আগরতলা, ১৯ আগস্ট: ত্রিপুরার উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ভারতের সঙ্গে রাজ্যের সংযুক্তির ক্ষেত্রে মাণিক্য রাজবংশের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা তুলে ধরলেন মুখ্যমন্ত্রী অধ্যাপক (ড.) মানিক সাহা। বুধবার আগরতলায় বিজেপির কর্মীদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি মাণিক্য রাজপরিবারের ইতিহাস ও অবদান বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন দেশের নির্মাণ ও জাতীয় সংহতিতে রাজা-মহারাজাদের অবদান যথাযথভাবে স্বীকৃতি পায়নি। তাঁর দাবি, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমলে এই অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তা আরও গতি পায়।
মাণিক্য রাজবংশের প্রসঙ্গ তুলে ড. মানিক সাহা বিশেষভাবে মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য বাহাদুরের অবদানের কথা স্মরণ করেন। তাঁর বক্তব্য, পূর্বসূরি রাধাকিশোর মাণিক্য এবং বীরচন্দ্র মাণিক্যের আমলে শুরু হওয়া বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডকে আরও দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন বীর বিক্রম।
এদিন মুখ্যমন্ত্রী মাণিক্য রাজপরিবারের সঙ্গে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, তিন প্রজন্ম ধরে এই সম্পর্ক বজায় ছিল। বিশ্বভারতীর জন্য রাজপরিবারের আর্থিক সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’, ‘রাজর্ষি’ ও ‘মুকুট’-এর মতো রচনার সঙ্গে ত্রিপুরার রাজপরিবারের ঐতিহাসিক যোগাযোগের বিষয়টিও তুলে ধরেন।
ড. মানিক সাহা বলেন, ঐতিহাসিকভাবে ত্রিপুরা ছিল বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সম্প্রীতিপূর্ণ সহাবস্থানের একটি উদাহরণ। জনজাতি সম্প্রদায়, মণিপুরি এবং বাঙালি ভাষাভাষী মানুষের মিলিত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ত্রিপুরার স্বাতন্ত্র্য তৈরি করেছে। সঙ্গীতজ্ঞ এসডি বর্মনের সাংস্কৃতিক অবদানের কথাও স্মরণ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ত্রিপুরার এই বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশে মহারাজা বীর বিক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
আগরতলার পরিকল্পিত নগরায়নের ক্ষেত্রেও বীর বিক্রমের দূরদর্শিতার কথা তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। উজ্জয়ন্ত প্রাসাদ থেকে মহারাজগঞ্জ বাজার পর্যন্ত রাস্তা এবং রামনগরের মতো পরিকল্পিত এলাকার বিন্যাসকে আধুনিক ত্রিপুরা গড়ার তাঁর ভাবনার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
মহারাজার জীবনের শেষ পর্বের প্রসঙ্গ তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার কিছুদিন আগেই বীর বিক্রমের মৃত্যু হয়। তাঁর উত্তরসূরি নাবালক থাকায় মহারানি কাঞ্চনপ্রভা দেবীর নেতৃত্বে রিজেন্সি কাউন্সিল গঠিত হয়। ড. সাহার দাবি, মহারাজা বীর বিক্রম ত্রিপুরার ভারতের সঙ্গে সংযুক্তির পক্ষে ছিলেন এবং পরবর্তীতে মহারানি সেই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করেই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
এদিন প্রদেশ বিজেপি সভাপতি তথা বিধায়ক অভিষেক দেবরায়ও মহারাজা বীর বিক্রমকে ‘আধুনিক ত্রিপুরার স্থপতি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, ২০১৪ সালের পর মহারাজার অবদান আরও ব্যাপকভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরা হয়। আজাদি কা অমৃত মহোৎসবের মতো উদ্যোগের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
অভিষেক দেবরায়ের দাবি, ২০১৮ সালের আগেই বিজেপির দলীয় কার্যালয়গুলিতে মহারাজা বীর বিক্রমের জন্মবার্ষিকী পালন শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে বিমানবন্দরের নাম মহারাজা বীর বিক্রমের নামে রাখা এবং সেখানে তাঁর মূর্তি স্থাপনের ক্ষেত্রেও উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে জানান তিনি।
মহারাজা বীর বিক্রমের শিক্ষা ও নগর উন্নয়নের ভাবনার কথাও তুলে ধরেন প্রদেশ বিজেপি সভাপতি। তাঁর বক্তব্য, এমবিবি কলেজের বিকাশ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা, আধুনিক আগরতলা শহরের পরিকল্পনা এবং তাঁর শাসনকালে একাধিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা মহারাজার দূরদর্শিতার পরিচয় বহন করে। বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষার প্রসারের পাশাপাশি শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশেও তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন দেবরায়।
মুখ্যমন্ত্রী ড. মানিক সাহা এবং প্রদেশ বিজেপি সভাপতি অভিষেক দেবরায় উভয়েই বলেন, মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্যের উত্তরাধিকার আজও ত্রিপুরার আধুনিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং ভারতের সঙ্গে রাজ্যের ঐতিহাসিক সম্পর্কের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।



















