।। শংকর দাস ।।
প্ৰেম! দুই অক্ষরের শব্দ। প্রেমের ব্যাখ্যা নানাভাবে নানাজনে করেছেন। প্ৰেম স্বৰ্গীয়, প্ৰেম অন্ধ, প্ৰেম জাতিকুল মানতে চায় না ইত্যাদি ইত্যাদি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অমর প্ৰেমের বহু কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। লায়লা মজনু, আনারকলি, জংকি পানেইর প্ৰেম কাহিনি ইত্যাদি যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে সেখানে নেই কঠোরতা, নেই কপটতা, নেই ভণ্ডামি অথবা প্ৰতারণা। সেই সব কাহিনিতে মিথ্যা বা ভুয়ো প্ৰতিশ্ৰুতিও নেই, প্ৰলোভনও নেই। সেখানে প্রেমকে যথাৰ্থ দৃষ্টিতেই উপস্থাপন করা হয়েছে। হয়তো সে-কারণেই প্ৰেম সম্পর্কে এ-ধরনের এক বদ্ধমূল ধারণা গড়ে উঠেছে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রেমের সংজ্ঞারও পরিবর্তন হচ্ছে। আজকাল প্ৰেমের অন্যতম আকৰ্ষণ হল ধন-সম্পত্তি, পদ ও প্ৰতিষ্ঠা। ফলে প্ৰেম আজ আর স্বৰ্গীয় পর্যায়ে নেই। লিপ্সা অভিপ্সা এবং উপভোগের পর্যায়ে পৰ্যবসিত হয়েছে।
আজকাল এক নতুন ধরনের প্ৰেমের ঘটনা ঘটতে দেখা যাচ্ছে, আর তা হল টেলিফোনিক প্ৰেম। টেলিফোনে বার্তালাপ করতে গিয়ে প্ৰেম বাঁধনে বাঁধা পড়ে। ফেসবুকে প্ৰফাইল দেখেও প্ৰেমে হাবুডুবু খেতে দেখা যাচ্ছে। ভুয়ো নামে ফোন করে, ভুয়ো ফেসবুক প্ৰফাইল তৈরি করে সুন্দর ফোটো আপলোড করে রাজমিস্ত্ৰির জোগালির মতো ছেলেদেরকেও নিজেদের ইঞ্জিনিয়ার বা অন্য কোনও পরিচয় দিয়ে মেয়েদের প্রেমের ফাঁদে ফেলার ঘটনা আজকাল আকছার ঘটছে। আজকাল নিউ মিডিয়া অৰ্থাৎ ইন্টারনেটের ব্যবহারই এর মুখ্য কারক বলে গণ্য করা যেতে পারে। তাছাড়া কামনা-বাসনা পূরণ ও ভোগসৰ্বস্ব এক পৃথক জীবনযাপনের পাশাপাশি নিজেদের সাহসী ও আধুনিক বিচারধারার প্ৰতিভূ হিসেবে তুলে ধরতে তৎপর চলচ্চিত্রের একেকজন নায়িকাকে কোনেও সিনেমায় উপস্থাপন করে কিছু সংখ্যক পরিচালক ও প্ৰযোজকও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে দাবি করছেন। তাঁদের এ ধরনের মানসিকতা যে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, সেদিকে কারও নজরই নেই।
চলচ্চিত্র জগতের অভিনেত্ৰীরা যতই স্বল্পবসনা হতে পারেন ততই সাহসী বলে প্রচার করার জন্য কিছু স্তাবক তৈরি করেও মাৰ্কেটিং বা বাজার গড়ে তুলতে দেখা যাচ্ছে, তা সে সমাজের জন্য যতই ক্ষতিকারক হোক না-কেন। আগেকার দিনের ভালোবাসা আজকাল অচল হয়ে পড়েছে। তার পরিবর্তে নতুন কিছু একটা করার মানসিকতা ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু নতুন কিছু করার জন্য যে যোগ্যতার দরকার, তা না থাকার ফলে এক বিকৃত মানসিকতা গড়ে উঠেছে।
উচ্চ রুচিবোধসম্পন্ন মানসিকতাহীন নতুনত্ব সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। বিগত চারটে দশকে বিজ্ঞান এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির নাম করে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা ভুলে গিয়ে আমরা যে-সব কাজ করে চলছি তার কুফল আমাদের নিজেদেরই ভুগতে হচ্ছে। শুধু ভোগ-বিলাস এবং অৰ্থসৰ্বস্ব জীবনযাপনের ফলে পরিবারগুলিতে প্রয়োজনীয় উচ্চ রুচিবোধসম্পন্ন মানসিকতা অক্ষুণ্ণ রাখা যাচ্ছে না। ফলে রুচিবোধসম্পন্ন ব্যক্তি অথবা নৈতিক দিক থেকে উন্নত এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল ব্যক্তি কীভাবে গড়ে উঠবে?
