গাজায় ইসরায়েলি হামলায় দুই শিশুসহ ১১ ফিলিস্তিনি নিহত, প্রাণ হারালেন তিন সাংবাদিক

গাজা, ২২ জানুয়ারি: গাজায় বুধবার পৃথক ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুই শিশু ও তিনজন সাংবাদিক রয়েছেন বলে স্থানীয় চিকিৎসকদের সূত্রে জানা গেছে। এই সহিংসতা যুদ্ধবিধ্বস্ত উপত্যকায় গত তিন মাস ধরে চলা যুদ্ধবিরতিকে আরও দুর্বল করে তুলেছে।

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য আধিকারিকরা জানান, মধ্য গাজায় বাস্তুচ্যুতদের একটি শিবিরের চিত্র ধারণ করতে গিয়ে একটি গাড়িতে থাকা তিন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন।

অন্য একটি ঘটনায়, মধ্য গাজায় ইসরায়েলি ট্যাঙ্কের গোলাবর্ষণে ১০ বছরের এক শিশুসহ তিনজন নিহত হয়েছেন বলে চিকিৎসকরা জানান। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস এলাকায় ইসরায়েলি গুলিতে পৃথক দুটি ঘটনায় ১৩ বছরের এক কিশোরসহ আরও দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।

এছাড়া গাজার বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় আরও তিনজন নিহত হওয়ায় দিনের মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১১ জনে দাঁড়িয়েছে বলে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রক জানিয়েছে।

সাংবাদিক নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, মধ্য গাজায় হামাসের সঙ্গে যুক্ত একটি ড্রোন পরিচালনাকারী “একাধিক সন্দেহভাজন”কে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়, ড্রোনটি সেনাদের জন্য হুমকি হয়ে ওঠায় নির্দিষ্টভাবে হামলা চালানো হয়।

ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ইউনিয়ন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নিহত সাংবাদিকরা বাস্তুচ্যুত শিবিরে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ নথিভুক্ত করার জন্য একটি মানবিক ও সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন করছিলেন। তারা ড্রোন ব্যবহার করছিলেন কি না, সে বিষয়ে ইউনিয়ন স্পষ্ট করে কিছু জানায়নি। স্থানীয় সাংবাদিকদের দাবি, তাঁদের কাজ মিশরের ত্রাণ কার্যক্রম তদারকি করা মিশরীয় কমিটির পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হচ্ছিল।

এক মিশরীয় নিরাপত্তা সূত্র নিশ্চিত করেছে যে সংশ্লিষ্ট গাড়িটি ওই কমিটির ছিল, তবে বিস্তারিত তথ্য দেয়নি। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী অন্যান্য হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনও মন্তব্য করেনি।

কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজায় অন্তত ২০৬ জন সাংবাদিক ও সংবাদকর্মী নিহত হয়েছেন। সংস্থাটির অভিযোগ, ইসরায়েল কখনও এই হত্যাকাণ্ডগুলির বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ফল প্রকাশ করেনি বা দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনেনি। অন্যদিকে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, তারা কেবলমাত্র যোদ্ধা ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতেই হামলা চালিয়েছে। ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ইউনিয়নের মতে, নিহত সাংবাদিকের সংখ্যা ২৬০-রও বেশি।

অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর একাধিকবার শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগে ইসরায়েল ও হামাস পরস্পরের বিরুদ্ধে দোষারোপ করে চলেছে। দুই বছরের সংঘাতে গাজায় ব্যাপক ধ্বংস ও মানবিক বিপর্যয় নেমে আসে। বর্তমানে তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপ নিয়েও মতানৈক্যে রয়েছে।

এই চুক্তি এখনও প্রথম ধাপের যুদ্ধবিরতির বাইরে এগোয়নি। ওই ধাপে বড় ধরনের লড়াই বন্ধ থাকে, ইসরায়েলি সেনার আংশিক প্রত্যাহার হয় এবং ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিনিময়ে হামাস জিম্মিদের মুক্তি দেয়। ভবিষ্যৎ ধাপে হামাসের অস্ত্র সমর্পণ, ইসরায়েলি বাহিনীর আরও প্রত্যাহার এবং গাজা পুনর্গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক প্রশাসন গঠনের কথা থাকলেও তার কোনও সময়সূচি নির্ধারিত হয়নি।

ইসরায়েল জানিয়েছে, শেষ ইসরায়েলি জিম্মির দেহাবশেষ হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত তারা দ্বিতীয় ধাপে যাবে না। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে সংঘর্ষে ৪৬০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি ও তিনজন ইসরায়েলি সেনার মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে সীমান্ত পেরিয়ে হামলায় প্রায় ১,২০০ জন নিহত হওয়ার পরই ইসরায়েল গাজায় আকাশ ও স্থল অভিযান শুরু করে। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের দাবি, সেই অভিযানে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭১ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

Leave a Reply