নয়াদিল্লি, ১৩ আগস্ট (আইএএনএস): অপারেশন সিঁদুরে পাকিস্তানের বড় ধাক্কার পর জম্মু ও কাশ্মীরে নিজেদের ওভারগ্রাউন্ড ওয়ার্কার (ওডব্লিউজি) নেটওয়ার্কে বড়সড় পরিবর্তন এনেছে পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, পুরনো নেটওয়ার্ক ভেঙে দিয়ে এবার ১৫-১৬ বছর বয়সি কিশোর-কিশোরীদের, এমনকি মেয়েদেরও, ওডব্লিউজি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
গত বছর পাহেলগামে জঙ্গি হামলার জবাবে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী অপারেশন সিঁদুর চালায়। ওই অভিযানে পাকিস্তান ও পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে জঙ্গি পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে বড়সড় অভিযান চালানো হয়। এর পরেই পাকিস্তান জইশ-ই-মহম্মদ (জেইএম), লস্কর-ই-তইবা (এলইটি) এবং হিজবুল মুজাহিদিনের সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামো পুনর্গঠনের পাশাপাশি ওডব্লিউজি নেটওয়ার্কেও পরিবর্তন আনে বলে কর্মকর্তাদের দাবি।
গোয়েন্দা সূত্রের মতে, আগে জইশ ও লস্করের মতো জঙ্গি সংগঠনগুলির আলাদা ওডব্লিউজি নেটওয়ার্ক থাকত এবং তাদের কাজের মধ্যে কোনও ওভারল্যাপ থাকত না। পুরনো ওডব্লিউজিদের সংশ্লিষ্ট জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে আদর্শগত যোগসূত্রও ছিল এবং সংগঠনের নেতৃত্ব ও স্থানীয় হ্যান্ডলারদের সম্পর্কে তাদের বিস্তৃত জ্ঞান ছিল।
তবে পুরনো নেটওয়ার্কের অধিকাংশ সদস্যের পুলিশের কাছে রেকর্ড থাকায় নিরাপত্তা সংস্থাগুলির পক্ষে তাদের চিহ্নিত ও নজরদারি করা তুলনামূলকভাবে সহজ ছিল। সেই কারণেই আইএসআই পুরনো নেটওয়ার্ক ভেঙে নতুন সদস্য নিয়োগের পথে হাঁটেছে বলে দাবি গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের।
নতুন ওডব্লিউজিদের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হল, তাদের একাধিক কাজের পরিবর্তে নির্দিষ্ট একটি কাজ দেওয়া হয়। কাজ শেষ করার পর তারা সরে যায়। ফলে নিরাপত্তা সংস্থাগুলির পক্ষে তাদের শনাক্ত করা এবং ভবিষ্যৎ কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এক গোয়েন্দা ব্যুরো কর্মকর্তার দাবি, নতুন ওডব্লিউজিদের মূলত ছোট অস্ত্রের চালান, বিশেষ করে একটি বা দুটি পিস্তল নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। বড় আগ্নেয়াস্ত্র, যেমন একে-৪৭, বহনের দায়িত্ব তাদের দেওয়া হচ্ছে না।
কর্মকর্তাদের মতে, অস্ত্র এক ওডব্লিউজির হাতে পৌঁছনোর পর তাকে নির্দিষ্ট একটি জায়গায় তা পৌঁছে দিতে বলা হয়। সেখানে অন্য এক ওডব্লিউজি অস্ত্রটি গ্রহণ করে তা আরও একজনের হাতে তুলে দেয়। শেষপর্যন্ত একজন এজেন্টের মাধ্যমে অস্ত্র হামলা চালানোর জন্য নির্ধারিত ব্যক্তির কাছে পৌঁছয়।
কখনও একটি অস্ত্রের চালান তিনবার, আবার কখনও চার-পাঁচটি হাত বদল করে বলে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি। এর ফলে নিরাপত্তা সংস্থাগুলির পক্ষে গোটা চক্রের গতিবিধি অনুসরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। নতুন সদস্যদের নামে কোনও পুরনো রেকর্ড না থাকায় এবং ভবিষ্যতে তাদের আর কাজে না লাগানোর কৌশলের ফলে তাদের শনাক্ত করাও আরও কঠিন হচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, খুব অল্প পরিমাণে অস্ত্র নির্দিষ্ট স্থান থেকে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেওয়ার কৌশলে সাফল্যের সম্ভাবনা বেশি এবং ধরা পড়ার আশঙ্কা কম। তাঁদের দাবি, উপত্যকায় বড়সড় হামলার পরিবর্তে পিস্তল ব্যবহার করে বেছে বেছে হত্যাকাণ্ড চালানোই পাকিস্তানের বর্তমান কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে।
কাশ্মীরে সাম্প্রতিক দুটি হামলা, যেখানে এক হেড কনস্টেবল এবং দুই পরিযায়ী শ্রমিক নিহত হন, আইএসআইয়ের এই কৌশলের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে সন্দেহ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের। তবে ছোট হামলার পাশাপাশি আইএসআই জঙ্গলযুদ্ধের দিকেও নজর দিচ্ছে বলে তাঁদের আশঙ্কা।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, উপত্যকার ঘন জঙ্গলে বেশ কয়েকজন জঙ্গি লুকিয়ে থাকতে পারে। দুর্গম ভূখণ্ড ও ঘন গাছপালার কারণে সেখানে নিরাপত্তা অভিযান পরিচালনা এবং জঙ্গিদের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এছাড়াও, জঙ্গিরা চীনে তৈরি ‘আল্ট্রা সেট’-এর মতো যোগাযোগ সরঞ্জাম ব্যবহার করছে বলে কর্মকর্তাদের দাবি। এগুলিতে স্মার্টফোনের বিভিন্ন সুবিধার সঙ্গে সামরিক মানের রেডিও প্রযুক্তি যুক্ত রয়েছে। এর মাধ্যমে স্থানীয় টেলিকম নেটওয়ার্ক বা সিম কার্ড ব্যবহার না করেও যোগাযোগ করা সম্ভব বলে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি।
কর্মকর্তাদের মতে, এই ডিভাইসগুলি সরাসরি একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ না করে রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে ছোট আকারের এনক্রিপ্টেড ডেটা পাঠায়। সেই তথ্য সীমান্তের ওপারে রিলে স্টেশন এবং অন্যান্য যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে পাকিস্তানে থাকা মাস্টার সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বলে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি।
— আইএএনএস



