আধুনিক বিজ্ঞানের নতুন উদ্ভাবন অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন বৰ্তমান যুগের যুব প্ৰজন্মের সাহস, উদ্যম, সমাজের মঙ্গলের জন্য সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব প্রভৃতির বিলুপ্তি ঘটিয়েছে। ব্যক্তিগত সুখ-ভোগই প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে পড়ায় স্বৰ্গীয় প্ৰেম, অমর প্ৰেম ইত্যাদি টেলিফোনিক প্ৰেমে পর্যবসিত হয়েছে। তাছাড়াও এই প্ৰেম যখন একতরফা হয়ে পড়ছে, এখানে যখন ধর্মীয় পক্ষপাতিত্বেরও প্ৰশ্ন উঠছে, তখন এই প্ৰেম হয়ে দাঁড়ায় ষড়যন্ত্ৰ বা চক্ৰান্ত। তখন থেকেই ‘লাভ জিহাদ’ শব্দ দুটি ঘন ঘন উচ্চারিত হতে শুরু করল। যখন লাভ জিহাদের ষড়যন্ত্ৰ ফাঁস হল তখন এখানে নারীর স্বাধীনতা, নারীর মৌলিক অধিকার, নারীর প্ৰতি বৈষম্য, এমন-কি নারী নিৰ্যাতনের প্ৰশ্নগুলিও উত্থাপিত হতে লাগল। বাবার বিরুদ্ধে মেয়েকে ফেসবুকে অভিযোগ করতেও দেখা গেল। সঙ্গে সঙ্গে এখনকার প্ৰচার মাধ্যমও একই সঙ্গে উকিল ও বিচারপতির ভূমিকায় অবতীৰ্ণ হল। স্বৰ্গীয় প্ৰেমকে আদালতের কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়াতে হল। এখান থেকেই লাভ জিহাদ শব্দটির উদ্ভব।
আজকাল লাভ জিহাদের বিষয়টি সারা ভারতেই আলোচনার বিষয় হয়ে পড়েছে। উত্তরপ্ৰদেশ সরকার যখন অর্ডিন্যান্স জারি করে ১০ বছর পৰ্যন্ত কারাবাসের ব্যবস্থার কথা ঘোষণা করেছে এবং অসম সরকারের তরফ থেকেও লাভ জিহাদের বিরুদ্ধে আইন প্ৰণয়ন করা হবে বলে ঘোষণা করা হল, তখন থেকে এই বিষয়টি নিয়ে আরও বেশি করে আলোচনা শুরু হল।
লাভ জিহাদের সাধারণ অৰ্থ, মুসলমান পুরুষ কর্তৃক অমুসলমান মেয়েদের ধৰ্মান্তরিত করার লক্ষ্য নিয়ে করা ছলনাময় প্ৰেম। ভারতে জাতীয় স্তরে এই বিষয়টি নিয়ে ২০০৯ সাল থেকেই আলোচনা চলছে। অভিযোগ করা হয়েছে যে প্ৰেমের ফাঁদে ফেলে হিন্দু এবং খ্রিষ্টান মেয়েদের ধৰ্ম পরিবৰ্তন করে ইসলাম ধৰ্মে দীক্ষিত করার এক গভীর ষড়যন্ত্ৰ রচনা করা হয়েছে। কেরলের পুলিশপ্রধান (ডিজিপি) জ্যাকব পুন্নৌজ এ-বিষয়ে সরেজমিন তদন্ত করে এক রিপোর্ট দাখিল করেছেন। ওই রিপোর্টে তিনি বলেছেন, এ-রকম কোনেও ঘটনার খবর নাকি তিনি পাননি। এই রিপোর্টটি পেশ করা হয়েছিল ২০০৯ সালের নভেম্বর মাসে। কিন্তু ডিসেম্বর মাসে বিচারপতি কেটি শংকরণ বেশ কয়েকটি অভিযোগের ভিত্তিতে পুন্নৌজের রিপোর্ট খারিজ করে ঘোষণা করেন, বলপূৰ্বক ধৰ্ম পরিবৰ্তনের খবর পাওয়া গেছে। কেরল উচ্চ আদালতের এক রায়ে লাভ জিহাদের ঘটনা সত্য বলে প্ৰমাণিত হয়েছে।
