নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ১১ মার্চ: শ্রমিক কল্যাণে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা শ্রমিকদের কাছে পৌঁছে দিতে ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েতের জনপ্রতিনিধিদের অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। রাজ্যের প্রত্যেকটি পঞ্চায়েত সমিতি ও ব্লক উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে শ্রমিক কল্যাণ বিষয়ক প্রকল্পগুলি নিয়ে আলোচনা করতে হবে। কেননা শ্রমিকদের সার্বিক কল্যাণ ছাড়া একটি রাজ্য তথা দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। রাজ্য সরকার সকল স্তরের শ্রমিকদের আর্থসামাজিক অবস্থার মানোন্নয়নে সচেষ্ট রয়েছে। শ্রমমন্ত্রী টিংকু রায় আজ প্রজ্ঞা ভবনের ১ নং হলে আয়োজিত নির্মাণ শ্রমিক কল্যাণ প্রকল্পের জন্য ডায়নামিক ওয়েবভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশন এবং মোবাইল অ্যাপের সূচনা করে একথা বলেন। শ্রম দপ্তর এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এই অ্যাপের মূল উদ্দেশ্য হলো শ্রমিকগণ এখন মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে তাদের নাম নথিভুক্ত করতে পারবেন। আগে শ্রমিকদের নাম নথিভুক্ত করার জন্য কমিউনিটি সার্ভিস সেন্টারে (সি.এস.সি) যেতে হতো। এই অ্যাপের মাধ্যমে শ্রমিকগণ বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন এবং বেনিফিসিয়ারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে দ্রুত তাদের আর্থিক সুবিধা প্রদান করা যাবে।
এই ডায়নামিক পোর্টালের সূচনা করে শ্রমমন্ত্রী টিংকু রায় বলেন, ত্রিপুরা বিল্ডিং অ্যান্ড আদার কনস্ট্রাকশান ওয়েলফেয়ার বোর্ড দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা প্রদান করে আসছে। এখন পর্যন্ত মোট ৪৪ হাজার ৩৮৯ জন নির্মাণ শ্রমিকের নাম নিবন্ধিত করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এখন পর্যন্ত মোট ৫৩ কোটি ১৮ লক্ষ ৯২ হাজার ৪২৩ টাকা সেস সংগ্রহ করা হয়েছে, যা নির্মাণ শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই অর্থ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৮ হাজার ৫৭২ জনকে শিক্ষা খাতে, ৭৫৩ জনকে বিবাহের জন্য, ২৩ জনকে মাতৃত্বকালীন সহায়তা হিসেবে, ৬৩ জনকে মুখ্য রোগের চিকিৎসা বাবদ, ১ জনকে শারীরিক অক্ষমতার জন্য, ১,৪১৯ জনকে পেনশন সহায়তা হিসেবে, ১১৩ জনকে মৃত্যুজনিত সহায়তা হিসেবে, ৮০ জনকে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সহায়তা হিসেবে, ৭হাজার ৬৬৪ জনকে আয়ুষ্মান ভারত প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনায়, ৭ হাজার ৯০৯ জনকে স্কুলের পোশাক, খাদ্য, পুস্তকের জন্য এবং ১৩২ জনকে বন্যার ত্রাণ সহায়তা হিসেবে অর্থাৎ সর্বমোট ২৬ হাজার ৭২৯ জনকে ২৩ কোটি ৬ লক্ষ ১৭ হাজার ৬৬৮ টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
তিনি বলেন, রাজ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৪ হাজার ৩৮৯ জন নির্মাণ শ্রমিকের নাম নিবন্ধিত করা হয়েছে। নির্মাণ শ্রমিক প্রকল্পে রাজমিস্ত্রি, ইলেক্ট্রিশিয়ান, টাইলস মিস্ত্রি, প্লাম্বার, রং মিস্ত্রি প্রমুখ শ্রমিক এই প্রকল্পের সুযোগ নিতে পারবেন। কর্মস্থলে মহিলারা যাতে সুরক্ষিত থাকতে পারেন সে লক্ষ্যে রাজ্য সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শ্রমযোগী মানধন যোজনায় ১ জন শ্রমিকের ৬০ বছর পূর্ণ হলে তিনি প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা পেনশন পাওয়ার