নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ৯ অক্টোবর: শুরু থেকেই ত্রিপুরা গ্রামীণ জীবিকা মিশন গ্রামীন স্ব- সহায়ক (গ্রেস, এইচ. জি) সদস্যাদের জীবিকা ও পারিবারিক আয় বাড়াতে নিরলসভাবে কাজ করে আসছে। গত ১৩ বছরে মিশন ৮টি জেলার ৫৮টি ব্লকের প্রত্যন্ত এলাকার ৪৯ লক্ষেরও বেশি পরিবারের কাছে পৌঁছেছে। বর্তমানে মহিলা স্ব- সহায়ক দলের সদস্যরা যাতে আরও ভালো আয় করতে পারেন, সেজন্য ত্রিপুরা গ্রামীণ জীবিকা মিশন নতুন উদ্যোগ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাজারের সঙ্গে সংযোগের ওপর জোর দিচ্ছে।
ত্রিপুরায় তাঁতবুননের ঐতিহ্য অনেক পুরনো ও সমৃদ্ধ। বিশেষ করে উত্তর ত্রিপুরা উনকোটি ও ধলাই জেলার জনজাতি ও গ্রামীণ সম্প্রদায়ের মধ্যে এই ঐতিহ্য রয়েছে। এখানকার কাপড় ঐতিহ্যবাহী নকশা এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক উৎপাদন রাজ্যের সংস্কৃতির অংশ, আর হাজার হাজার গ্রামীণ মহিলা পরিবারের জীবিকায় এগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ত্রিপুরা গ্রামীণ জীবিকা মিশন এর অধীনে বহু মহিলা তাঁতবুননের কাজ করেন, কেউ প্রধান জীবিকা হিসেবে, কেউ বাড়তি আয়ের উৎস হিসেবে। ত্রিপুরার তাঁতজাত পণ্যকে আঞ্চলিক ও জাতীয় বাজারে পৌঁছে দিতে ত্রিপুরা গ্রামীণ জীবিকা মিশন ইতিমধ্যে ত্রিপুরার রিসা এবং ত্রিপুরার পাছড়া/রিগনাইকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জি, আই) স্বীকৃতির আওতায় নথিভুক্ত করতে সহায়তা করেছে। তবুও মহিলা তাঁতিদের এখনও কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। আধুনিক প্রযুক্তির সুযোগ তাঁদের সীমিত। নকশার উন্নয়ন, পণ্যের বৈচিত্র্য, ব্র্যান্ডিং, বাজাবের সঙ্গে সংযোগ এবং ডিজিটাল বাণিজোর ক্ষেত্রেও তাঁদের সহায়তা প্রয়োজন। অনেকের উদ্যোক্তা-দক্ষতা আরও বাড়ানো এবং আধুনিক ব্যবসা পদ্ধতি সম্পর্কে ভালো ধারণা তৈরি করাও জরুরি। এই ঘাটতির কারণে দলের দিদিরা এতদিন ভালো বাজারে পৌঁছতে পারেননি এবং তাঁদের শিল্পকর্মের ন্যায্য দামও পাননি।
এই সমস্যাগুলি কাটিয়ে উঠতে এবং মহিলা স্ব- সহায়ক দুলের সদস্যাদের পাশে দাঁড়াতে ৫ অক্টোবর আগরতলার হোটেল পোলো টাওয়ার্সে ত্রিপুরা গ্রামীণ জীবিকা মিশন ও আই আই টি রুরকির সঙ্গে মোট ২,২৪ কোটি টাকা বাজেটের একটি সমঝোতা স্মারক (এম ও ইউ) স্বাক্ষর করেছে। ত্রিপুরা গ্রামীণ জীবিকা মিশন-এর তাঁতশিল্পের সঙ্গে যুক্ত মহিলা স্ব সহায়ক দলের সদস্যদেব জন্য এটি একটি বড় দিন এবং ত্রিপুরায় মহিলা পরিচালিত তাঁত উদ্যোগ শক্তিশালী করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ত্রিপুরা গ্রামীণ জীবিকা মিশন-এর পক্ষে সংস্থার সি ই ও তড়িৎ কান্তি চাকমা এবং আই আই টি রুরকির পক্ষে সহকারী অধ্যাপক ডঃ বিভূতি রঞ্জন ভট্টাচার্য স্মারকে স্বাক্ষর করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ত্রিপুরা সরকারের গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের সচিব অভিষেক সিং এবং আই আই টি রুরকির ডিজাইন বিভাগের প্রধান প্রফেসর অপূর্ব কুমার শর্মা আই আই টি রুরকির ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের দুই সহকারী অধ্যাপক ডঃ কল্পক কুলকার্নি ও ডঃ সৌরভঅরোরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ত্রিপুরা গ্রামীণ জীবিকা মিশন-এর সি ও ও ডঃ দীপায়ন ঘোষ। অনুষ্ঠানে এছাড়া ত্রিপুরা গ্রামীণ জীবিকা মিশন-এর রাজা দপ্তরের অন্যান্য আধিকারিকরাও উপস্থিত ছিলেন।
স্ব- সহায়ক দলের সদস্যাদের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই এই তিন বছরের অংশীদারিত্ব। দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আই আই টি রুরকির প্রযুক্তি নকশা, উপাদান বিজ্ঞান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও ব্যবসা ব্যবস্থাপনার দক্ষতা কাজে লাগিয়ে ত্রিপুরা গ্রামীণ জীবিকা মিশন এই কাজ করবে। লক্ষ্য হল ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও আধুনিক উদ্যোগকে কাছাকাছি আনা, যাতে তাঁতবুনন এমন একটি জীবিকা হয়ে ওঠে যা
ক্রমশ বাড়তে পারে। এই অংশীদারিত্বের আওতায় উত্তর ত্রিপুরা, উনকোটি ও ধলাই জেলার ৫০০ জন মহিলা স্ব- সহায়ক দলের সদস্যা যুক্ত হবেন। কাজ হবে পাঁচটি ক্ষেত্রে। প্রথমতঃ তাঁতিরা উন্নত তাঁত, যন্ত্রপাতি এবং কাজের প্রক্রিয়ার স্বয়ংক্রিয়করণের সুবিধা পাবেন। দ্বিতীয়তঃ নকশা, মান নিয়ন্ত্রণ, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন বিষয়ে তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তৃতীয়তঃ তাঁদের পণ্যের জন্য আলাদা ব্র্যান্ড পরিচিতি এবং বাজারের উপযোগী প্যাকেজিং তৈরি করা হবে। চতুর্থতঃ উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচির (ইডিপি) মাধ্যমে উদ্যোগ শুরু ও পরিচালনার প্রয়োজনীয় দক্ষতা গড়ে তোলা হবে। পঞ্চমতঃ ডিজিটাল সাক্ষরতা, ই কমার্স এবং বর্তমান যুগের বাজারে প্রবেশের সুযোগসহ আধুনিক ব্যবসা পদ্ধতির সঙ্গে তাঁতিদের পরিচয় করানো হবে। কর্মসূচির শেষে ২৫০টি বাণিজ্যিক তাঁত উদ্যোগ গড়ে তোলা এবং ২৫০ জন তাঁতিকে (মহিলা স্ব- সহায়ক দলের সদস্যা) ডিজিটাল ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। এছাড়া ৮০টি আধুনিক ও ফিউশন নকশা তৈরি এবং ২০ জন ক্রেতার সঙ্গে তাঁতিদের সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যও রয়েছে। তৃতীয় বছরের শেষে স্ব- সহায়ক দলের সদস্যাদের আয় ৩০ শতাংশ বাড়বে বলে, অনুমান করা হচ্ছে। অনুষ্ঠানে সকলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ত্রিপুরা গ্রামীণ জীবিকা মিশন-এর ডেপুটি সিইও টিটু দেববর্মা।