পাটনা, ১১ নভেম্বর : বিহার বিধানসভা নির্বাচন একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। রাজ্যে দুই দফায় মোট ৬৬.৯১ শতাংশ ভোটদানের হার নথিভুক্ত হয়েছে, যা ১৯৫১ সালের প্রথম বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে সর্বোচ্চ। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, পুরুষ ভোটারদের ভোটদানের হার ৬২.৮ শতাংশ, আর মহিলা ভোটারদের অংশগ্রহণ ৭১.৬ শতাংশ, যা বিহারের নির্বাচনী ইতিহাসে সর্বোচ্চ নারী ভোটদান হিসেবে রেকর্ড গড়েছে। এদিকে, প্রথম দফায় ৬৫.০৮ শতাংশ এবং আজ দ্বিতীয় দফায় ৬৮.৭৬ শতাংশ ভোট পড়েছে। ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার, নির্বাচন কমিশনার ড. সুখবীর সিং সন্দু ও ড. বিবেক জোশি নির্বাচন কমিশনের কন্ট্রোল সেন্টার থেকে ওয়েবকাস্টিংয়ের মাধ্যমে ৪৫,৩৯৯টি ভোটকেন্দ্রের ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন।
দুই দফা নির্বাচনে প্রায় ৮.৫ লক্ষ নির্বাচনকর্মী, ১.৪ লক্ষেরও বেশি পোলিং এজেন্ট এবং ২,৬১৬ প্রার্থী নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অংশ নিয়েছেন। এছাড়া ২৪৩ জন সাধারণ পর্যবেক্ষক, ৩৮ জন পুলিশ পর্যবেক্ষক ও ৬৭ জন ব্যয় পর্যবেক্ষক নির্বাচনী কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করেছেন। এই বছর প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কর্মসূচির আওতায় দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, বেলজিয়াম ও কলম্বিয়া এই ছয় দেশের ১৬ জন প্রতিনিধি বিহারে এসে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করেন। আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা বিহারের নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে বিশ্বমানের সংগঠিত, স্বচ্ছ, কার্যকরী ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলে প্রশংসা করেছেন। নির্বাচন কমিশনের মতে, এই রেকর্ড ভোটহার বিহারের গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার প্রতিফলন এবং নারী ভোটারদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সচেতনতার এক ঐতিহাসিক নিদর্শন।
বিহার বিধানসভা নির্বাচনে দ্বিতীয় ও শেষ দফার ভোটগ্রহণে রাজ্যজুড়ে ৬৮.৭৬ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে ভারতের নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে কাটিহার জেলায়, যেখানে ভোটদানের হার ছিল ৭৮.৩৯ শতাংশ। এর পরেই রয়েছে কিশানগঞ্জ ৭৭.৯১শতাংশ, পূর্ণিয়া ৭৫.৮৭ শতাংশ এবং সুপৌল ৭২.৪৬ শতাংশ। অন্যদিকে, সবচেয়ে কম ভোটদানের হার নথিভুক্ত হয়েছে নওয়াদা জেলায় ৫৭.৮০ শতাংশ। তার পরেই রয়েছে রোহতাস ৬১.৮১ শতাংশ, মধুবনি ৬৩.২৪ শতাংশ এবং অরবল ৬৩.৮২ শতাংশ। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, সামগ্রিকভাবে ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। নারী ও তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশ্লেষকদের মতে, এই উচ্চ ভোটহার ইঙ্গিত দিচ্ছে—বিহারের জনগণ পরিবর্তন ও উন্নয়নের প্রশ্নে সক্রিয়ভাবে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মঙ্গলবার সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ একটি পোস্টের মাধ্যমে বিহার বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত পর্বে ব্যাপক ভোটদানের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি লেখেন, আজ বিহার বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় ও শেষ দফার ভোটগ্রহণ চলছে। সকল ভোটারের প্রতি আমার অনুরোধ, সক্রিয়ভাবে এই গণতান্ত্রিক উৎসবে অংশ নিন এবং ভোটের একটি নতুন রেকর্ড গড়ুন। প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে রাজ্যের প্রথমবারের ভোটারদের উদ্দেশে বার্তা দেন। তিনি বলেন, আমার তরুণ বন্ধুদের কাছে অনুরোধ, আপনারা শুধু নিজেরা ভোট দেবেন না, অন্যদেরও ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করুন।
