আগরতলা, ১২ জুলাই: রাজ্যে মাদক কারবার ও নেশার বিরুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষকে একযোগে লড়াইয়ে শামিল হয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করতে আহবান জানালেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা। রবিবার মহারাণী তুলসীবতী বালিকা বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রায় ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কর্পোরেট ধাঁচের ৫০ শয্যা বিশিষ্ট ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী আগরতলা সিভিল হাসপাতাল-এর উদ্বোধন করে তিনি এই আহ্বান জানান। রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবাকে আরও আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও জনবান্ধব করে তুলতে নতুন পদক্ষেপ নিল ত্রিপুরা সরকার।
রবিবার আগরতলায় ৫০ শয্যা বিশিষ্ট ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী আগরতলা সিভিল হাসপাতাল-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা। প্রায় ২০ কোটি ৩৭ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই হাসপাতালটি সম্পূর্ণ পেপারলেস (কাগজবিহীন) ব্যবস্থায় পরিচালিত হবে, যা রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে আশা প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্য সরকার মাদক কারবারি ও নেশাগ্রস্ততার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়ে কঠোরভাবে কাজ করছে। তবে শুধুমাত্র প্রশাসনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে এই সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে এগিয়ে আসতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই মাদকমুক্ত ত্রিপুরা গড়ে তোলা সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, একসময় সরকারি হাসপাতালগুলোর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় ছিল। ভাঙাচোরা চেয়ার-টেবিল থেকে শুরু করে নানা ধরনের পরিকাঠামোগত সমস্যায় জর্জরিত ছিল হাসপাতালগুলি। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সরকারি হাসপাতালগুলিকে আধুনিকীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা দাবি করছি না যে সব কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। তবে ধাপে ধাপে আধুনিক স্বাস্থ্য পরিষেবা গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিরন্তর কাজ চলছে। আজকের এই হাসপাতাল উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।” মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই হাসপাতালটি আপাতত একটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে চালু করা হয়েছে। এটি সফল হলে রাজ্যের সমস্ত পুরসভা ও নগর পঞ্চায়েত এলাকায় একই ধরনের আধুনিক হাসপাতাল গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
তিনি বলেন, “ত্রিপুরায় একটি সমন্বিত বা ইন্টিগ্রেটেড হেলথ সিস্টেম গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। যেমন পঞ্চায়েত স্তরে ই-অফিস চালু করা সম্ভব হয়েছে, তেমনই স্বাস্থ্য পরিষেবাকেও সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, এই হাসপাতালটি সম্পূর্ণ কাগজবিহীন ব্যবস্থায় পরিচালিত হবে। দরিদ্র মানুষও যাতে উন্নতমানের স্বাস্থ্য পরিষেবা পান, সেই লক্ষ্যেই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও পরিকাঠামো নিয়ে হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়েছে।
হাসপাতালে থাকবে নাক-কান-গলা (ইএনটি), মেডিসিন ও স্ত্রীরোগ বিভাগের বহির্বিভাগ (ওপিডি), মাতৃ ও শিশু পরিচর্যা পরিষেবা, ছোট ও সাধারণ অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা, ৫০টি শয্যার প্রতিটিতে অক্সিজেন সংযোগ, পৃথক অক্সিজেন প্ল্যান্ট এবং জরুরি অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা। এছাড়াও পরিবেশ রক্ষায় হাসপাতাল প্রাঙ্গণে একটি এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) স্থাপন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এই হাসপাতাল চালু হওয়ায় আগরতলা ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের ছোটখাটো জরুরি চিকিৎসার জন্য অন্যত্র ছুটতে হবে না। প্রাথমিক পর্যায়েই অধিকাংশ চিকিৎসা এখানেই পাওয়া যাবে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্যের প্রতিটি হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। বর্তমানে ত্রিপুরায় প্রায় সব ধরনের চিকিৎসা পরিষেবাই উপলব্ধ হওয়ায় রেফার রোগীর সংখ্যা ৮৩ শতাংশ কমে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, রাজ্যে একটি আধুনিক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড হাসপাতাল গড়ে তোলা হচ্ছে এবং শুধু আগরতলাতেই নয়, প্রতিটি জেলায় মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য পরিষেবা সম্প্রসারণের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে ত্রিপুরায় সফলভাবে সাতটি কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই আরও দুটি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে হার্ট ও লিভার ট্রান্সপ্লান্ট পরিষেবা চালুর দিকেও সরকার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বলে জানান তিনি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আগরতলা পুরনিগমের মেয়র ও বিধায়ক দীপক মজুমদার, ডেপুটি মেয়র মণিকা দাস দত্ত, স্বাস্থ্য সচিব কিরণ গিত্যে, নগরোন্নয়ন দপ্তরের সচিব মিলিন্দ রামটেকে, পুর কমিশনার তথা জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের (এনএইচএম) ত্রিপুরা মিশন ডিরেক্টর সাজু ওয়াহিদ এ-সহ স্বাস্থ্য ও প্রশাসনের একাধিক উচ্চপদস্থ আধিকারিক।
























