আগরতলা, ১২ জুলাই: ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল নীতি নিয়ে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক প্রশ্ন তুলে সরব হলো ত্রিপুরা প্রদেশ কংগ্রেস। রবিবার দলের মুখপাত্র প্রবীর চক্রবর্তীর স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিবৃতিতে প্রদেশ কংগ্রেস দাবি করেছে, বিকল্প জ্বালানি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কৃষকের উন্নয়নের লক্ষ্যকে তারা সমর্থন করলেও, বর্তমান ইথানল নীতির বাস্তবায়ন নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তার স্বচ্ছ জবাব দিতে ব্যর্থ হয়েছে কেন্দ্র সরকার।
প্রেস বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কেন্দ্র সরকার ইথানল মিশ্রিত পেট্রোলকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, অপরিশোধিত তেলের আমদানি কমানো এবং কৃষকদের আয় বৃদ্ধির অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরছে। কিন্তু সরকারের দাবি অনুযায়ী ইথানলের উৎপাদন ব্যয় যদি পেট্রোলের তুলনায় কম হয়, তাহলে সেই সুবিধার প্রতিফলন সাধারণ মানুষের জ্বালানির দামে কেন দেখা যাচ্ছে না—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কংগ্রেস।
দলের অভিযোগ, উৎপাদন খরচ কমলেও সেই আর্থিক সুবিধা সাধারণ ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর পরিবর্তে কর্পোরেট সংস্থাগুলিই লাভবান হচ্ছে কি না, তা নিয়ে জনমনে সংশয় তৈরি হয়েছে। এই বিষয়ে কেন্দ্র সরকারকে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রদেশ কংগ্রেস আরও দাবি করেছে, বর্তমানে দেশের অধিকাংশ মোটরসাইকেল, স্কুটার ও অন্যান্য যানবাহন প্রচলিত জ্বালানির জন্য তৈরি। ইথানলের উচ্চমাত্রার ব্যবহার ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা, জ্বালানি দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের উপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও অটোমোবাইল শিল্পের প্রতিনিধিরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দিয়ে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়ার দাবি জানিয়েছে দল।
বিবৃতিতে নীতি আয়োগের পূর্ববর্তী সুপারিশেরও উল্লেখ করা হয়েছে। কংগ্রেসের দাবি, পর্যাপ্ত অবকাঠামো, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং যানবাহনের সামঞ্জস্য নিশ্চিত না করেই দ্রুত ইথানল নীতি কার্যকর করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর ফলে জনগণের মতামত ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ উপেক্ষিত হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার প্রসঙ্গ তুলে প্রদেশ কংগ্রেস বলেছে, ইথানল উৎপাদনের জন্য বৃহৎ পরিসরে খাদ্যশস্য উৎপাদনের জমি ব্যবহার করা হলে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একইসঙ্গে ইথানল উৎপাদনে বিপুল পরিমাণ জল ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করার দাবি জানানো হয়েছে। পরিবেশগত প্রভাবের প্রসঙ্গেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কংগ্রেস। বিভিন্ন রাজ্যে ইথানল কারখানার দূষণ, ভূগর্ভস্থ জলের উপর প্রভাব এবং কৃষিজমির ক্ষতির অভিযোগ সামনে এসেছে উল্লেখ করে, এসব ঘটনার নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক তদন্তের দাবি জানিয়েছে দল। বিশেষ করে মেঘালয়ের বাইরনিহাট শিল্পাঞ্চলে দূষণ সংক্রান্ত অভিযোগ এবং একটি ইথানল কারখানাকে ঘিরে ওঠা বিতর্কের প্রসঙ্গও প্রেস বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রী নিতিন গড়কড়ির উপস্থিতিতে ইথানল নীতির প্রচার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে প্রদেশ কংগ্রেস। সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনের উল্লেখ করে দলের দাবি, মন্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে ইথানল শিল্পের সম্ভাব্য ব্যবসায়িক সম্পর্ক নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন উঠেছে, সে বিষয়ে কেন্দ্র সরকারের স্বচ্ছ অবস্থান জানানো উচিত। পাশাপাশি কোন কোন বেসরকারি সংস্থা কত পরিমাণ ইথানল সরবরাহ করছে এবং কী মূল্যে তা কেনা হচ্ছে, সেই তথ্যও প্রকাশ করার দাবি জানানো হয়েছে।
প্রদেশ কংগ্রেস স্পষ্ট করেছে যে তারা পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, কৃষকের উন্নয়ন কিংবা বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার বিরোধী নয়। তবে সাধারণ মানুষের আর্থিক স্বার্থ, পরিবেশগত প্রভাব এবং নীতির বাস্তব ফলাফল সম্পর্কে পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করে এই ধরনের নীতি চাপিয়ে দেওয়া গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী বলে তাদের মত।
প্রেস বিবৃতিতে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্র সরকারের কাছে ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল নীতির অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও প্রযুক্তিগত প্রভাব নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ, বিশেষজ্ঞদের মতামত জনসমক্ষে তুলে ধরা এবং জনগণের উদ্বেগ দূর করতে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছে ত্রিপুরা প্রদেশ কংগ্রেস।
























