জরুরি অবস্থার ৫০ বছর—’সংবিধান হত্যা দিবস’ হিসেবে পালিত হল ভারতের গণতন্ত্রের অন্ধকার অধ্যায়ের স্মৃতি

নয়াদিল্লি, ২৫ জুন : ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন ঘোষিত জরুরি অবস্থার ৫০তম বর্ষপূর্তিতে কেন্দ্রীয় সরকার বুধবার ‘সংবিধান হত্যা দিবস’ হিসেবে দিনটি পালন করছে। দিল্লির ত্যাগরাজ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়েছে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান, যেখানে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব এবং সংস্কৃতি মন্ত্রী গজেন্দ্র সিং শেখাওয়াত। সংস্কৃতি মন্ত্রকের আয়োজনে “স্বাধীনতার ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়” নামক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই দিবসটি স্মরণ করা হয়েছে।
দিল্লির ত্যাগরাজ স্টেডিয়ামে আজ আয়োজিত হয় কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রকের একটি বিশেষ অনুষ্ঠান, যেখানে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব ও সংস্কৃতি মন্ত্রী গজেন্দ্র সিং শেখাওয়াত। অমিত শাহ এই উপলক্ষে বলেন, “জরুরি অবস্থা কোনো জাতীয় সংকটের কারণে নয়, বরং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য চাপানো হয়েছিল। সংবাদমাধ্যম স্তব্ধ ছিল, বিচারব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছিল, মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল—গণতন্ত্রকে কার্যত হত্যা করা হয়েছিল।” তিনি আরও বলেন, “এমন একটি অধ্যায় ভুলে গেলে ভবিষ্যতে তার পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা বাড়ে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সিদ্ধান্তে আজকের এই আয়োজন দেশকে সতর্ক করতে সাহায্য করবে।”
সারা দেশে রাজ্য থেকে রাজ্যে বিভিন্ন আয়োজনে দিনটি পালিত হয়েছে। সিকিমে মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাং গ্যাংটকের এমজি মার্গ থেকে একটি পদযাত্রার নেতৃত্ব দেন। তিনি বলেন, “গণতন্ত্র কেবলমাত্র নির্বাচন নয়, এটি হল প্রতিদিনের দায়িত্ব ও নাগরিক সচেতনতা। সংবিধান আমাদের অধিকার দেয়, আমাদের সরকারকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করে।” তিনি এই দিনটিকে সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদীকে ধন্যবাদ জানান। একইসঙ্গে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা, মন্ত্রীরা ও বিধায়করা অংশ নেন এই কর্মসূচিতে।
অরুণাচল প্রদেশেও দিনটি পালিত হয়েছে রাজকীয়ভাবে। ইটানগরের ইন্দিরা গান্ধী পার্ক থেকে শুরু হয় ‘Walk-in Rally’, যার নেতৃত্ব দেন রাজ্যের শিল্প ও সংস্কৃতি মন্ত্রী দাসাংলু পুল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যপাল লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) কে.টি. পারনাইক, ডেপুটি মুখ্যমন্ত্রী চাউন মাইন, বিধায়ক ও কর্মকর্তারা। সেখানে এক তথ্যচিত্র প্রদর্শন ও প্রদর্শনী আয়োজন করা হয়, যা জরুরি অবস্থার ভয়াবহতা ও তার অভিঘাতকে বর্তমান প্রজন্মের সামনে তুলে ধরে।
মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ড. মোহন যাদব ইন্দোরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বলেন, “জরুরি অবস্থা হল ভারতের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। যারা এটি চাপিয়ে দিয়েছিল, তাদের জন্যই আজও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত।” রাজ্যে এক বছরের কর্মসূচি শুরু হয়েছে আজ থেকে, যার মধ্যে থাকবে বিতর্ক, র্যালি, সেমিনার ও প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা।
অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, “যারা একসময় সংবিধানকে শ্বাসরোধ করেছিল, আজ তারাই সংবিধানের রক্ষাকর্তা হিসেবে নিজেদের তুলে ধরছে—এটা ভণ্ডামি ছাড়া কিছু নয়। ২৫ জুন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সেই অন্ধকার সময়কে, যখন দেশজুড়ে নাগরিক অধিকার হরণ করা হয়েছিল।” তিনি সেইসব মানুষদের শ্রদ্ধা জানান যাঁরা প্রতিবাদ করে কারাবরণ করেছিলেন।
এদিকে সমাজবাদী পার্টির পক্ষ থেকে এই দিবসকে পালিত হয়েছে ভিন্ন নামে—‘সংবিধান রক্ষা দিবস’। দলের নেতা রবিদাস মেহরোত্রা বলেন, “জরুরি অবস্থার সময় আমরা জেলে ছিলাম, গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল। আজ আমরা শপথ নিচ্ছি সংবিধান রক্ষার। কালো ব্যাজ পরে প্রতিবাদ জানানোই আমাদের বার্তা।”
সারা দেশে এই দিবস পালনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে—গণতন্ত্রকে রক্ষা করা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি নাগরিকেরও দায়িত্ব। এই দিনটি ইতিহাসের স্মরণ, সতর্কতা এবং দায়বদ্ধতার দিন। সংবিধানকে সম্মান জানানো মানে শুধুমাত্র তার বিধান মানা নয়, তার চেতনা এবং নৈতিক কাঠামোকে রক্ষা করা। অতএব, ‘সংবিধান হত্যা দিবস’ পালন একদিকে যেমন অতীতের অন্যায়ের স্মরণ, তেমনি বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি নবায়ন।