অধিকারী। এখন পর্যন্ত আমাদের রাজ্যে ৩৪ হাজার ৫৬৩ জন অসংগঠিত শ্রমিক এই প্রকল্পের অধীনে নথিভুক্ত রয়েছেন। তিনি বলেন, সম্প্রতি কৈলাসহরে জেলা শ্রম কার্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। এর কাজও শুরু করা হয়েছে। এছাড়া বিলোনীয়ায় জেলা শ্রম কার্যালয় নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে খোয়াই ও গোমতী জেলায় জেলা শ্রম কার্যালয় নির্মাণ করা হবে। এর জন্য জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, মালিক তথা নিয়োগকারীগণ যাতে অতি সহজেই নির্মাণ শ্রমিকদের একস্থানে পেতে পারেন সে লক্ষ্যে লেবার চৌক নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধর্মনগর, কৈলাসহর, বিলোনীয়া, আগরতলা ও উদয়পুরে এই লেবার চৌক নির্মাণ করা হবে। পরবর্তীতে অন্যান্য শ্রমিক বহুল স্থানে এই লেবার চৌক নির্মাণ করা হবে। তিনি বলেন, আমাদের রাজ্যে প্রায় ২৪ হাজার শ্রমিকের এমপ্লয়িজ স্টেট ইনস্যুরেন্স স্কিমের কার্ড রয়েছে। চা, রাবার ছাড়াও ছোট ছোট কারখানায় যারা কাজ করেন তারাও এই প্রকল্পের আওতায় আসতে পারেন। এই কার্ড যদি থাকে তাহলে অসুস্থ নির্মাণ শ্রমিক সকল সরকারি হাসপাতাল ও আই.এল.এস. হাসপাতালে অপারেশন সহ চিকিৎসা করাতে পারবেন। তিনি বলেন, নতুন শ্রম কোডে ই-ওয়ার্কারদের জন্য নানা সুবিধা প্রদানের সংস্থান রয়েছে। একজন শ্রমিক কোনও প্রাইভেট সংস্থায় ১ বছর কাজ করলে গ্র্যাচুইটির জন্য আবেদন জানাতে পারবেন। তিনি বলেন, নির্মাণ শ্রমিকদের প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের ৪ হাজার টাকা সহায়তার সংস্থান রাখা হয়েছে। উচ্চশিক্ষার জন্য ২০ হাজার টাকা সহায়তা করার সংস্থান রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, নতুন পোর্টালের বিষয়ে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য শ্রম দপ্তর উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি তথ্য প্রযুক্তি দপ্তরের সচিব কিরণ গিত্যে বলেন, এই অ্যাপের মূল উদ্দেশ্য হলো শ্রমিকগণ এখন মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নাম রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন। আগে শ্রমিকদের নাম রেজিস্ট্রেশন করার জন্য কমিউনিটি সার্ভিস সেন্টারে (সি.এস.সি.) যেতে হতো। স্বাগত বক্তব্য রাখেন শ্রম দপ্তরের সচিব তাপস রায়। অনুষ্ঠানে শ্রমমন্ত্রী সহ অতিথিগণ ৮ জেলার ৮ জন নির্মাণ শ্রমিকের হাতে নতুন রেজিস্ট্রেশন কার্ড তুলে দেন। এছাড়া অতিথিগণ ৬ জনকে বিবাহের জন্য জনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা করে চেক, ৭ জন মৃত শ্রমিকের পরিবারকে পরিবারপিছু ২ লক্ষ টাকা করে চেক, দুর্ঘটনায় মৃত একজন শ্রমিকের পরিবারকে ৪ লক্ষ টাকার চেক, ২ জনকে মাতৃত্বকালীন সহায়তা হিসেবে জনপ্রতি ৮ হাজার টাকা করে চেক ও ৪টি পরিবারকে উচ্চশিক্ষার জন্য পরিবারপিছু ২০ হাজার টাকার চেক তুলে দেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিম ত্রিপুরা জিলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাধিপতি বিশ্বজিৎ শীল, উত্তর ত্রিপুরা জিলা পরিষদের সভাধিপতি অপর্ণা নাথ, ধলাই জিলা পরিষদের সভাধিপতি সুস্মিতা দাস ছাড়াও বিভিন্ন পঞ্চায়েত সমিতির চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, নগর পঞ্চায়েতের চেয়ারপার্সন, ভাইস চেয়ারপার্সনগণ, কর্মবিনিয়োগ ও জনশক্তি পরিকল্পনা দপ্তরের অধিকর্তা অসীম সাহা সহ নির্মাণ শ্রমিকগণ। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন শ্রম কমিশনার বিশ্বজিৎ পাল।

