন্ত৷ সমুদ্রের মতো প্রসারিত৷ একে খন্ডিত করা যায় না৷ তিনি বলেন, আমাদের যে বর্ণময় সংসৃকতি রয়েছে তার সবকটা দিককেই বিকশিত করতে হবে৷ এতেই আমাদের একতা সুস্থিতি ও চেতনা সুসংবদ্ধ হবে৷ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এই কাজ শুরু হয়েছে তথ্য ও সংসৃকতি দপ্তরকে আন্তরিতার সাথে তাকে এগিয়ে যেতে হবে৷ তাহলেই আরও বড় সাফল্য আসবে৷ সংসৃকতিতে আমাদের যে সম্ভাবনা এখনো লুকিয়ে আছে তাকে মঞ্চে নিয়ে আশা সম্ভব হবে৷
মুখ্যমন্ত্রী আরো বলেন, লোক সংসৃকতি হচ্ছে জীবনের সংসৃকতি৷ পৃথিবীতে যা কিছু ঘটছে আবর্তিত বিবর্তিত হচ্ছে তা জীবনকে কেন্দ্র করেই৷ এতে আনন্দ আছে, সুখ আছে, দুঃখ আছে, বেদনা আছে-আছে স্বপ্ণ৷ এই নিয়েই জীবন৷ এর থেকে মনের ভাব ব্যক্ত করতে কেউ ছবি আঁকেন, কেউ নৃত্যে বা সুরে তার অব্যক্ত ভাবনা উপস্থিত করেন৷ এখানে লেগে থাকে মাটির সুর৷ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, লোক সংসৃকতিই হচ্ছে শিক্ষা সংসৃকতির যে সৌধ তার মূল ভিত্তি৷ একে সুসংহত করা না গেলে আমাদের নানা ধরণের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হবে৷ জীবন বর্জিত সংসৃকতির যে চর্চা তা থেকে আমাদের শিশু কিশোর যুবক যুবতীদের বের করে আনতে তাদের জীবনের মূল ধারার সাথে যুক্ত করতে এ ধরণের লোক সংসৃকতি উৎসবের প্রাসঙ্গিকতা আছে৷
উদ্বোধনী অনুষ্টানের সভাপতি তথ্য ও সংসৃকতি মন্ত্রী ভানুলাল সাহা বলেন, লোক সংসৃকতির সংরক্ষণ ও প্রসারণে রাজ্য সরকার এক পরিকল্পিত উদ্যোগ নিয়ছে৷ লোক সংসৃকতি উৎসব প্রথমে শুরু হয় গ্রাম পঞ্চায়েত ও এডিসি ভিলেজ স্তরে৷ রাজ্যের ৯৯১টি স্থানে এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে৷ ৫৮টি ব্লকে ব্লক ভিত্তিক ও ৮টি জেলায় জেলা ভিত্তিক অনুষ্ঠানের পর রাজ্য ভিত্তিক উৎসব আজ শুরু হল৷ ব্লক স্তরে ৯২২৯ জন ও জেলাস্তরে ১৮১৭ জন লোকশিল্পী অংশ নিয়েছেন৷ তথ্য ও সংসৃকতি মন্ত্রী বলেন, আধুনিকতার নামে সংসৃকতির বাণিজ্যকরণের বিরুদ্ধে এর প্রয়াস এই লোক সংসৃকতি উৎসব৷ তিনি বলেন, রাজ্যের নব প্রজন্মের একটা বড় অংশ এই লোক সংসৃকতি উৎসবে অংশ নিয়েছেন৷ তথ্য ও সংসৃকতি দপ্তর লোক শিল্পীদের নাম নথীভুক্ত করেছে৷ আগামীদিনে লোক সংস্কৃতির বিকাশে একটা বৃহৎ পরিকল্পনা নিতেই এই উদ্যোগ৷ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ত্রিপুরা উপজাতি এলাকা স্বশাসিত জেলা পরিষদের মুখ্য কার্যনির্বাহী সদস্য রাধাচরণ দেববর্মা বলেন, ভিলেজ ও গ্রামস্তর থেকে লোক সংসৃকতির বিকাশে এই প্রচেষ্টা একটা অসাধারণ পদক্ষেপ৷ লোক সংসৃকতি মানুষের মনন-জীবন ও কৃষ্টির সাথে জড়িতগ্গ স্বাগত ভাষণে তথ্য ও সংসৃকতি দপ্তরের বিশেষ সচিব এম এল দে বলেন, তথ্য ও সংসৃকতি দপ্তর রাজ্যের সংসৃকতির বিকাশে কাজ করছে৷ লুপ্তপ্রায় সংসৃকতির পুনরুজ্জীবনে প্রচেষ্টা নিয়েছে দপ্তর৷ লোক সংসৃকতি উৎসব তারই অঙ্গ৷ এই উৎসবে রাজ্যের গ্রাম পঞ্চায়েত ও এডিসি ভিলেজ স্তরে ২৬ হাজার ৪০৯ জন লোকশিল্পী অংশ নিয়েছেন৷
ঐতিহ্যমন্ডিত এই উৎসবের উদ্বোধন করেন সংগীত নাটক একাডেমী পুরস্কার প্রাপ্ত রাজ্যের বিশিষ্ট লোক শিল্পী থাঙ্গা ডার্লং৷ তথ্য ও সংসৃকতি দপ্তরের উদ্যোগে রাজ্যে গত ১৫ নভেম্বর থেকে প্রথমে শুরু হয় গ্রাম পঞ্চায়েত ও এডিসি ভিলেজ ভিত্তিক লোক সংসৃকতি উৎসব৷ এরপর ব্লক ও জেলা স্তরে অনুষ্ঠিত হয় ব্লক ও জেলা ভিত্তিক লোক সংসৃকতি উৎসব৷ জেলা স্তর থেকে নির্বাচিত রাজ্যের ৮টি জেলার ২৪০ জন লোক শিল্পী অংশ নিচ্ছেন তিনদিন ব্যাপী লোক সংসৃকতি উৎসবে৷ আজ প্রথম দিনে দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলা ও ধলাই জেলার লোক শিল্পীবৃন্দ তাদের অনুষ্ঠান পরিবেশন করেন৷ ৩০ ও ৩১ জানুয়ারী ৬টি জেলার লোক শিল্পীবৃন্দ তাদের অনুষ্ঠান পরিবেশন করবেন৷ আজ সন্ধ্যায় সমবেত বাউল সুরের মূর্ছনায় ও সমবেত যাদু কলিজার সুরে উদ্বোধন হল রাজ্য ভিত্তিক লোক সংসৃকতি উৎসবের৷ পরিবেশন করেন সজল বাউলের নেতৃত্বে রাজ্যের বিশিষ্ট বাউল শিল্পীগণ ও খুমুলুঙ ফোক মিউজিক কলেজের শিল্পীগণ৷
উৎসবের উদ্বোধন করে রাজ্যের প্রবীণ লোক শিল্পী থাঙ্গা ডার্লং বলেন, এই অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ জানানোয় আমি খুশি৷ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার আরো বলেন, সংসৃকতি কখনো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না৷ তা পল্লবিত হয়৷ বিকশিত হয় জীবনের ধারায়৷
2017-01-30

