নয়াদিল্লি, ২৩ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পে উৎপাদন, দেশীয়করণ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে নতুন গতি দেখা দিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে দেশের প্রতিরক্ষা উৎপাদন রেকর্ড ১.৮ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের অর্থবর্ষের তুলনায় ১৫.৬ শতাংশ বেশি। ২০২১ অর্থবর্ষ থেকে হিসাব করলে উৎপাদনে প্রায় ১৮ শতাংশের বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির হার দেখা যাচ্ছে বলে একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এমকেই গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন, বেসরকারি ক্ষেত্রের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, দেশীয় নকশা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রসার এবং একাধিক বৃহৎ প্রতিরক্ষা প্রকল্পের পাইপলাইন এই বৃদ্ধিকে আরও শক্তিশালী করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা রপ্তানিও ৬৩ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও ব্যবস্থা সরবরাহকারী হিসেবে ভারতের অবস্থান আরও বিস্তৃত হচ্ছে। বর্তমানে ৮০টিরও বেশি দেশে ভারতীয় প্রতিরক্ষা পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। এর মধ্যে আমেরিকা, ফ্রান্স ও আর্মেনিয়া অন্যতম প্রধান ক্রেতা।
সরকার ২০২৯ অর্থবর্ষের মধ্যে প্রতিরক্ষা উৎপাদন ৩ লক্ষ কোটি টাকা এবং প্রতিরক্ষা রপ্তানি ৫০ হাজার কোটি টাকায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। দেশীয়করণের ক্ষেত্রেও একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাঁচটি ইতিবাচক দেশীয়করণ তালিকায় ৫,০১২টি গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ইতিমধ্যেই ৩,০২৫টি দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে। পাশাপাশি, ‘সৃজন’ পোর্টালের মাধ্যমে ৩৮ হাজারেরও বেশি সামগ্রী দেশীয়করণের জন্য চিহ্নিত হয়েছে এবং ১৩,৯০০টিরও বেশি সামগ্রী সফলভাবে দেশীয়করণ করা হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রায় ১.৪ লক্ষ কোটি টাকার আধুনিকীকরণ বাজেটের ৭৫ শতাংশ দেশীয় শিল্পের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। সামগ্রিক প্রতিরক্ষা উৎপাদনে বেসরকারি ক্ষেত্রের অংশীদারিত্বও ২০২৫ অর্থবর্ষের ২২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ অর্থবর্ষে ২৪ শতাংশ হয়েছে। এর আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা।
এছাড়া, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রতিরক্ষা মূলধনী অধিগ্রহণ বাজেটের প্রায় ২৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৩৪,৭০০ কোটি টাকা বেসরকারি শিল্পের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। এর ফলে প্রতিরক্ষা সরবরাহ শৃঙ্খলে বেসরকারি সংস্থাগুলির ভূমিকার ধরনও বদলাচ্ছে। সংস্থাগুলি প্রচলিত ‘বিল্ড-টু-প্রিন্ট’ মডেলের বাইরে গিয়ে ‘বিল্ড-টু-স্পেসিফিকেশন’, ‘বিল্ড-টু-ডিজাইন’ এবং ‘বিল্ড-টু-রিকোয়ারমেন্ট’ সক্ষমতা গড়ে তুলছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বেশ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা ‘লিড সিস্টেম ইন্টিগ্রেটর’ হিসেবে নিজেদের সক্ষমতা তৈরি করছে। এর ফলে জটিল প্রতিরক্ষা প্ল্যাটফর্মের নকশা, সংযুক্তিকরণ এবং সরবরাহের ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে ভারতের প্রতিরক্ষা মূলধনী বরাদ্দ প্রায় ১.৯ লক্ষ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। এর ফলে তিন বাহিনীর জন্য বড়সড় অস্ত্র ও সরঞ্জাম সংগ্রহের পরিকল্পনা এগিয়ে চলেছে।
বায়ুসেনার গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলির মধ্যে রয়েছে মাল্টি-রোল ফাইটার এয়ারক্রাফ্ট, এলসিএ তেজস মার্ক-২, সুখোই-৩০ এমকেআই আপগ্রেড, মিডিয়াম ট্রান্সপোর্ট এয়ারক্রাফ্ট, অতিরিক্ত এস-৪০০ ব্যবস্থা এবং অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফ্ট। স্থলসেনার পরিকল্পনায় রয়েছে ফিউচার ইনফ্যান্ট্রি কমব্যাট ভেহিকল, ফিউচার রেডি কমব্যাট ভেহিকল, কে-৯ বজ্র-টি, কিউআরএসএএম, আকাশ-এনজি, লইটারিং মিউনিশন, হেলিকপ্টার এবং পরবর্তী প্রজন্মের পিনাকা ব্যবস্থা।
অন্যদিকে, নৌবাহিনী ‘প্রজেক্ট-৭৫আই’, অতিরিক্ত স্করপিন সাবমেরিন, পরবর্তী প্রজন্মের ফ্রিগেট, নেভাল ইউটিলিটি হেলিকপ্টার, আনম্যানড আন্ডারওয়াটার ভেহিকল এবং দেশীয় ক্যারিয়ার-ভিত্তিক যুদ্ধবিমান নিয়ে কাজ করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ অর্থবর্ষে রেকর্ড উৎপাদন এবং সামনে উচ্চাভিলাষী উৎপাদন ও রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রার ফলে ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্প এখন স্বল্পমেয়াদি ক্রয়চক্রের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত বৃদ্ধির দিকে এগোচ্ছে।



