লাভ জিহাদে অভিযুক্ত দুই আসামির বিরুদ্ধে এক মামলার শুনানির সময় আদালত জানিয়েছিল, বিগত চার বছরে এ-ধরনের তিন-চার হাজার লাভ জিহাদের অভিযোগ পাওয়া গেছে। আসলে কেরলের কাচরগোড় জেলা সংলগ্ন মংগোল জেলা থেকে যখন হিন্দু মেয়েরা নিখোঁজ হতে লাগল তখনই সেখানকার লোকজনের মধ্যে হুলস্থুল শুরু হল। ২০০৯ সালে পুলিশ অফিসারের কোয়ার্টার থেকেও একটি মেয়ে নিখোঁজ হয়। তদন্তকারী অফিসাররা জানতে পারলেন, লাভ জিহাদের ফাঁদে ফেলে মেয়েটিকে মুসলিম ধৰ্মে দীক্ষিত করা হয়েছে। ওই সময় কর্ণাটক উচ্চ আদালতে নিখোঁজ মেয়েদের আত্মীয়স্বজন একটি ‘হেবিয়াস কৰ্পাস পিটিশন’ দাখিল করে। ওই পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে কর্ণাটক উচ্চ আদালত কেরল সরকারকে লাভ জিহাদ সংক্রান্ত সমস্ত ঘটনার তথ্য আদালতে জমা দেওয়ার আদেশ জারি করে। কেরলেও এমন একটি আবেদন দাখিল করার জন্য কেরল উচ্চ আদালতও একই আদেশ জারি করে। এদিকে কেরলের ডিজিপি জ্যাকব পুন্নৌজ তদন্ত করে কোনও ষড়যন্ত্ৰের নিশ্চিত প্ৰমাণ পাননি বলে প্রথমে বললেও পরে তিনি স্বীকার করেছেন, কিছুসংখ্যক যুবক ধৰ্মান্তরণের লক্ষ্য নিয়ে বিবাহকাৰ্য সম্পন্ন করে চলেছে।
ইতিমধ্যে যে ডিজিপি লাভ জিহাদের ষড়যন্ত্ৰের কোনও প্রমাণ পাননি বলে রিপোর্ট দাখিল করেছিলেন সেই জ্যাকব পুন্নৌজেরই আত্মীয় একটি মেয়ে লাভ জিহাদের শিকার হয়। তখন থেকেই সংবাদ মাধ্যমে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে দেখা যায়। লাভ জিহাদের বিষয়ে ‘জন্মভূমি’, ‘কেরল কৌমুদি’, ‘দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্ৰেস’ ইত্যাদি পত্রিকায় বহু ঘটনার খবর প্ৰকাশ করেছিল। ২০০৯, ২০১০, ২০১১ এবং ২০১৪ সালে লাভ জিহাদ সম্বন্ধে বেশ কয়েকটি হিন্দু, শিখ ও খ্ৰিষ্টান সংগঠন মুসলমান সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। মুসলিম সংগঠনগুলি এই সব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে। কিন্তু নায়ার সাৰ্ভিস সোসাইটি, শ্ৰীনারায়ণ ধৰ্ম পরিপালন, হিন্দু একতা, কেরল ক্যাথলিক বিশপস্ কাউন্সিল ইত্যাদি সংগঠন এই বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করেছে।
