যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হামলায় ইরানের তিনটি পরমাণু কেন্দ্র ধ্বংস: ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধে যুক্ত হলো আমেরিকা, উদ্বেগে কাঁপছে গোটা বিশ্ব

তেহরান, ২২ জুন : মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যুদ্ধের ঘনঘটা। ইসরায়েল ও ইরানের চলমান সংঘাতে এবার সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশ—ফলে সংঘাত আরও বিপজ্জনক রূপ নিতে চলেছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। রোববার ভোরে মার্কিন যুদ্ধবিমান ও সাবমেরিন থেকে ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু কেন্দ্রে ‘বাঙ্কার বাষ্টার’ বোমা ফেলা হয়। এই হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের পক্ষে যুদ্ধের ময়দানে প্রবেশ করল। হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান ও ইসরায়েল একে অপরের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, ফলে সংঘাতের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।

শনিবার গভীর রাতে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, “আমাদের বিমান বাহিনী ইরানের ফোর্ডো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহান পরমাণু কেন্দ্রে অত্যন্ত সফল হামলা চালিয়েছে।” সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, “ইরানকে এখন এই যুদ্ধ বন্ধে সম্মত হতে হবে, নইলে পরিণতি আরও ভয়াবহ হবে।”

এই প্রথমবার ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের অভ্যন্তরে কোনও স্থাপনায় হামলা চালাল। প্রসঙ্গত, শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি দুই সপ্তাহ সময় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে কি না। কিন্তু শনিবারই নাটকীয়ভাবে হামলা চালিয়ে তিনি যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেন।

প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের ১৩ জুন ইসরায়েল ইরানের উপর হঠাৎ হামলা চালায়। ইসরায়েলের দাবি, তারা নিশ্চিত ছিল ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, যদিও ইরান বরাবরই তা অস্বীকার করে এসেছে। ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে ইসরায়েলের একাধিক স্থানে আঘাত হানে। এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রতিরক্ষায় সক্রিয়ভাবে সাহায্য করলেও সরাসরি হামলা চালায়নি—যতক্ষণ না এই শনিবারের ঘটনা ঘটে।

এই অভিযানে ব্যবহার করা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গোপনীয় এবং প্রযুক্তি-নির্ভর যুদ্ধবিমান বি-২ স্পিরিট। এটি স্টেলথ প্রযুক্তিতে তৈরি, যার কারণে রাডারে ধরা পড়ে না। বিমানটি প্রতি ইউনিটের দাম প্রায় ২.১ বিলিয়ন ডলার। এই অভিযানে বিমানটি বহন করেছে জিবিইউ-৫৭এ/বি ধরনের ৩০,০০০ পাউন্ড ওজনের ‘ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর’ বোমা, যা বিশেষভাবে পাহাড়ের নিচে থাকা ঘাঁটি ধ্বংসের জন্য তৈরি।

তেহরান থেকে ২২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত নাতাঞ্জ ইরানের মূল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র। এখানে ইউরেনিয়াম ৬০% পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা হচ্ছিল, যা অস্ত্র-মানের ইউরেনিয়ামের খুব কাছাকাছি। ইতিপূর্বে ইসরায়েল এই কেন্দ্রের উপরের অংশে হামলা চালিয়েছিল। তবে এবার যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ভূগর্ভস্থ সেন্ট্রিফিউজ ক্যাসকেডগুলিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংস্থা জানিয়েছে, হামলার পর কেন্দ্রটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

তেহরান থেকে ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত ফোর্ডো পরমাণু কেন্দ্রটি পাহাড়ের নিচে নির্মিত এবং শক্তিশালী বিমান বিধ্বংসী প্রতিরক্ষায় সুরক্ষিত। এর অস্তিত্ব প্রথম প্রকাশ্যে আসে ২০০৯ সালে। এই স্থাপনাটি শুধুমাত্র ‘বাঙ্কার-বাস্টার’ বোমার মাধ্যমে ধ্বংস করা সম্ভব বলে মনে করা হয়। মার্কিন বি-২ বোমারু বিমান থেকে ছোড়া ছয়টি জিবিইউ-৫৭এ/বি বোমা এই ঘাঁটিতে বিস্ফোরণ ঘটায়।

তেহরান থেকে ৩৫০ কিমি দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত এই স্থাপনাটি একাধিক গবেষণা কেন্দ্র ও ইউরেনিয়াম রূপান্তর কারখানা নিয়ে গঠিত। এটি চীনের সহায়তায় নির্মিত তিনটি গবেষণা রিঅ্যাক্টরসহ একটি বিশাল বৈজ্ঞানিক পরিকাঠামো। মার্কিন হামলায় কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, সংবাদ মাধ্যমগুলো জানিয়েছে, এই কেন্দ্রে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা বেড়েছে এমন কোনও প্রমাণ মেলেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার ফলে গোটা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, রাশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, জার্মানি, ফ্রান্স, ভারত সহ বহু দেশ শান্তির আহ্বান জানিয়েছে। তবে এই সংঘাতকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ঘটনার ফলে কূটনৈতিক সমাধানের পথ আরও কঠিন হয়ে উঠবে এবং পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াও বিপন্ন হতে পারে। এখন দেখার, এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিশ্ব সম্প্রদায় কীভাবে সামাল দেয়—এবং আগামী দিনগুলিতে মানবজাতির ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে।