গুয়াহাটি, ৮ জানুয়ারি (হি.স.) : দুরন্ত করোনা ভাইরাস সংক্ৰমণের চেইন ভাঙতে অসম সরকার ফের নয়া স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিজিওর (এসওপি) জারি করেছে। সে অনুযায়ী কোভিডের নয়া ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন রোধে আজ শনিবার (৮ জানুয়ারি) থেকে বলবৎ হয়ে গেছে নয়া করোনা-বিধি।
প্ৰসঙ্গত, অসমে কোভিড-আক্রান্তের সংখ্যা বেকাবু হয়ে পড়েছে। শুক্রবার করোনা ভাইরাসে আক্ৰান্ত হয়েছেন নতুন করে ১,১৬৭ জন। গত বুধ ও বৃহস্পতিবার সংক্রমিতের সংখ্যা ছিল যথক্রমে ৫৯১ এবং ৮৪৪। আক্ৰান্তের হার বেড়ে হয়েছে ৩.৩২, গত দুদিন এই হার ছিল যথাক্রমে ১.৭২ এবং ২.৩৭ শতাংশ। গতকাল ৩৫,১২৭ জনের কোভিড টেস্ট হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে নতুন ১,১৬৭ জনকে কোভিড সংক্রমিত বলে শনাক্ত করা হয়েছে। করোনাকে জয় করে গতকাল রাত পর্যন্ত করে বাড়ি ফিরেছেন ২৫৩ জন। এখন পর্যন্তখবর, সক্রিয় সংক্রমিতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩,৬০১। তাছাড়া শুক্রবার করোনায় মৃত্যু হয়েছে আরও দুজনের।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার বিকেলে জনতা ভবনে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে কোভিডের নয়া ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন রোধে নয়া গত মঙ্গলবার থেকে অসমে দ্রুতগতিতে কোভিড সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ ব্যক্ত করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বৃহস্পতিবার একদিনে আট শতাধিক ৮৪৪ জন কোভিড সংক্রমিতের তথ্য এসেছে। এর মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে গুয়াহাটি মহানগর। তাই প্রথমত নৈশ কারফিউয়ের সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য দফতর। সে অনুযায়ী, আগাজ রাত ১০টা থেকে আগামীকাল ভোর ছয়টা পর্যন্ত বলবৎ হবে নৈশ কারফিউ। এভাবে প্রতিদিন রাত দশটা থেকে ভোর ছয়টা পর্যন্ত চলবে কারফিউ। তাছাড়া সমস্ত বাণিজ্যিক প্ৰতিষ্ঠান যেমন মুদি দোকান, ফলমূল, দুধের দোকান, হাট-বাজার ইত্যাদি রাত নয়টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে। রেস্টুরেন্ট, ধাবা ইত্যাদি ৫০ শতাংশ গ্ৰাহকের উপস্থিতিতে রাত নয়টা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে। তবে রেস্টুরেন্ট, ধাবা ইত্যাদি থেকে অনলাইন অৰ্ডারের খাদ্যসামগ্রীর সরবরাহ চলবে রাত ১০টা পর্যন্ত।
দ্বিতীয়ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মাস্ক পরিধান বাধ্যতামূলক, সর্বাবস্থায় মুখে মাস্ক পরতে হবে সবাইকে। না-হলে এক হাজার টাকা করে জরিমানা আদায় করবে পুলিশ। তাছাড়া প্রকাশ্য স্থানে থু-থু ফেললেও পুলিশ এক হাজার টাকা জরিমানা আদায় করবে, সতর্ক করেছেন হিমন্তবিশ্ব শর্মা৷
তিনি জানান, এছাড়া আগামীকাল থেকে রাজ্যের সব স্কুল পঞ্চম শ্ৰেণির ছাত্রছাত্রীদের জন্য আগামী ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। তবে গুয়াহাটিতে বন্ধ থাকবে অষ্টম শ্ৰেণি পর্যন্ত। তাছাড়া, নবম, দশম এবং একাদশ শ্ৰেণির ক্লাশ চলবে একদিন পর পর বিকল্প পদ্ধতিতে। এছাড়া স্নাতক-স্নাতকোত্তরের পাশাপাশি ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিক্যালের ক্লাশ চলবে সম্পূ্র্ণ ভ্যাকসিন্যাটেড শিক্ষাৰ্থীর নিয়ে।
