– আজকের মধ্যে লুণ্ঠিত অস্ত্র পুলিশের কাছে হস্তান্তর করতে হামলাবাজদের কাছে আহ্বান, নইলে কড়া ব্যবস্থা, আগামীকাল থেকে চলবে কমবিং অপারেশন : অমিত
– মায়ানমার সীমান্তে বেড়া সংস্থাপনের কাজ চলছে, জানান শাহ
– ‘উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন উগ্রপন্থী সংগঠনের প্রায় আট হাজার সক্রিয় ক্যাডার মূল স্রোতে ফিরে এসেছেন’
ইমফল, ১ জুন (হি.স.) : মণিপুরে চলমান হিংসার তদন্তভার বিচার বিভাগকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এছাড়া আজ বৃহস্পতিবারের মধ্যে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজত থেকে লুণ্ঠিত যাবতীয় অস্ত্রশস্ত্র সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করতে হামলাবাজদের কাছে আহ্বান জানিয়ে অমিত শাহের বার্তা, নইলে নেওয়া হবে কড়া ব্যবস্থা। অবৈধ অস্ত্রশস্ত্রের বিরুদ্ধে আগামীকাল থেকে চলবে কমবিং অপারেশন। তখন যাদের হেফাজত থেকে অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার হবে, তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্কবার্তা দিয়েছেন অমিত শাহ। তিনি জানান, ইতিমধ্যে ভারত-মায়ানমার সীমান্তে বেড়া সংস্থাপনের কাজও শুরু হয়ে গেছে।
আজ ইমফলে মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিং এবং ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর অধিকর্তা তপনকুমার ডেকাকে দু-পাশে বসিয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে গত তিনদিনে রাজ্য সফরে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা সংবলিত তথ্যের বিবরণ দিতে গিয়ে ওই কথাগুলি বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি বলেন, সহিংসতার ঘটনা সাময়িক পর্যায়ে ছিল দূর হবে ভুল বোঝাবুঝি দূর হবে। শীঘ্রই স্বাভাবিক হবে পরিস্থিতি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণা, মণিপুরের রাজ্যপাল আনুসুইয়া উইকির নেতৃত্বে গঠিত হবে একটি শান্তি কমিটি। এই কমিটিতে সকল রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধির পাশাপাশি মেইতেই ও কুকি, উভয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং সামাজিক সংগঠনগুলি থাকবে।
অপারেশন স্থগিতভুক্ত (এসওও) জঙ্গিদের জন্য অমিত শাহের সতর্কবার্তা, শান্তিবিঘ্নকারীদের কড়া হাতে মোকাবেলা করা হবে। আজ থেকেই এ ধরনের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে লড়াই চালাবে সেনাবাহিনী। তাই সময় থাকতে আজকের মধ্যে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজত থেকে লুণ্ঠিত যাবতীয় অস্ত্রশস্ত্র সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করতে হামলাবাজদের কাছে আহ্বান জানিয়ে অমিত শাহের বার্তা, নইলে নেওয়া হবে কড়া ব্যবস্থা। অবৈধ অস্ত্রশস্ত্রের বিরুদ্ধে আগামীকাল থেকে চলবে কমবিং অপারেশন।
প্রায় ২৬ মিনিটের সাংবাদিক সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২৯ মে রাজ্যে এসে মুখ্যমন্ত্রী সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবর্গ, সাধারণ ও পুলিশ প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী, বিবদমান দুই গোষ্ঠী মেইতেই ও কুকি নাগরিক সমাজ, মহিলা সুশীল সমাজের সঙ্গে বৈঠক দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। সবার কথা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে শুনেছেন। চলমান সহিংসতার বিষয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সবাই রাজ্যে শান্তির বাতাবরণ ফিরিয়ে আনতে সর্বতোপ্রকারে সহযোগিতা করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন, বলেন অমিত শাহ। সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে অধ্যয়ন করে সিবিআইয়ের এক বিশেষ দলকে রাজ্যে সহিংসতা সম্পর্কিত ছয়টি মামলার তদন্ত করতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, মণিপুরে হিংসাত্মক ঘটনার তদন্তে বেশ কয়েকটি সংস্থা কাজ করছে। সহিংসতার ছয়টি ঘটনার পিছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে অভিযোগের ভিত্তিতে উচ্চস্তরের সিবিআই তদন্ত হবে। অমিত বলেন, ‘আমি নিশ্চিত করছি, তদন্তটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে।’
পাশাপাশি সহিংসতার বিষয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ কেন্দ্রীয় সরকার দিয়েছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, এর নেতৃত্বে থাকবেন হাইকোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি।
অমিত শাহ জানান, কেবল তা-ই নয়, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র এবং অন্যান্য মন্ত্রকের যুগ্মসচিব এবং যুগ্ম অধিকর্তাস্তরের আধিকারিকরা মণিপুরে এসে পরিস্থিতির যাচাই করবেন এবং মানুষের সাহায্য করতে লেগে যাবেন। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, মণিপুর সহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন উগ্রপন্থী সংগঠনের প্রায় আট হাজার সক্রিয় ক্যাডার মূল স্রোতে ফিরে এসেছেন। অধিকাংশ উগ্রপন্থী সংগঠন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সে দু-তিনটি আছে, তাদের সঙ্গে শান্তি-আলোচনার জন্য যোগাযোগ চলছে। তাঁর আশা, ওই সব সংগঠনও মূল স্রোতে ফিরে আসবে।
এছাড়া সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মণিপুরের ভারত-মায়ানমার সীমান্তে বেড়া সংস্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র। এর মধ্যে ১০ কিলোমিটারের কাজ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে এবং বাকি ৮০ কিলোমিটার সীমান্ত-বেড়া সংস্থাপনের জন্য কাজ করতে টেন্ডার জারি করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘গত ছয় বছরে মণিপুরে কোনও হিংসা হয়নি। কিন্তু গত এক মাসে রাজ্যে কী কারণে আচমকা সহিংস ঘটনা ঘটেছে, তা তদন্ত সাপেক্ষ। আমি সে সমস্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি যাঁরা সহিংসতায় তাঁদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে। আমি ইমফল, মোরে সহ গত তিনদিনে মণিপুরের বেশ কয়েকটি স্থান পরিদর্শন করেছি। চূড়াচাঁদপুর সহ রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকে বসে বিস্তর আলোচনা করে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছি।’
অত্যাবশ্যক পণ্যের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, মণিপুরে সংগঠিত সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে। অন্যান্য রাজ্য থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী আনার জন্য যুদ্ধকালীন তৎপরতায় অস্থায়ী রেলপথ তৈরি করা হয়েছে। অমিত শাহ আরও বলেন, কোটা থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন চাল আসছে এবং আগামী দু মাসের জন্য ১৫ মেট্রিক টন চাল রাজ্যে পৌঁছে দেওয়া হবে। এছাড়া অন্যান্য সামগ্রীর মধ্যে গ্যাস, পেট্রোল এবং শাকসবজি সহজলভ্য করার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে, জানান তিনি। চিকিৎসা পরিষেবা সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যে মণিপুরে আটটি চিকিৎসকের দল পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যে কেন্দ্র এবং মণিপুর সরকার রাজ্যের সাম্প্রতিক সংঘর্ষে যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন তাঁদের জন্য ১০ লক্ষ টাকার ক্ষতিপূরণ প্যাকেজও ঘোষণা করেছে। তাছাড়া যাঁরা আহত এবং সম্পত্তির ক্ষতি হয়েছেন তাঁদের জন্যও পৃথক এক প্যাকেজও ঘোষণা করা হয়েছে।