চূড়ান্ত পর্যায়ে ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তির খুঁটিনাটি আলোচনা : বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর

ওয়াশিংটন, ৫ ফেব্রুয়ারি : ঐতিহাসিক ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তির খুঁটিনাটি নির্ধারণের কাজ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানালেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সহযোগিতায় একটি “দৃঢ় গতি” স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২ থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমেরিকা সফর শেষে এই মন্তব্য করেন বিদেশমন্ত্রী। ওই সফরের সময় তিনি মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিওর আহ্বানে অনুষ্ঠিত ক্রিটিক্যাল মিনারেলস মিনিস্টেরিয়াল বৈঠকেও অংশ নেন।

এক্স-এ এক পোস্টে এস জয়শঙ্কর লেখেন, আমেরিকায় একটি ফলপ্রসূ ও ইতিবাচক সফর সম্পন্ন করলাম। উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য বিদেশসচিব রুবিওকে ধন্যবাদ। তিনি আরও বলেন, ঐতিহাসিক ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তির খুঁটিনাটি চূড়ান্ত করার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং খুব শিগগিরই তা সম্পন্ন হবে। এই চুক্তি আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে এবং সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিপুল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে।

বিদেশমন্ত্রী জানান, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ (ক্রিটিক্যাল মিনারেলস) ক্ষেত্রে দু’দেশের সহযোগিতাও দ্রুত এগিয়ে চলেছে। পাশাপাশি কৌশলগত বিষয়, প্রতিরক্ষা ও শক্তি ক্ষেত্রে আগামী দিনে আরও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও আলোচনা হবে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন। তাঁর কথায়, সব মিলিয়ে একটি শক্তিশালী গতি স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

গুরুত্বপূর্ণ এই সফরের সময় এস জয়শঙ্কর মার্কিন প্রশাসনের একাধিক শীর্ষ আধিকারিকের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর মধ্যে ছিল মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও এবং ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের সঙ্গে পৃথক বৈঠক। এই আলোচনায় ভারত-আমেরিকা কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের বিভিন্ন দিক উঠে আসে।

রুবিওর সঙ্গে বৈঠকের পর এক্স-এ বিদেশমন্ত্রী লেখেন, আজ বিকেলে মার্কিন বিদেশসচিব রুবিওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আনন্দিত। দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নানা বিষয় নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে। তিনি জানান, এই আলোচনায় বাণিজ্য, শক্তি, পরমাণু শক্তি, প্রতিরক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও প্রযুক্তি-সহ ভারত-আমেরিকা কৌশলগত অংশীদারিত্বের একাধিক স্তম্ভ নিয়ে কথা হয়েছে।

এস জয়শঙ্কর বলেন, উভয় দেশই পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনাগুলি দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে। আমাদের যৌথ স্বার্থ এগিয়ে নিয়ে যেতে বিভিন্ন ব্যবস্থার অধীনে দ্রুত বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে সম্মতি হয়েছে, তিনি জানান।

মার্কিন বিদেশ দফতরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ অনুসন্ধান, খনন ও প্রক্রিয়াকরণ ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এই ক্ষেত্রটি বর্তমানে ভারত-আমেরিকা অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের একটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হিসেবে উঠে এসেছে।

উল্লেখ্য, এই বৈঠকটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়, যখন তার আগের দিনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাধা কমানো এবং বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা করেন। মার্কিন বিদেশসচিব রুবিও ও বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর উভয়েই এই চুক্তিকে স্বাগত জানান এবং শক্তি নিরাপত্তা ও নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টিতে দুই বৃহৎ গণতন্ত্রের একসঙ্গে কাজ করার গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন।

বৈঠকে আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার দিকটিও আলোচনায় উঠে আসে। উভয় পক্ষই কোয়াড (কোয়াড্রিল্যাটারাল সিকিউরিটি ডায়ালগ)-এর মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তাঁরা স্বীকার করেন, সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল যৌথ স্বার্থ রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এর আগে বুধবার বিদেশমন্ত্রী ওয়াশিংটনে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। এই বৈঠককে তিনি “উপযোগী ও ফলপ্রসূ” বলে উল্লেখ করে জানান, ভারত-আমেরিকা অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব ও কৌশলগত সহযোগিতা আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

এই ধারাবাহিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলি কূটনীতি, নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও অর্থনীতি, সব ক্ষেত্রেই ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের বিস্তৃত পরিসরকে তুলে ধরছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে প্রতিরক্ষা, শক্তি ও উদীয়মান প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সহযোগিতা যেমন বেড়েছে, তেমনই বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্পর্কও গভীর হয়েছে। উভয় দেশই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলসহ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতে নিয়মিত সংলাপ বজায় রাখাকে নিজেদের বিদেশনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে দেখছে।

Leave a Reply