তেহরান, ২ জানুয়ারি : ২০২৩ সালের শুরুতেই পশ্চিম এশিয়ার দেশ ইরানে অশান্তি ও বিক্ষোভের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। গত সপ্তাহখানেক ধরে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলী খামেনেইয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। নিরাপত্তাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে এখনও পর্যন্ত অন্তত ৭ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিক্ষোভকারী ছাড়াও এক নিরাপত্তাকর্মী রয়েছেন। আহত অন্তত ২০ জন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শুরু হয়েছে ধরপাকড়ও। পুলিশ জানায়, অশান্তি ছড়ানোর অভিযোগে অন্তত ৩০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সংবাদসংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জানা গেছে, বিক্ষোভের সূচনা ২৭ ডিসেম্বর থেকে। ওইদিন তেহরানের দোকানিরা মুদ্রাস্ফীতি এবং মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে দেশের অন্যান্য শহরেও এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। লোর্ডেগান, কুহদাশত এবং ইসফাহানসহ একাধিক স্থানে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যু সংবাদ পাওয়া গেছে। এছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা তেহরানের রাস্তায় নেমে এসে ‘স্বৈরশাসন নিপাত যাক’ স্লোগান দিয়েছেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের সময় ক্ষমতাচ্যুত শাহ মহম্মদ রেজ়া পাহলভির পুত্র রেজ়া পাহলভির সমর্থনে স্লোগান ওঠে— “শাহ দীর্ঘজীবী হোন”।
এই প্রতিবাদ-বিক্ষোভের প্রতি মার্কিন মুলুকে নির্বাসিত রেজ়া পাহলভি সমর্থন জানিয়েছেন। এক্স (প্রাক্তন টুইটার)-এ তিনি লিখেছেন, “যতদিন এই সরকার ক্ষমতায় থাকবে, ততদিন দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকবে। আমি আপনাদের সঙ্গে আছি। জয় আমাদের হবেই, কারণ আমাদের দাবি ন্যায্য।”
এদিকে, গত এক সপ্তাহ ধরে ইরানের রাস্তায় নিরাপত্তাবাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর-এর সংবাদসংস্থা ফার্স জানিয়েছে, বুধবার দু’জন এবং বৃহস্পতিবার পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে। লোর্ডেগান শহরে দু’জন, কুহদাশতে এক জন এবং ইসফাহান প্রদেশে এক জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া কেরমানশাহ, খুজেস্তান এবং হামেদান প্রদেশেও বিক্ষোভ চলছে। আজ়না শহরে তিন জন মারা গিয়েছেন। নিরাপত্তাবাহিনীর এক সদস্যও নিহত হয়েছেন।
বিক্ষোভকারীরা প্রশাসনিক ভবনে পাথর ছোড়ার পাশাপাশি রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। লোর্ডেগান শহরে বাজার-হাট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, গত কয়েক বছরে মূল্যবৃদ্ধি, খরা, নারী অধিকার, রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ে একাধিক বিক্ষোভ কড়া হাতে দমন করেছে ইরান সরকার। সরকার যে ধরপাকড় চালাচ্ছে এবং নিরাপত্তাবাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে, তা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলি বার বার তুলে ধরেছে। তবে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সরকার বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে আগ্রহী বলে জানানো হয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বিক্ষোভকারীদের দাবির বৈধতা স্বীকার করে বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উন্নত করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে, ইরানের মুদ্রা রিয়ালের দ্রুত অবমূল্যায়ন রোধ করতে সরকারের কিছু করার নেই বলে স্বীকার করেছেন প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান। বর্তমানে ১ ডলারের দাম প্রায় ১৪ লক্ষ রিয়াল। তবে, সরকারের পক্ষ থেকে জনসাধারণকে সতর্ক করা হয়েছে যাতে কেউ এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে।

