আগরতলা, ২৮ সেপ্টেম্বর: একটি জটিল নবজাতক অস্ত্রোপচারের ঘটনায়, জীবনসংকটাপন্ন ইনটেস্টাইনাল ম্যালরোটেশন উইথ মিডগাট ভলভুলাস—অর্থাৎ অন্ত্রের অস্বাভাবিক অবস্থান ও অন্ত্র পেঁচিয়ে যাওয়ার সমস্যায় আক্রান্ত ১৮ দিনের এক পুত্রশিশুর সফল অস্ত্রোপচার করা হয়েছে ত্রিপুরা মেডিকেল কলেজ ও ড. ব্রাম টিচিং হাসপাতালে।
শিশুটির নাম মাস্টার আহাদুল ইসলাম। ২০২৬ সালের ২৭ আগস্ট মাকুন্দা হাসপাতালে স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে তার জন্ম হয়। সে তার বাবা-মা—২৫ বছর বয়সি রুবিনা বেগম এবং ৩১ বছর বয়সি বিলাল মিয়ার দ্বিতীয় সন্তান। তাঁদের বাড়ি ধর্মনগরের বাগ্যাপুরে। শিশুটির বাবা পেশায় রাজমিস্ত্রি এবং মা গৃহবধূ। জন্মের পর মা ও শিশুকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
প্রায় এক সপ্তাহ পর শিশুটির জন্ডিস দেখা দিলে তাকে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে এজিএমসি-তে রেফার করা হয়। জন্ডিসের চিকিৎসা চলাকালীন শিশুটির বারবার পিত্তযুক্ত বমি হতে থাকে, যা নবজাতকের অন্ত্রের বাধার একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। অন্ত্রের কোনো অস্ত্রোপচারযোগ্য সমস্যা থাকতে পারে বলে সন্দেহ হওয়ায় ২০২৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর শিশুটিকে ত্রিপুরা মেডিকেল কলেজ ও ড. ব্রাম টিচিং হাসপাতালে রেফার করা হয়।
শিশুটিকে স্পেশাল নিউবর্ন কেয়ার ইউনিট (এসএনসিইউ)-তে ভর্তি করা হয়। তাঁর চিকিৎসার দায়িত্বে ছিলেন পেডিয়াট্রিক ও নিওনেটাল সার্জন ডা. অনিরুদ্ধ বসাক। প্রাথমিকভাবে শিরায় তরল ও অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার পাশাপাশি শিশুটির বিস্তারিত শারীরিক পরীক্ষা ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।
পরীক্ষায় ইনটেস্টাইনাল ম্যালরোটেশন উইথ মিডগাট ভলভুলাস বা অন্ত্রের অস্বাভাবিক অবস্থানের কারণে অন্ত্র পেঁচিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়।
মিডগাট ভলভুলাস নবজাতকের একটি গুরুতর অস্ত্রোপচারজনিত জরুরি অবস্থা। এই অবস্থায় অন্ত্র তার রক্তনালির চারপাশে পেঁচিয়ে যায়। দ্রুত চিকিৎসা না হলে অন্ত্রে রক্তসঞ্চালন ব্যাহত হয়ে ইস্কিমিয়া ও গ্যাংগ্রিন হতে পারে। পরবর্তীতে গুরুতর সংক্রমণ এবং প্রাণহানির আশঙ্কাও দেখা দিতে পারে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে ২০২৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর, শিশুটির ১৮ দিন বয়সে, জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয়। ডা. অনিরুদ্ধ বসাক ও তাঁর সার্জিক্যাল টিম অস্ত্রোপচারটি সম্পন্ন করেন। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলা এই অস্ত্রোপচারে পেঁচিয়ে যাওয়া অন্ত্র সাবধানে মুক্ত করা হয় এবং অন্ত্রের অস্বাভাবিক অবস্থান সংশোধন করা হয়।
তবে অস্ত্রোপচারের পরবর্তী সময়ও সহজ ছিল না। শিশুটির সেপসিস দেখা দেয় এবং তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ, বিশেষায়িত চিকিৎসা ও অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হয়। প্রায় নয় দিন পর চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে পারিবারিক অসুবিধার কারণে শিশুটির পরিবার চিকিৎসকদের পরামর্শের বিরুদ্ধে হাসপাতাল থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ডিসচার্জ এগেইনস্ট মেডিক্যাল অ্যাডভাইস (ডামা) নামে পরিচিত।
পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর, শিশুটির বয়স প্রায় এক মাস হলে, তার বাবা-মা তাকে নিয়ে ফলো-আপে হাসপাতালে আসেন। বাবা-মায়ের কোলে কান্নারত কিন্তু সুস্থ শিশুটিকে দেখে তাঁদের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। শিশুটির কঠিন যাত্রা ও জরুরি চিকিৎসার পর এটি ছিল এক আশ্বস্তকর মুহূর্ত।
এই ঘটনা নবজাতকের পিত্তযুক্ত বমিকে অস্ত্রোপচারজনিত জরুরি অবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করার গুরুত্ব তুলে ধরে। নবজাতকের সবুজাভ বা পিত্তযুক্ত বমিকে কখনও সাধারণ খাওয়ানোর সমস্যা হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি অন্ত্রে বাধা, বিশেষ করে ম্যালরোটেশন ও মিডগাট ভলভুলাসের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।
ঘটনাটি সময়মতো রেফার, দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং বিশেষায়িত নবজাতক সার্জারি পরিষেবার গুরুত্বও তুলে ধরে। দ্রুত রোগ শনাক্ত করে জরুরি অস্ত্রোপচার করা গেলে অন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতি প্রতিরোধ এবং শিশুর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ানো সম্ভব।
এই ছোট্ট শিশুর জীবনযুদ্ধে সময়মতো চিকিৎসা, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিবেদিত প্রচেষ্টা এবং নবজাতকের লড়াই করার শক্তি একসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।



















