নয়াদিল্লি, ১৯ আগস্ট (আইএএনএস): অরুণাচল প্রদেশে চিনা অনুপ্রবেশ নিয়ে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর অভিযোগ খারিজ করে কেন্দ্রীয় সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেছেন, ভারত-চিন সীমান্তের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ও আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত না হওয়ার বিষয়টি না বুঝে এমন মন্তব্য করা উচিত নয়। বুধবার আইএএনএস-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তবর্তী এলাকার উদ্বেগকে বাস্তব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দেখা প্রয়োজন।
রিজিজুর দাবি, সীমান্তের স্পষ্ট চিহ্নিতকরণ না থাকায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারগুলির নীতির কারণে সীমান্তের ভারতীয় দিকে পরিকাঠামো উন্নয়ন পিছিয়ে ছিল।
রাহুল গান্ধী বারবার কেন্দ্রের বিরুদ্ধে চিনা অনুপ্রবেশের তথ্য গোপন করা এবং দেশের ভূখণ্ড রক্ষায় ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছেন। সেই প্রেক্ষিতেই রিজিজু বলেন, এ ধরনের বক্তব্য বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে এবং মাটির বাস্তব পরিস্থিতি না বুঝে এমন দাবি করা উচিত নয়।
আইএএনএস-কে রিজিজু বলেন, “অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় সীমান্ত সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে। এর মূল কারণ বুঝতে হবে। অরুণাচল প্রদেশে ভারত ও চিনের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত হয়নি। সীমান্ত স্তম্ভ নেই এবং মাটিতে সীমানা স্পষ্টভাবে চিহ্নিতও করা হয়নি। এটি কোনও সাম্প্রতিক সমস্যা নয়। তিব্বত পৃথক সত্তা থাকার সময়ও তিব্বত ও ভারতের মধ্যকার সীমান্ত নির্ধারিত ছিল না।”
সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের উদ্বেগ যে বাস্তব, তা স্বীকার করেও রিজিজু বলেন, যাচাই না করা ভিডিও বা বিভিন্ন দাবির মাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, “বিভিন্ন ভিডিও শেয়ার করে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানো ভুল। সীমান্ত নিয়ে অবশ্যই সমস্যা রয়েছে। অরুণাচল প্রদেশের কিছু গ্রামবাসী সীমান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং তাঁদের উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে, কারণ সেখানে সীমান্ত নির্ধারিত নয়।”
রিজিজু আরও জানান, দুর্গম ও অত্যন্ত উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল হওয়ায় ঐতিহাসিকভাবে ওই এলাকায় স্থায়ী বসতি গড়ে ওঠেনি। বহু এলাকা মূলত শিকার ও পশুচারণের কাজে ব্যবহৃত হত। সীমান্তের সুনির্দিষ্ট চিহ্নিতকরণ না থাকায় ভারত ও চিনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর মতে, এই সমস্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সীমান্তবর্তী এলাকায় পরিকাঠামো উন্নয়নের গতি। তাঁর অভিযোগ, চিন অনেক আগে থেকেই রাস্তা ও অন্যান্য পরিকাঠামো নির্মাণ শুরু করলেও কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারগুলি ভারতের দিকে ভিন্ন নীতি অনুসরণ করেছিল।
পূর্ববর্তী ইউপিএ সরকারের সমালোচনা করে রিজিজু বলেন, তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী এ কে অ্যান্টনি সংসদে জানিয়েছিলেন যে ভারতীয় সীমান্তের দিকে পরিকাঠামো নির্মাণ না করাই সরকারের নীতি ছিল। অন্যদিকে চিন ধারাবাহিকভাবে নিজেদের পরিকাঠামো উন্নত করে গিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
