কৈলাসহর, ২০ জুন : যে বয়সে একজন কিশোরীর স্কুলে পড়াশোনা করে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার কথা, সেই বয়সেই তাকে জোর করে বিয়ের পিঁড়িতে বসানোর চেষ্টা করেছিলেন তার বাবা। তবে কিশোরীর সাহসিকতা এবং চাইল্ডলাইনের দ্রুত পদক্ষেপে শেষ পর্যন্ত রক্ষা পেল একটি সম্ভাব্য বাল্যবিবাহ। ঘটনাটি প্রকাশ্যে এসেছে ঊনকোটি জেলার ফটিকরায় থানা এলাকার একটি গ্রাম থেকে।
জানা গেছে, ১৪ বছর বয়সী ওই নাবালিকা স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। তার বাবা পেশায় একজন গাড়িচালক। প্রায় এক বছর আগে তার মা অন্যত্র চলে যাওয়ার পর থেকে দুই ছোট ভাইকে নিয়ে বাবার সঙ্গেই বসবাস করছিল সে।
অভিযোগ, সম্প্রতি নাবালিকার বাবা তার বিয়ের জন্য একটি পাত্র ঠিক করেন এবং পড়াশোনা বন্ধ করে তাকে বিয়ে দিতে উদ্যোগী হন। কিন্তু নাবালিকা বিয়েতে রাজি না হওয়ায় তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। এমনকি বিয়ের দিনক্ষণও চূড়ান্ত করে ফেলেন তার বাবা।
পরিস্থিতির চাপে পড়েও হাল ছাড়েনি কিশোরী। বিয়ের নির্ধারিত তারিখের একদিন আগে, ১৮ জুন সন্ধ্যায় প্রতিবেশীর মোবাইল ফোন ব্যবহার করে সে শিশু সহায়তা নম্বর ১০৯৮-এ ফোন করে পুরো বিষয়টি জানায়। অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি কৈলাসহর চাইল্ডলাইন কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায়। এরপর চাইল্ডলাইন কর্মী অর্পিতা ব্যানার্জি, সৌভিক দে, সঞ্জিব শর্মা-সহ ছয় সদস্যের একটি দল ১৯ জুন নাবালিকার বাড়িতে পৌঁছে তদন্ত শুরু করে।
প্রথমে নাবালিকার বাবা বিয়ের বিষয়টি অস্বীকার করলেও, পরে কিশোরীর বক্তব্য এবং তার ব্যাগ থেকে উদ্ধার হওয়া বিয়ের শাড়ি, মালা, সিঁদুর, শাঁখা-সহ বিভিন্ন বিয়ের সামগ্রী ঘটনাটির সত্যতা প্রমাণ করে। এরপরই চাইল্ডলাইন কর্মীরা নাবালিকাকে উদ্ধার করে কৈলাসহরের ‘ওয়ান স্টপ সেন্টার’-এ নিয়ে যান।
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে চাইল্ডলাইন কর্মী সৌভিক দে জানান, নাবালিকাকে আপাতত ওয়ান স্টপ সেন্টারে রাখা হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি তাকে নিরাপদ আবাসনে পাঠানোর বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও সামনে এসেছে গ্রামীণ এলাকায় বাল্যবিবাহের প্রবণতা। সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হলেও এখনও অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের উদ্যোগেই বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ। সমাজের সচেতন মহলের মতে, বাল্যবিবাহে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এই ধরনের অপরাধ অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।
কিশোরীর উপস্থিত বুদ্ধি ও সাহসিকতায় একটি বাল্যবিবাহ রোধ করা সম্ভব হলেও, এই ঘটনা সমাজে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে আরও জোরালো সচেতনতা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।



















