আগরতলা, ,১৯ জুন: আজ শিলংয়ে অনুষ্ঠিত “ লিভারেজিং এক্সটার্নালি এইডেড প্রজেক্টস ইন দ্যা নর্থ ইস্ট স্টেট” শীর্ষক সেমিনারে, কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের উপস্থিতিতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে এক্সটার্নালি এইডেড প্রজেক্টস (ইএপি)-এর উপর আরোপিত ঋণসীমা প্রত্যাহারের জোরালো দাবি জানালেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডাঃ মানিক সাহা।
সেমিনারে আলোচনায় মুখ্যমন্ত্রী বলেন, গত দুই দশক ধরে ত্রিপুরা বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইন্ডো-জার্মান ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এবং জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জেআইসিএ)-র মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় একাধিক উন্নয়নমূলক প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করে আসছে। এসব প্রকল্প শুধু রাজ্যের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নেই নয়, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এডিবির ‘নর্থ ইস্ট ইকোনমিক করিডর’ সমীক্ষায় ত্রিপুরার শিল্প, নগর পরিকাঠামো, সড়ক, বিদ্যুৎ, পর্যটন ও স্বাস্থ্য খাতে বিপুল সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে রাজ্যে শিল্প পরিকাঠামো, নগর উন্নয়ন, পর্যটন, জলবায়ু সংরক্ষণ এবং তফসিলি জনজাতির আর্থ-সামাজিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মোট আটটি এক্সটার্নালি এইডেড প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে জানান, ত্রিপুরার অর্থনীতি গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ২০১৯-২০ অর্থবর্ষে রাজ্যের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন( জেসিডিপি) ছিল ৫৫,৯৮৪ কোটি টাকা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে বৃদ্ধি পেয়ে ১,০০,৭৯৫ কোটি টাকাতে পৌঁছেছে। একইভাবে, বার্ষিক মূলধনী ব্যয় ২০২১-২২ সালে ২,০৭৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ সালে রেকর্ড ১০,৪৭৮ কোটি টাকাতে উন্নীত হয়েছে, যা রাজ্যের উন্নয়নমূলক তহবিল কার্যকরভাবে ব্যবহার করার সক্ষমতার প্রতিফলন।
ডাঃ সাহা জানান, গত এক বছরে প্রায় ৩০,০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং ৮,০০০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের প্রকল্প ইতোমধ্যেই বাস্তবায়নের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এই বেসরকারি বিনিয়োগকে আরও উৎসাহিত করতে শিল্পাঞ্চল, সড়ক, বিদ্যুৎ, পর্যটন ও জলসম্পদসহ জনপরিকাঠামো খাতে বৃহৎ বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ইএপি প্রকল্পগুলিতে কেন্দ্র ও রাজ্যের অংশীদারিত্ব কাগজে-কলমে ৮০:২০, বাস্তবে ভূমি অধিগ্রহণ, বনভূমির অনুমোদন এবং বিভিন্ন পরিষেবা স্থানান্তরের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হওয়ায় রাজ্যের আর্থিক বোঝা অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রেক্ষাপটে, ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষ থেকে আরোপিত ইএপি ঋণসীমা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানানো হয় এবং বলা হয় যে, প্রতিটি রাজ্যের প্রশাসনিক দক্ষতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতার ভিত্তিতেই ঋণ গ্রহণের সুযোগ নির্ধারণ করা উচিত। এটি কেন্দ্র সরকারের ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’-র মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
মুখ্যমন্ত্রী আরো বলেন, ত্রিপুরা বাংলাদেশের সঙ্গে তিন দিক থেকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত ভাগ করে নেওয়ায় সীমান্তবর্তী নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। প্রতিবেশী দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব রাজ্যের অর্থনীতি ও আইন-শৃঙ্খলার ওপর পড়ে, যার ফলে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যয় বহন করতে হয়। পাশাপাশি, রাজ্যের নিজস্ব রাজস্ব আয়ের পরিমাণ সীমিত হওয়ায় মোট বাজেটের প্রায় ১৫ শতাংশই নিজস্ব উৎস থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে মুখ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তাঁদের সহযোগিতায় একাধিক এক্সটার্নালি এইডেড প্রজেক্টস অনুমোদিত হয়েছে এবং যার ফলে ত্রিপুরা আজ দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে। এছাড়াও, ১৬তম অর্থ কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী রেভিনিউ গ্যাপ গ্র্যান্ট বন্ধ হওয়ায় সৃষ্ট আর্থিক চ্যালেঞ্জের বিষয়টি তুলে ধরেন। যদিও ‘প্রাইড অফ হিলস’ উদ্যোগের মাধ্যমে কেন্দ্রের সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানানোর পাশাপাশি রাজ্যের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ভার মেটাতে এই প্রকল্পের বরাদ্দ আরও বাড়ানোর অনুরোধ করেন মুখ্যমন্ত্রী।
সবশেষে মুখ্যমন্ত্রী আরো বলেন, কেন্দ্রের সক্রিয় সহযোগিতায় শিল্প, যোগাযোগ ব্যবস্থা, দক্ষতা উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য শক্তি ও পর্যটনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জনগণের সার্বিক উন্নয়নে ত্রিপুরা নিরলসভাবে কাজ করে যাবে।



















