আগরতলা, ২১ জানুয়ারি (হি. স.) : ত্রিপুরায় স্বাস্থ্য পরিষেবায় বৈপ্লবিক যুগের সূচনা হয়েছে। এই প্রথম আগরতলা গি বি পি হাসপাতালে ওপেন হার্ট সার্জারী সফলতার সাথে করেছেন কার্ডিও থোরাসিক সার্জন ডা: কনক নারায়ন ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের দল। উদয়পুরের বাসিন্দা মাধবী দাস এখন সুস্থ রয়েছেন। খুব শীঘ্রই তিনি বাড়ি যেতে পারবেন বলে ডা: ভট্টাচার্য আশা প্রকাশ করেছেন। ত্রিপুরার পূর্ণ রাজ্যের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে এই সাফল্য স্বাভাবিকভাবে রাজ্যবাসীর জন্য বিরাট প্রাপ্তি, তা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই।
দেশ স্বাধীন হয়েছে ১৯৪৭ সালে এবং ত্রিপুরা পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা পেয়েছে ১৯৭২ সালে। স্বাধীনতার ৭৫ বছর পর ত্রিপুরায় স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইতিপূর্বে কঠিন রোগের চিকিত্সা ত্রিপুরায় সম্ভব ছিল না। আজ দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সার সহ নিউরো সমস্যা এবং এখন হৃদরোগের চিকিত্সাও ত্রিপুরায় সম্ভব হচ্ছে। বহি:রাজ্যে চিকিত্সার জন্য গিয়ে ত্রিপুরার বহু পরিবার সর্বস্বান্ত হয়েছে। এখন নিজ রাজ্যেই দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিত্সা সম্ভব হচ্ছে। এখনো অনেকটা পথ অতিক্রম করা বাকি থাকলেই স্বাস্থ্য নতুন সূর্যোদয় ত্রিপুরার জনগণকে ভীষণ স্বস্তি দিয়েছে, মানতেই হবে।

আজ সাংবাদিক সম্মেলনে ত্রিপুরায় প্রথম ওপেন হার্ট সার্জারির বর্ণনা দিলেন ডা: কনক নারায়ন ভট্টাচার্য। এদিন তিনি বলেন, ত্রিপুরার অনেক রোগী চিকিত্সার জন্য অন্য রাজ্যে যাচ্ছেন। আমাদের এখন লক্ষ্য ত্রিপুরার জনগণকে রাজ্যেই সমস্ত ধরনের চিকিত্সা পরিসেবা প্রদান। তিনি জানান, গত ২০ জানুয়ারি গি বি পি হাসপাতালে প্রথম ওপেন হার্ট সার্জারী হয়েছে। উদয়পুরের বাসিন্দা মাধবী দাস সার্জারির পর এখন সুস্থ আছেন। তাঁর জ্ঞান ফিরেছে এবং খুব শীঘ্রই তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাবেন।
ডা: ভট্টাচার্য বলেন, মাধবী দাসের বুকে যন্ত্রণা এবং শ্বাসকষ্টের সমস্যা ছিল। পরীক্ষা করে দেখা গেল তাঁর হৃদযন্ত্রে সমস্যা রয়েছে। ফলে, তার ফুসফুসেও সমস্যা হচ্ছে। মূলত, তাঁর হৃদযন্ত্র এবং ফুসফুস নষ্ট হচ্ছিল। এক্ষেত্রে ওপেন হার্ট সার্জারী ছাড়া রোগীকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব নয়। তাই, সমস্ত রকম পরীক্ষা করে তাঁর ওপেন হার্ট সার্জারির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তিনি জানান, ওই সার্জারির ক্ষেত্রে রোগীকে সম্পুর্ন অজ্ঞান করতে হয়। তারপর তার হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের সমস্ত ক্রিয়া যন্ত্রের সাহায্যে পরিচালিত করে সার্জারী করতে হয়। কারণ, কোনভাবেই শরীরে রক্ত সঞ্চালন বন্ধ করা যাবে না। সেই মোতাবেক ওই রোগীর বুক কেটে হৃদযন্ত্র এবং ফুসফুসের সমস্ত ক্রিয়া যন্ত্রের সাহায্যে পরিচালিত করে দুইটি অঙ্গের কার্যকলাপ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তারপর তার হৃদযন্ত্রের রোগ সারাই করা হয়েছে। ওই কাজ সফলতার সাথে সমাপ্ত হওয়ার পর যন্ত্রের উপর আসতে আসতে নির্ভরতা কমিয়ে হৃদযন্ত্র ও ফুসফুস স্বাভাবিক ও সতেজ করে দেওয়া হয়েছে।
তাঁর কথায়, ওই সার্জারির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান, নার্সদের সহযোগিতার খুব প্রয়োজন ছিল। সকলেই খুবই দক্ষতার সাথে সার্জারিতে সহায়তা করেছেন। তিনি জানান, ওই সার্জারিতে ৪ ঘন্টা সময় লেগেছে। গতকাল রাতেই তাঁর জ্ঞান ফিরেছে এবং আজ সকালে রোগী শয্যা থেকে উঠে বসেছেন ও খাবার খেয়েছেন। সাথে তিনি যোগ করেন, বহি:রাজ্যে গিয়ে ওই সার্জারির জন্য ন্যুনতম আড়াই থেকে তিন লক্ষ টাকা ব্যয় হতো এবং অন্যান্য খরচ আলাদা যা সঠিকভাবে অনুমান করা সম্ভব নয়। কিন্ত, ত্রিপুরায় সম্পুর্ন বিনামূল্যে ওই রোগীর সার্জারী হয়েছে। কারণ, তাঁর কাছে আয়ুষ্মান ভারত হেল্থ কার্ড ছিল।
এদিন ডা: ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, ত্রিপুরায় এখন পর্যন্ত ২৫টি এঞ্জিওগ্রাম, ৯টি স্থায়ী পেসমেকার ও ৩টি অস্থায়ী পেসমেকার বসানো, ৮০টি ডায়ালাইসিসের চ্যানেল এবং ডিজিটাল এঞ্জিওগ্রাম নতুন ক্যাথ ল্যাবে সফলতার সাথে সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়াও দুইটি বাইপাস সার্জারিও সফলভাবে করা সম্ভব হয়েছে। এদিকে, ৪৭টি শিশুর জন্মগত হৃদযন্ত্রের ত্রুটি শনাক্ত করা হয়েছে। তাদেরও সার্জারির বিষয়ে পরিকল্পনা চলছে।

