অসমে ‘অবৈধ বাংলাদেশিদের’ বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত থাকবে: মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার ঘোষণা

কোকরাঝাড়, ৮ জুলাই : অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সোমবার কোকরाझাড়ে সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন যে, রাজ্যে ‘অবৈধ বাংলাদেশিদের’ বিরুদ্ধে শুরু হওয়া উচ্ছেদ অভিযান কোনো রাজনৈতিক চাপেই থেমে থাকবে না। এই পদক্ষেপকে তিনি স্থানীয় আদিবাসী ও ভূমিপুত্র জনগণের ভূমির অধিকার এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার জন্য অত্যাবশ্যক বলে আখ্যা দেন।
মুখ্যমন্ত্রী শর্মা বলেন, “করিমগঞ্জ, ধুবড়ি, চাপার ও শিলচর থেকে কিছু মানুষ লাখিমপুরে গিয়ে বসতি স্থাপন করছে। আমরা তাদের উচ্ছেদ করেছি যাতে লাখিমপুরের স্থানীয় জনগণের স্বাধীনতা এবং ভূমির অধিকার রক্ষা করা যায়।” তিনি এই অভিযানকে ‘জমি ও পরিচয়ের লড়াই’ বলেও বর্ণনা করেন।
তিনি আরও বলেন, “যারা এই ৩৫০ অবৈধ বাংলাদেশিকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি তুলছে, তারা সেটা সহ্য করুক। এ লড়াইয়ে অতীতে বহু মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। আমরা তাদের আত্মত্যাগকে ভুলতে পারি না।”
বিরোধী দলগুলির ভূমিকার কড়া সমালোচনা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এখন কিছু রাজনৈতিক দল একটি মেয়ের নাম করে বাংলাদেশিদের নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে রাজনীতি করছে। তাদের লক্ষ্য হলো বিজেপির উচ্ছেদ অভিযানকে থামিয়ে দেওয়া, কিন্তু আমরা পিছপা হব না।”
তিনি জানান, এই অভিযান শুধুমাত্র লাখিমপুরে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ধীরে ধীরে রাজ্যের অন্যান্য অংশেও বিস্তৃত হবে। “আগামীকাল ধুবড়ির চাপার এলাকায় অভিযান চলবে। আমরা নিশ্চিত করব যে বোধোল্যান্ডে কোনো বহিরাগত অনুপ্রবেশ করতে না পারে,”— বলেন মুখ্যমন্ত্রী।
এর আগে, গত ৫ জুলাই মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন যে, কাছাড় এবং শ্রীভূমি জেলায় বসবাসরত ১৮ জন বাংলাদেশি নাগরিককে তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যাদের কাছে বৈধ নথিপত্র ছিল না।
এক্স (পূর্বতন টুইটার)-এ তিনি লিখেছেন, “দেখুন কে ফিরছে নিজের দেশে? অসমে আমরা অতিথিদের খোলা মনে স্বাগত জানাই, কিন্তু যারা অবৈধভাবে থাকছে, তাদের জন্য রয়েছে বিশেষ ‘পুশব্যাক’ কর্মসূচি।”
তিনি আরও লেখেন, “আজ কাছাড় এবং শ্রীভূমি জেলা থেকে মাত্র ৯ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ জন অবৈধ বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।”
মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্য এবং সরকারের উচ্ছেদ অভিযানের পর রাজ্যে রাজনৈতিক উত্তাপ তীব্রতর হয়েছে। বিরোধী দলগুলো এবং সংখ্যালঘু অধিকার সংগঠনগুলো অভিযানে স্বচ্ছতার অভাব এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির ঘাটতির অভিযোগ তুলেছে।
তাদের দাবি, “জাতিগত বা ভাষাগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে উচ্ছেদ করার প্রক্রিয়া অসাংবিধানিক এবং মানবাধিকার পরিপন্থী। প্রতিটি নাগরিকের সঠিক নথিপত্র পরীক্ষা করে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।”
একাধিক মানবাধিকার কর্মী বলেছেন, উচ্ছেদ অভিযান চলাকালীন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং যথাযথ পুনর্বাসন ব্যবস্থার অভাব প্রকট। বহু পরিবার যাদের জীবন-জীবিকা ওই এলাকায় নির্ভরশীল, তারা এখন ঘরহীন এবং নিরাপত্তাহীন অবস্থায় পড়েছেন।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, ধুবড়ি, বরপেটা এবং শিলচর-সহ আরও বেশ কিছু এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। প্রশাসনকে ইতিমধ্যেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে আইনশৃঙ্খলার অবনতি না ঘটে এবং প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
অসমে ‘অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ’ দীর্ঘদিন ধরেই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বে বর্তমান বিজেপি সরকার এই বিষয়ে কড়া অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে, বিরোধী দল এবং নাগরিক সমাজ এই পদক্ষেপকে মানবিকতা, সংবিধান ও সামাজিক ভারসাম্যের প্রশ্নে চ্যালেঞ্জ করছে। এই প্রেক্ষাপটে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।