শেখ হাসিনার ফোনালাপ ফাঁস: ছাত্র বিক্ষোভে প্রাণঘাতী হামলার নির্দেশের প্রমাণ মিলল

ঢাকা, ৯ জুলাই : গত বছর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ছাত্র বিক্ষোভের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে, যা তীব্র আলোচনার সৃষ্টি করেছে। সংবাদে প্রকাশিত একটি অডিও রেকর্ডিংয়ে শোনা যায়, শেখ হাসিনা নিরাপত্তা বাহিনীর এক কর্মকর্তাকে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে মারাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন।

সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, অডিও ক্লিপটি বৈধ ও যাচাই করা হয়েছে এবং এর মধ্যে কোনও প্রকারের পরিবর্তন বা কারচুপি করা হয়নি। অডিওর মধ্যে শোনা যায়, শেখ হাসিনা নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, বিক্ষোভকারীদের ওপর ‘মারাত্মক অস্ত্র’ ব্যবহার করা হোক এবং “তাদের যেখানেই পাওয়া যাবে, সেখানেই গুলি করা হোক”। অডিও ক্লিপটি গত বছরের জুলাই মাসে তোলা হয়েছে, যখন ঢাকায় ছাত্ররা সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভ করছিল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নির্দেশের পর ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী রাইফেল ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালায়, যার ফলে প্রাণহানি ঘটে।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া ছাত্র বিক্ষোভটি দ্রুত বাংলাদেশে ব্যাপক আকার ধারণ করে। শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার দাবি করে সড়কে নেমে আসে। সেসময় বিক্ষোভকারীরা ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে, সরকার শক্ত অবস্থান নেয় এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে সংঘর্ষে নামানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

এ সময় সরকারী বাহিনীর অভিযান একাধিক জায়গায় সহিংস রূপ নেয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের দমন করতে থাকে।

সংবাদ মাধ্যম জানায়, ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডিংটি আন্তর্জাতিক ফোরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা যাচাই করেছেন এবং তারা নিশ্চিত করেছেন যে, অডিওতে কোনো প্রকারের ভুয়া বা এডিট করা হয়নি। এটি শতভাগ আসল এবং বৈধ। এই অডিও রেকর্ডিং, যা ১৮ জুলাই, ২০২৪ তারিখে তোলা হয়েছে, সেই সময় শেখ হাসিনা ঢাকার গণভবন থেকে ফোনালাপটি করেছিলেন।

এই ফোনালাপের কিছু ঘণ্টার মধ্যে ঢাকায় নিরাপত্তা বাহিনী রাইফেল ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এই হামলায় বহু প্রাণহানি ঘটে এবং সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়।

শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয় যে, এই সিদ্ধান্তটি সিনিয়র কর্মকর্তাদের ছিল এবং তাদের উদ্দেশ্য ছিল “জনসাধারণের জীবন রক্ষা করা”। তারা দাবি করেছেন যে, বিক্ষোভকারীদের উপর এই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা ছাড়া কোনও বিকল্প ছিল না। তবে, এ অভিযোগও উঠেছে যে, এটি একটি একপেশে সিদ্ধান্ত ছিল এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত শক্তি ছিল অপ্রয়োজনীয়ভাবে অত্যধিক।

২০২৪ সালের জুলাই এবং আগস্ট মাসে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে ১,৪০০ জনের বেশি প্রাণ হারিয়েছিল। বিক্ষোভের মধ্যে বহু শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষ নিহত হন। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এই সময়ে প্রায় ১,৪০০ মানুষ প্রাণ হারায় এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল এবং সরকারী বাহিনীর আচরণ একেবারে অমানবিক হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে, শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য হতে হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, শেখ হাসিনা ভারত চলে যান এবং তখন থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন।

শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর থেকেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও বিশেষজ্ঞরা তার বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ তুলেছে। বাংলাদেশ সরকারও একাধিকবার ভারতের কাছে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার আবেদন জানিয়েছে, তবে ভারত এখনো সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেনি।

শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসার পর প্রথমবারের মতো তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে বিবিসির কাছে ফাঁস হওয়া এই অডিও রেকর্ডিংকে তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এই অডিও ক্লিপের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা চালানোর জন্য বাংলাদেশ আদালত ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলি নতুন পদক্ষেপ নিতে পারে। পাশাপাশি, ভারতের সঙ্গে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তীব্র হতে পারে, কারণ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা চলাকালীন ভারতেই তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন।

এদিকে, বাংলাদেশে বিক্ষোভকারীদের হত্যার ঘটনায় সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী, ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। তারা মনে করছেন, দেশটির ভবিষ্যত রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল হতে পারে যদি না সঠিক তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।

এছাড়া, বাংলাদেশে এখন নতুন করে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সম্পর্কিত আলোচনা শুরু হয়েছে, যার ফলে দেশটির রাজনৈতিক পরিবেশে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।