আগরতলা, ১০ আগস্ট: কেন্দ্র ও রাজ্যে বিজেপি সরকারের আমলে সাধারণ মানুষের উপর করের বোঝা বৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানির অতিরিক্ত মূল্য এবং বিদ্যুৎ পরিষেবাকে ক্রমশ ব্যয়বহুল করে তোলার অভিযোগ তুলল ত্রিপুরা প্রদেশ কংগ্রেস। সোমবার এক বিবৃতিতে দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সরকারের বিভিন্ন নীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
প্রদেশ কংগ্রেসের অভিযোগ, জিএসটি চালুর পর বিভিন্ন ক্ষেত্রে করের বোঝা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক গ্যাসসহ জ্বালানিতে উচ্চ শুল্ক সাধারণ মানুষের উপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। একইসঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে কর্পোরেট স্বার্থের অনুকূলে বেসরকারিকরণের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়। সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রেও সরকারের কাঠামোর উপর নির্ভর করে বেসরকারি কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে কংগ্রেস।
ত্রিপুরায় স্মার্ট মিটার ও প্রিপেইড বিলিং ব্যবস্থা নিয়েও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে দলটি। কংগ্রেসের দাবি, কোথাও ১,০০০ টাকা রিচার্জ করার পর মাত্র কয়েক ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরই ফের রিচার্জ করতে হচ্ছে, আবার কোথাও ১,২০০ টাকা রিচার্জ করেও অল্প ব্যবহারের পর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এই ধরনের অভিযোগের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা কর্তৃপক্ষ দিতে পারেনি বলে দাবি করা হয়। গত সাড়ে আট বছরে বিদ্যুতের মাসুল ও বিভিন্ন নামে একাধিক চার্জ বৃদ্ধিরও সমালোচনা করেছে প্রদেশ কংগ্রেস।
দলের অভিযোগ, নিম্নমানের পরিষেবা, অস্বাভাবিক বিল এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আদায়ের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পাশাপাশি দিনের পর দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অঘোষিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে পানীয় জল সরবরাহ, হাসপাতাল, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ জনজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ট্রান্সফরমারের ঘাটতি, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লাইনে ত্রুটি কিংবা ভূগর্ভস্থ কেবলের সমস্যাকে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণ হিসেবে দেখানো হলেও প্রকৃত সমস্যা হিসেবে দুর্নীতি, অব্যবস্থা, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মীর অভাব, প্রকৌশলীর ঘাটতি এবং পরিকল্পনাহীনতাকে দায়ী করেছে কংগ্রেস।
প্রদেশ কংগ্রেসের দাবি, একসময় ত্রিপুরা উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করে অন্য রাজ্যেও বিদ্যুৎ বিক্রি করতে সক্ষম ছিল এবং বিদ্যুৎ নিগমের প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত ছিল। বর্তমানে সেই নিগম প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা ঋণের বোঝায় জর্জরিত এবং ঠিকাদারদের শত শত কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে বলে অভিযোগ। গত সাড়ে আট বছরে নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত না হওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরে রাজ্য সরকারের বিদ্যুৎ নীতির সমালোচনা করা হয়েছে।
কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অবিলম্বে স্মার্ট মিটার বাতিল করে ইতিমধ্যে বসানো মিটার তুলে নেওয়া এবং প্রিপেইড বিলিং ব্যবস্থা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহারের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ বিলিং ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি বিদ্যুৎ নিগমের বিলিং ও কালেকশনসহ বিভিন্ন নন-টেকনিক্যাল কাজে যুক্ত কর্মীদের কর্মসংস্থান সুরক্ষিত রাখার দাবি করা হয়। প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োগ, যোগ্য প্রকৌশলীসহ সমস্ত শূন্যপদ পূরণ এবং ২০১৮ সালের পর থেকে আরোপিত অযৌক্তিক চার্জ বাতিলেরও দাবি জানানো হয়েছে।
গত সাড়ে আট বছরে বাড়ানো বিদ্যুৎ মাসুল প্রত্যাহার করতে হবে অথবা গরিব, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলিকে ভর্তুকির মাধ্যমে অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা থেকে রক্ষা করতে হবে বলে দাবি করেছে প্রদেশ কংগ্রেস। অন্যথায় রাজ্যবাসীকে সঙ্গে নিয়ে গণপ্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ই২০ পেট্রোল নিয়েও কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্যের সমালোচনা করেছে কংগ্রেস। দলের অভিযোগ, ইথানল মেশানো না হলে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের কারণে পেট্রোলের দাম আরও বাড়ত বলে কেন্দ্র যে যুক্তি দিচ্ছে, তা দিয়ে সাধারণ মানুষের অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি আড়াল করা যায় না। একইসঙ্গে ই২০ ব্যবহারের কারণে গাড়ি ও বাইকের মাইলেজ কমে যাওয়ার দায়ও কার্যত ব্যবহারকারীদের উপর চাপানো হচ্ছে বলে অভিযোগ।
প্রদেশ কংগ্রেসের দাবি, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২৪ ডলার কমার সময়ও দেশে পেট্রোলের দাম কমানো হয়নি। গত তিন বছরে ই২০ ব্যবহারের ফলে কম মাইলেজের কারণে পেট্রোল ব্যবহারকারীদের আনুমানিক ৮৮,২৩৪ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলে দাবি করেছে দলটি। সরকারি তথ্যের উল্লেখ করে কংগ্রেসের দাবি, ইথানল পেট্রোলের তুলনায় কম শক্তি উৎপন্ন করে এবং ই২০ ব্যবহারে গড়ে প্রায় ৫ শতাংশ মাইলেজ কমে। শুধু গত অর্থবর্ষেই এর ফলে সাধারণ মানুষের প্রায় ৩৭,৮৪৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
আমেরিকায় ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল ব্যবহারের উদাহরণ দেখিয়ে ভারতের বাস্তব পরিস্থিতিকে আড়াল করা যায় না বলেও মন্তব্য করেছে প্রদেশ কংগ্রেস। তাদের দাবি, সেখানে ইথানল ব্যবহারে সরকারি ভর্তুকি এবং ই২০-উপযোগী যানবাহনের ব্যবস্থা রয়েছে। তাই সাধারণ মানুষের পকেটের উপর অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে স্মার্ট মিটার-প্রিপেইড বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং ই২০-এর মতো নীতিকে জনস্বার্থবিরোধী আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে ত্রিপুরা প্রদেশ কংগ্রেস।



