পূর্ণিয়ার সাংসদ পাপ্পু যাদব মঙ্গলবার মধ্য বিদ্যালয় পূর্ণিয়া কোর্টের ১২৭ নম্বর বুথে গিয়ে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ভোট দেওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, গণতন্ত্র রক্ষার জন্য প্রত্যেক নাগরিকেরই ভোট দেওয়া উচিত। তবে তিনি অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনীর জওয়ানরা ভোট চলাকালীন পক্ষপাতমূলক আচরণ করছেন। পাপ্পু যাদব বলেন, এটি একদমই সঠিক নয়। আমরা এই বিষয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি আরও গুরুতর অভিযোগ তুলে বলেন, নির্বাচনে নকল মুদ্রা ব্যবহার করা হচ্ছে এবং নির্বাচন কমিশন নাকি বিজেপির দফতরে বসে নির্বাচন পরিচালনা করছে। সাংসদের এই অভিযোগ ঘিরে পূর্ণিয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
বিহারের অরারিয়া জেলার ফরবিসগঞ্জে মঙ্গলবার ভোট চলাকালীন বিজেপি ও কংগ্রেস সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে নিরাপত্তা বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করে বলপ্রয়োগ করতে হয়। ঘটনাটি ফরবিসগঞ্জ কলেজের ১৯৮ নম্বর বুথের। কংগ্রেস সমর্থকদের অভিযোগ, বিজেপি বিধায়ক ও এনডিএ প্রার্থী কংগ্রেস ভোটারদের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক মন্তব্য করেন এবং বলেন, কংগ্রেসের ভোটারদের পিটিয়ে মারো। এই অভিযোগের পর ক্ষুব্ধ কংগ্রেস কর্মীরা বুথের বাইরে বিক্ষোভ ও হট্টগোল শুরু করেন। প্রায় আধঘণ্টা ধরে উত্তেজনা চলার পর নিরাপত্তাকর্মীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। এ বিষয়ে এসডিও রঞ্জিত কুমার রঞ্জন জানান, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ শান্ত করা হয়েছে। লাঠিচার্জের কোনো ঘটনা ঘটেনি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভোটগ্রহণ এখন স্বাভাবিকভাবে চলছে এবং এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা মোতায়েন করা হয়েছে।
বিহারের পশ্চিম চম্পারণ জেলার রামনগর বিধানসভা এলাকার গোবরহিয়া দোন গ্রামে গ্রামবাসীরা মঙ্গলবার ভোট বয়কট করেছেন। দুই সপ্তাহ আগে থেকেই তারা ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। প্রশাসন আশা করেছিল, ভোটের দিন নাগাদ তাঁরা সিদ্ধান্ত বদলাবেন। এমনকি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজে কয়েকজন গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে তাঁদের দাবিগুলি পূরণের আশ্বাসও দিয়েছিলেন। তবুও গ্রামবাসীরা নিজেদের অবস্থান থেকে সরেননি। ভোটের দিন বুথে নির্বাচনকর্মীরা প্রস্তুত থাকলেও, এক জনও ভোটার ভোট দিতে আসেননি। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরও তাঁদের এলাকায় মৌলিক সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়ে গেছে। বর্ষার সময় প্রায় চার মাস ধরে গ্রামটি আশপাশের এলাকা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একজন গ্রামবাসী বলেন, শিশু, মহিলা ও বৃদ্ধরা চিকিৎসার অভাবে মারা যান। অসুস্থদের আজও খাটিয়ায় তুলে হাসপাতালে নিতে হয়। আমরা বারবার প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলিকে চিঠি লিখেছি, কিন্তু কেউ ব্যবস্থা নেয়নি। গ্রামবাসীদের বক্তব্য, যখন ভোটের সময় আসে, তখনই সব দলের নেতারা আসে, আশ্বাস দিয়ে আমাদের ভোট নিয়ে চলে যায়। আমরা যেমন ভোট দেওয়ার অধিকার পেয়েছি, তেমনই ভোট বয়কট করারও অধিকার রাখি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গ্রামবাসীদের দাবি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জন সুরাজ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত কিশোর মঙ্গলবার বিহার বিধানসভা নির্বাচনের শেষ দফায় নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন এবং রাজ্যের ভোটারদের ‘পরিবর্তনের পক্ষে’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। রোহতাস জেলার কারগাহর বিধানসভা কেন্দ্রে ভোট দিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, এই নির্বাচনের সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলে বিহারকে আরও পাঁচ বছর দুর্নীতি, বেকারত্ব ও বাধ্যতামূলক অভিবাসনের শিকার হতে হবে। প্রশান্ত বলেন, আমি বিহারের জনগণকে অনুরোধ করছি, বাড়িতে বসে সময় নষ্ট করবেন না, প্রতিবেশীর সঙ্গে আড্ডায় না গিয়ে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছান। নিজের ও রাজ্যের উন্নতির জন্য পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিন। তিনি আরও বলেন, এই নির্বাচন সৎ ও দক্ষ প্রার্থীদের বেছে নেওয়ার একটি সুযোগ। এর মাধ্যমে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়ানো সম্ভব। যদি এই সুযোগ হাতছাড়া হয়, তবে বিহারকে আরও পাঁচ বছর দুর্নীতি ও বেকারত্বের সঙ্গে লড়তে হবে।
চেনারী বিধানসভা এলাকার কোঙ্কি গ্রামেও মঙ্গলবার ভোট বয়কটের ঘটনা ঘটেছে। বুথ নম্বর ২০৪-এ এক জন ভোটারও ভোট দিতে উপস্থিত হননি। গ্রামবাসীরা অভিযোগ করেছেন, তাঁদের গ্রামে পঞ্চায়েত ভবন নির্মাণ না হওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ। ভোটকেন্দ্রটি শিবসাগর মধ্য বিদ্যালয় কোঙ্কিতে স্থাপন করা হয়েছে। পূর্বে ওই গ্রামে পঞ্চায়েত ভবন তৈরি হওয়ার কথা থাকলেও তা অন্য গ্রামে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। গ্রামবাসীরা অভিযোগ করেছেন, বহুবার তারা বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছিলেন, কিন্তু কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। অবশেষে বিরক্ত গ্রামবাসীরা ভোট বয়কট করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গ্রামবাসীদের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিহারের সীতামঢ়ি জেলার রুন্নীসৈদপুর এলাকার রাজকীয় মধ্য বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের (বুথ নং ২৭০) এক পোলিং এজেন্টের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। সূত্রে জানা গেছে, পোলিং এজেন্ট গৌতম কুমার ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছিলেন। অভিযোগ, তিনি সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রচারপত্র বা পাম্পলেট ভোটারদের সামনে দেখিয়ে তাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন, যা আদর্শ আচরণবিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন। ঘটনার খবর পেয়ে নির্বাচনকর্মীরা সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনকে জানান এবং পরে গৌতম কুমারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা দায়ের করা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের ঘটনায় কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিহার বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ চলাকালীন মঙ্গলবার বিজেপি রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছে। বিজেপির অভিযোগ, আরজেডি তাদের সামাজিক মাধ্যমের হ্যান্ডেল ব্যবহার করে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করছে, যা আদর্শ আচরণবিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন। অভিযোগে বলা হয়েছে, আরজেডির সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকে এমন পোস্ট করা হচ্ছে যেখানে দাবি করা হচ্ছে, বিজেপি ও এলজেপি ভোটারদের জেডিইউ-কে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে এবং উল্টোদিকে জেডিইউ নাকি বিজেপি ও এলজেপি-র পক্ষে ভোট দিচ্ছে না। বিজেপির দাবি, এই সমস্ত পোস্ট ভুয়া ও জনমত প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। বিজেপি নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন করেছে যেন দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং আদর্শ আচরণবিধি ভঙ্গের এই ঘটনায় আরজেডির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগটি গ্রহণ করা হয়েছে এবং বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

