জনজাতিরা শুধু মাত্র একটা সম্প্রদায় নয় তারা হলেন সংস্কৃতি ও পরিচিতির ভিত্তি: মুখ্যমন্ত্রী

আগরতলা, ১৫ জানুয়ারি: রাজ্য সরকার জনজাতিদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। রাজ্য সরকারের বাজেটে জনজাতিদের উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্পের ঘোষণা করা হয়েছে। নাবার্ডের বরাদ্দ অর্থে জনজাতি অধ্যুষিত দূরবর্তী এলাকার রাস্তাঘাট সহ পরিকাঠামো উন্নয়নে কাজ করছে সরকার। এর মাধ্যমে জনজাতিদের আর্থসামাজিক মানোন্নয়ন করা হচ্ছে। আজ কুমারঘাটের দারচেয়ে রাজ্যভিত্তিক ডার্লং থার্লাক কুট উৎসবের উদ্বোধন করে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা একথা বলেন। তিনি বলেন, ডার্লং সম্প্রদায়কে তালিকাভুক্ত জনজাতি কমিউনিটিতে অন্তর্ভুক্ত করতে বর্তমানে রাজ্য সরকার বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, ডার্লংরা শিক্ষা, সংস্কৃতিতে অনেক বেশি এগিয়ে রয়েছে। এই উৎসব ডার্লং সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য ও সৌভ্রাতৃত্বকে আরও সুদৃঢ় করবে।

ঐতিহ্যবাহী থার্লাক কুট উৎসব হলো ডার্লং সম্প্রদায়ের ফসল তোলার উৎসব। এই উৎসবের মাধ্যমে ডার্লং সম্প্রদায়ের পরম্পরাগত সংস্কৃতি ও একতাকে উর্ধে তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন যুব বিষয়ক ও ক্রীড়ামন্ত্রী টিংকু রায়, ঊনকোটি জিলা পরিষদের সভাধিপতি অমলেন্দু দাস, বিধায়ক ভগবান চন্দ্র দাস, তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের সচিব ড. পি. কে. চক্রবর্তী, সচিব এল, ডার্লং, ঊনকোটি জেলার জেলাশাসক ড. তমাল মজুমদার, পুলিশ সুপার সুধাম্বিকার আর, তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের অধিকর্তা বিম্বিসার ভট্টাচার্য প্রমুখ। এবছর থার্লক কুট উৎসবের থিম হলো ‘সময়ের পালক’।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা বলেন, রাজ্য সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের বার্ষিক ক্যালেন্ডারে এখন থেকে থার্লক কুট উৎসবকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রাস্তাঘাট নির্মাণের জন্য জনজাতিদের জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে সরকার সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। এছাড়াও উপজাতি এলাকা স্বশাসিত জেলা পরিষদ এলাকায় জনজাতিদের উন্নয়নে আর্থিকভাবে সহায়তা করছে সরকার। মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা বলেন, ত্রিপুরার মহারাজাকে সম্মান জানাতে আগরতলার বিমানবন্দর মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্যের নামে নামকরণ করা হয়েছে এবং বিমানবন্দরে ও আগরতলার কামান চৌমুহনিতে মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য বাহাদুরের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে।

১৯ আগস্ট মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য বাহাদুরের জন্মদিনে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। রাজ্যের ১২টি জনজাতি অধ্যুষিত ব্লককে অ্যাসপিরেশনাল ব্লক (অভিলাষী উন্নয়ন ব্লক) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাজেটের বাইরেও এই সমস্ত অ্যাসপিরেশনাল ব্লকগুলিতে জনজাতি উন্নয়নের জন্য অতিরিক্ত ১০ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। তিনি বলেন, রাজ্য সরকারের অনুমোদনের ভিত্তিতে এ পর্যন্ত ত্রিপুরায় জনজাতি সম্প্রদায়ের ৭ জনকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে। এরমধ্যে থাংগা ডার্লং একজন। জনজাতিদের সমাজপতিদের জন্য সামাজিক ভাতা ২ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। জনজাতিদের ঐতিহাসিক জাতিসত্ত্বার পরিচিতি ঘটানোর জন্য বিভিন্ন স্থানের নাম নতুন ভাবে নামকরণ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের সদর্থক ভূমিকার ফলে ব্লু শরণার্থীদের রাজ্যে স্থায়ীভাবে বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এন.এল.এফ.টি. এ.টি.টি.এফ.-দের অস্ত্রশস্ত্র সহ আত্মসমর্পণ করিয়ে স্বাভাবিক জীবিনে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তিনটি ডিগ্রি কলেজে জনজাতি ছাত্রছাত্রীদের জন্য ছাত্রাবাস নির্মাণ করা হয়েছে। জনজাতি ছাত্রাবাসের খাওয়ার জন্য প্রতিদিন ৫৫ টাকা থেকে ৮০ টাকা করে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এতে প্রায় ৩৪ হাজারের উপর ছাত্রছাত্রী উপকৃত হয়েছে। জনজাতি ছাত্রাবাসগুলিতে স্মার্ট ক্লাসের মাধ্যমে পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পি.এম. জনমনের মাধ্যমে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে রাজ্যের ৬৫ হাজারের উপর রিয়াং জনজাতি পরিবারের পরিসুত পানীয়জল, আবাসন, বিদ্যুতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাস্তাঘাট ইত্যাদির উন্নয়ন করা হয়েছে। এরজন্য ব্যয় করা হয়েছে ৩২২ কোটি টাকা। মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা বলেন, জনজাতিরা শুধু মাত্র একটা সম্প্রদায় নয়, তারা হলেন সংস্কৃতি ও পরিচিতির ভিত্তি। তিনি বলেন, রাজ্য সরকার জনজাতিদের কল্যাণে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য ভাষণ রাখেন ডার্লং ইনমে ইনজোমের সভাপতি টিংখুমা ডার্লং। তিনি জানান, বিধায়ক ভগবান চন্দ্র দাস তার বিধায়ক এলাকা উন্নয়ন তহবিল থেকে ডার্লং ইনমে ইনজোম সংস্থাকে একটি অ্যাম্বুলেন্স প্রদান করেছেন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন থার্লাক কুট উৎসব আয়োজনের আহ্বায়ক এইচ, ডার্লং।

মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা সহ অতিথিগণ উৎসব উপলক্ষ্যে ডার্লং সমাজের জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক পরিচ্ছদের প্রদর্শনী স্টল পরিদর্শন করেন। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান মঞ্চে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়।

Leave a Reply