তিনি জানান, প্ৰকাশ্য স্থান বা সর্বজনীন প্রতিষ্ঠানে ভ্যাকসিন নেননি এমন কেউ ঢুকতে পারবেন না। কেবল হাসপাতালগুলিতে ভ্যাকসিন-গ্রহীতারা প্রবেশ করতে পারবেন। এছাড়া হোটেল, রেস্টুরেন্ট এবং সরকারি কাৰ্যালয়ে যেতে গেলে লাগবে কোভিডের দ্বিতীয় ডোজের প্রমাণপত্র। যে সকল সরকারি কর্মচারী ভ্যাকসিন নেননি, আগামী ১৫ জানুয়ারির পর তাঁরা কাৰ্যালয়ে যেতে পারবেন না। কেবল তা-ই নয়, প্রকাশ্য প্ৰতিষ্ঠান যেমন হোটেল, রেস্টুরেন্ট, সরকারি কার্যালয়ে ভ্যাকসিন-ছুট কেউ প্রবেশ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কর্তৃপক্ষের দাবি মতো ২৫ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে।
এভাবে প্রকাশ্য স্থানে আয়োজিত সভা-সমিতি, সামাজিক / সর্বজনীন অনুষ্ঠানে কোভিড ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ গ্রহীতা সর্বাধিক ৫০ জন অংশগ্রহণ করতে পারবেন। অবশ্য সংশ্লিষ্ট জেলাশাসকের অনুমতিক্রমে সভা-সমিতি ইত্যাদি যে কোনও অনুষ্ঠানে কোভিড প্রতিষেধকের কমপক্ষে প্রথম ডোজ-গ্রহীতা সৰ্বাধিক ২০০ জন অংশগ্ৰহণ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে সভা-সমিতি বা কোনও অনুষ্ঠান করতে হলে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের (থানা কর্তৃপক্ষ) কাছ থেকেও অগ্রিম অনুমতি নিতে হবে। তছাড়া প্ৰেক্ষাগৃহ বা সর্বজনীন সভাগৃহ ইদ্যাদি বন্ধ কক্ষে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে মোট আসনের ৫০ শতাংশ মানুষের অংশগ্ৰহণে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে কোভিড ভ্যাকসিনের দুটি ডোজ যাঁরা নিয়েছেন তাঁরা এ ধরনের অনুষ্ঠানে অংশগ্ৰহণ করতে পারবেন। বিবাহ ইত্যাদি ঘরুয়া মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারবেন সৰ্বাধিক ৫০ জন। এক্ষেত্রেও কোভিড ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নিতে হবে অংশগ্রহণকারীদের। এদিকে মৃত ব্যক্তির অন্তিম সৎকার ও শ্ৰাদ্ধানুষ্ঠানে কোভিড প্রতিষেধকের প্রথম ডোজ গ্রহণকারী সৰ্বাধিক ৫০ জনকে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে নয়া এসওপিতে।
এভাবে আজ থেকে বিকেল থেকে কোনও চুলাই ভাটি (চুলাই মদের ঠেক) খোলা যাবে না। এছাড়া আন্তঃরাজ্য যাতায়াত যথারীতি অব্যাহত থাকবে। নৈশ বাস চলবে নিয়মিত। তবে যাঁরা কোভিডের ডাবল ডোজ ভ্যাকসিন নিয়েছেন তাঁরাই বাসে চড়তে পারবেন। যাত্রাপথে রাতে কোনও হোটেলে বসে খাবার খাওয়া যাবে না।
আসন্ন ভোগালি বিহু তথা পৌষ সংক্রান্তি পালনের ক্ষেত্রেও নয়া বিধি শুনিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। জানান, সংক্রান্তির রাতে দশটার মধ্যে যার যার ঘরে যেতে চলে যেতে হবে। দশটার আগে সর্বজনীন বিহুর আনন্দ উপভোগ করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, রাতে ভেলাঘরে থাকা উচিত নয়। পরেরদিন সকাল ছয়টায় পরম্পরা পালন করে ভেলাঘর জ্বালানোর পরামর্শ দিয়ে ড. শর্মা বলেন, উরুখা (সংক্রান্তি)-র দিন মাছ বাজারে যথেষ্ট ভিড় হয়৷ তাই সে সম্পর্কে পুলিশ লাইন-আপ করে দেবে।
কোভিডের চিকিৎসা সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রী জানান, এখন থেকে কোভিডের চিকিৎসা বিনামূল্যে হবে না। কেবল দারিদ্ৰ্যসীমার নিম্নবর্তী মানুষজনের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা হবে। সরকারি হাসপাতালে সরকারের নির্ধারিত হিসাবে খরচ দেবেন রোগীরা৷ তবে কোভিড কেয়ার সেন্টারে ফিজ দিতে হবে না।
তাছাড়া, রাজ্যে যে গতিতে করোনা-আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, তার প্রতি লক্ষ্য রেখে যে অঞ্চলে গত সাতদিনে ১০ জন কোভিডে আক্ৰান্ত হয়েছেন, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলকে কন্টেইনমেন্ট জোন বলে ঘোষণা করবে এলাকার প্রশাসন, জানান মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা।