রিজিজুর দাবি, ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন শুরু হয়। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় রাস্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী মোদি নীতি পরিবর্তন করেছেন এবং এখন আমাদের দিকেও রাস্তা তৈরি হচ্ছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে শেষ সীমান্তবর্তী গ্রাম মাজায় গিয়েছি। সেখানে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্য এবং সেনা জওয়ানদের সঙ্গে দেখা করেছি। রাস্তা নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। ১৯৪৭ সালের পর এত বছর ধরে সীমান্তে কোনও রাস্তা তৈরি হয়নি। প্রধানমন্ত্রী মোদির নেতৃত্বে সেই রাস্তা তৈরি হয়েছে।”
তকসিং পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণের কথাও উল্লেখ করেন রিজিজু। তাঁর দাবি, প্রত্যন্ত সীমান্ত এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার লক্ষ্যে পরিকাঠামো নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “আগে আমাদের রাস্তার যোগাযোগ ছিল না। প্রধানমন্ত্রী মোদি ২০১৯ সালে তকসিং পর্যন্ত রাস্তা তৈরি করিয়েছেন। আমাদের দিকে রাস্তা না থাকলেও চিন রাস্তা তৈরি করেছিল। এর ফলে চিনা সেনা কিছু উচ্চ পার্বত্য এলাকায় অবস্থান নিয়ে সীমান্ত পরিকাঠামো তৈরি করে। এখন আমরা নিজেদের পরিকাঠামো তৈরি করে তার জবাব দিচ্ছি।”
তবে চিন ভারতের কোনও গ্রাম দখল করেছে—এই দাবি খারিজ করে রিজিজু বলেন, সীমান্ত স্পষ্টভাবে নির্ধারিত না থাকায় কিছু বিতর্কিত এলাকায় সমস্যা রয়েছে।
তিনি বলেন, “তারা আমাদের কোনও গ্রাম দখল করেছে, এমনটা নয়। সীমান্ত নির্ধারিত না থাকায় একটি নির্দিষ্ট অংশে তারা শিবির স্থাপন করেছে। আমাদের মানুষ মনে করেন, ভারতের ভূখণ্ড আরও কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, সেখানকার স্থানীয়রা ওই জমিকে নিজেদের বলে দাবি করেন।”
সংবেদনশীল সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সেনা এবং ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ (আইটিবিপি)-র টহল আরও শক্তিশালী করা হয়েছে বলেও জানান রিজিজু। লংজুর ওপারে একটি উপত্যকায় চিনা বাহিনীর তৈরি কাঠামোর কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর দাবি, ওই এলাকায় চিনের নিয়ন্ত্রণ কয়েক দশক ধরে রয়েছে।
রিজিজু বলেন, লংজুর ওপারের উপত্যকায় চিনা পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) গ্রামসদৃশ কিছু কাঠামো ও ভবন তৈরি করেছে। ওই জমি ১৯৫৯ সালে দখল করা হয়েছিল এবং ১৯৬২ সালে সেখানে চিনের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয় বলে দাবি করেন তিনি।
সীমান্তের রিজলাইন এলাকায় চিনা সামরিক তৎপরতা বেড়েছে বলেও স্বীকার করেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। এর ফলে সীমান্তবর্তী গ্রামবাসীদের উদ্বেগ বেড়েছে এবং তাঁদের আশঙ্কাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
রিজিজু বলেন, বর্তমান সীমান্ত পয়েন্টে ভারতের একটি পোস্ট রয়েছে। ওই নির্দিষ্ট এলাকায় ভারত ও চিনের মধ্যে কোনও আন্তঃসীমান্ত যাতায়াত না থাকলেও রিজলাইনে চিনা সামরিক তৎপরতা বেড়েছে। এর ফলে গ্রামবাসীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন, সীমান্ত ইস্যুতে রাজনৈতিক প্রচার তৈরির জন্য কংগ্রেস বিভ্রান্তিকর উপাদান ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ থেকে এসেছে বলে দাবি করা একটি ভুয়ো ভিডিও ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা ভুল এবং এ ধরনের প্রচার সশস্ত্র বাহিনীর মনোবল দুর্বল করে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।



















