আগরতলা, ৮ জানুয়ারি: ত্রিপুরায় বাম আমলে বিশালগড় ব্লকে এমজিএনরেগা প্রকল্পে ১৭ কোটি টাকার দুর্নীতির হদিশ মিলেছিল। ওই ঘটনায় তৎকালীন বিডিও বিমল চক্রবর্তী সহ মোট ১২ জনের বিরুদ্ধে বিশালগড় থানায় মামলা দায়ের হয়েছিল এবং বর্তমানে মামলাটি ত্রিপুরা হাইকোর্টে বিচারাধীন। আজ সাংবাদিক সম্মেলনে এমনটাই অভিযোগ তুলেছেন কৃষিমন্ত্রী রতন লাল নাথ। সাথে তিনি যোগ করেন, বর্তমানে বিরোধীরা ‘বিকশিত ভারত গ্যারান্টি ফর রোজগার ও আজীবিকা মিশন’ প্রকল্প নিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। আসলে বিরোধীদের হাতে আর কোনো রাজনৈতিক অস্ত্র নেই বলেই তারা ভুল ও বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করছে।
মন্ত্রী বলেন, বিকশিত ভারত গ্যারান্টি ফর রোজগার ও আজীবিকা মিশন আইন এমজিএনরেগার তুলনায় একটি বড় সংস্কার। এই নতুন আইনে কর্মসংস্থানের দিন ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১২৫ করা হয়েছে। পুরনো আইনের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা, পরিকল্পনা ও জবাবদিহি আরও জোরদার করাই এই আইনের লক্ষ্য। পাশাপাশি উৎপাদনশীল সম্পদ সৃষ্টির মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি মজবুত করা, আয় বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক ও আর্থিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে গ্রামীণ সমাজকে আরও সহনশীল করে তোলাই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বলে তিনি জানান।
তিনি আরো বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যে কেন্দ্রীয় বরাদ্দ পূর্বের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হবে। এর জন্য তিনি কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও জানান, ইউপিএ সরকারের আমলে মনরেগা প্রকল্পে মোট ২ লক্ষ ১৩ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছিল। অপরদিকে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এনডিএ সরকারের আমলে খরচ হয়েছে প্রায় ৭ লক্ষ ৮০ হাজার কোটি টাকা। তাঁর দাবি, এই পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট যে গ্রামোন্নয়নের ক্ষেত্রে এনডিএ সরকার সবসময় ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, ত্রিপুরায় গত সাত বছরে কেন্দ্র থেকে রেগা প্রকল্পের জন্য ৭ হাজার ৮০১ কোটি টাকা এসেছে, যেখানে বাম আমলের শেষ সাত বছরে এই বরাদ্দ ছিল মাত্র ৬ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। একইভাবে, গত সাত বছরে রাজ্যের গ্রামীণ শ্রমিকদের মজুরি হিসেবে ৫ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা পৌঁছেছে, যা বাম আমলের শেষ সাত বছরে ছিল ৪ হাজার ২৪০ কোটি টাকা।
তিনি দাবি করেন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর জন্য কেন্দ্র সরকার ৯০ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ করে এবং রাজ্যগুলোর অংশ মাত্র ১০ শতাংশ। নতুন প্রকল্পের মূল লক্ষ্য জল সংরক্ষণ, গ্রামীণ পরিকাঠামো উন্নয়ন, প্রতিকূল আবহাওয়ার মোকাবিলা এবং গ্রামীণ সম্পদ ও জীবিকা শক্তিশালী করা। পুরনো প্রকল্পে আইনের দুর্বলতার কারণে অনেক সময় শ্রমিকরা সময়মতো মজুরি পেতেন না। কিন্তু নতুন আইনে বিলম্বে মজুরি পরিশোধ রোধে কঠোর নিয়মকানুন যুক্ত করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, গত সাত বছরে মনরেগা প্রকল্পের মাধ্যমে ৮ লক্ষ ১০ হাজার সম্পদ সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে তার আগের সাত বছরে সৃষ্টি হয়েছিল ৬ লক্ষ ৬৭ হাজার ৩৩২টি সম্পদ। একই সময়ে গ্রামীণ পরিবারগুলোর সরাসরি মজুরি বাবদ প্রদান করা হয়েছে ৫,৩৩২ কোটি টাকা, যেখানে ২০১৮ সালের আগের সময়ে এই অঙ্ক ছিল ৪,২৪০ কোটি টাকা। বর্তমানে ত্রিপুরায় এই প্রকল্পের আওতায় ৬.৫৬ লক্ষ জব কার্ড এবং ১০.২০ লক্ষ নিবন্ধিত শ্রমিক রয়েছেন।
মন্ত্রী আরও বলেন, ইউপি সরকারের আমল থেকেই মনরেগাকে ঘিরে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। নতুন এই বিলের উদ্দেশ্য হল দুর্নীতি দূর করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, আরও বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং উন্নত গ্রাম গড়ে তোলা।
তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, বিশালগড় ব্লকে ১৭ কোটি টাকার দুর্নীতি কেগ রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছে। নিরীক্ষা ও তদন্তের পর বিশালগড় থানায় মামলা দায়ের করা হয়, ৪০টি মামলায় ১২ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি বর্তমানে হাইকোর্টে বিচারাধীন। মন্ত্রী আরো বলেন, মনরেগা বাস্তবায়নে ত্রিপুরা ধারাবাহিকভাবে ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। জাতীয় স্তরে ত্রিপুরার অবস্থান ছিল ২০২০-২১ সালে ২য়, ২০২১–২২ সালে ৩য়, ২০২২–২৩ সালে ৪র্থ এবং ২০২৩–২৪ সালেও ৪র্থ স্থান।
মন্ত্রী বলেন, আগে শ্রমিকরা প্রায়ই মজুরি পেতে বিলম্বের সম্মুখীন হতেন। কিন্তু সংশোধিত ব্যবস্থায় এখন শ্রমিকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি মজুরি স্থানান্তর করা হচ্ছে, ফলে স্বচ্ছতা বেড়েছে এবং সময়মতো অর্থ প্রদান নিশ্চিত হয়েছে। নতুন আইনটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচালিত, যার লক্ষ্য দুর্নীতি ও আর্থিক লিকেজ সম্পূর্ণভাবে রোধ করা।