ইদানীংকালে ইলেকট্ৰনিক প্ৰচার মাধ্যমে লাভ জিহাদ প্রসঙ্গে আলোচনার একটি প্রধান বিষয় হয়ে পড়েছে। কেউ একজন বলেছিল, ভিন্ন ধৰ্মাবলম্বীর মধ্যে যৌন আকৰ্ষণ অনেক বেশি বলে নাকি কোনেও এক গবেষণায় জানা গেছে। হতে পারে, তা বলে ধৰ্ম পরিবৰ্তনের দরকার কেন? টিভি অথবা সোশাল মিডিয়ায় সাক্ষাৎকারে যে-সব মেয়ে সরাসরি বিবৃতি দিয়েছে তাতে ভারোত্তলনে আন্তর্জাতিক স্তরে প্ৰথম স্থানাধিকারী হিন্দু মেয়ের প্ৰেম বিবাহের পর বলপূৰ্বক তাঁকে ধৰ্মান্তরণ, গোমাংস ভক্ষণ অথবা উৰ্দু-আরবি ইত্যাদি ভাষা শিখতে বাধ্য করার খবরও ইতিমধ্যে প্রকাশ হয়েছে। তা-হলে আমরা কি এ-কথা ধরে নেব না যে প্ৰেম অন্ধ বা স্বৰ্গীয় নয়।
দামি বাইক, দামি পারফিউম, দামি পোশাক, দামি মোবাইল, দামি হোটেলে ডিনারের খরচ একেকজন অত্যন্ত সাধারণ পরিবারের মুসলমান যুবকের জন্য কারা সরবরাহ করে সে সম্পর্কে আমাদের অবশ্যই খবর রাখা উচত। তথাকথিত প্ৰগতিশীল, ধৰ্মনিরপেক্ষ কিছু মানুষ অযৌক্তিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় যে প্ৰেম বিবাহকে বাধা দেওয়া মানে নারীর স্বাধীনতা হরণ করা। তা-হলে প্ৰলোভন, ছলনা, ভীতি প্ৰদৰ্শন, ভুয়ো পরিচয় ইত্যাদির মাধ্যমে প্ৰেম-বিবাহ করে বলপূৰ্বক ধৰ্ম পরিবৰ্তন করলে কি নারীর স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকে?
বাস্তবে লাভ জিহাদ নামে কোনেও সংস্থা নেই। কিন্তু কেরলে স্মাৰ্ট ফ্ৰেন্ডস্ নামে একটি সংস্থা, পপুলার ফ্ৰন্ট অব ইন্ডিয়া (পিএফআই, যে সংস্থার পতাকা নিম্ন অসমের ধুবড়ি জেলার প্রত্যন্ত গ্রামের মসজিদেও উড়ানো হয়েছে) ইত্যাদি সংগঠনগুলি প্রচলিত লাভ জিহাদের নেপথ্যে রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এখানে শুধু একটি উদাহরণই যথেষ্ট — ২০০৬ সালে ২৫৩০ জন এবং ২০০৭ সালে ২১৬৭ জন মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার খবর ‘ন্যাশনাল ইউনিভাৰ্সিটি অব অ্যাডভান্স লিগাল স্টাডিজ’ এবং কেরল পুলিশের ক্ৰাইম ব্যুরো প্রকাশ করে। হয়তো প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি হবে, কারণ অনেক ঘটনার রিপোর্টই হয়নি। কে জানে, নিখোঁজ ওই সব মেয়েদের আইএসআই-এর মতো কুখ্যাত সংস্থায় ভরতি করে রাষ্ট্ৰদ্রোহী কাজে লিপ্ত করা হয়েছে কিনা? নাকি মানবদেহের অঙ্গ ব্যবসায় যুক্ত করা হয়েছে, বাকি মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে সন্তান জন্ম দেওয়ার যন্ত্ৰে পরিণত করা হয়েছে কিনা?
২০১০ সালে কর্ণাটক সরকার বলেছিল, যদিও বহু মেয়েকে ধৰ্মান্তরিত করা হয়েছে, তবে সেগুলিকে ধর্মান্তরণের সংগঠিত প্ৰচেষ্টা বলা যায় না। ২০১৪ সালে উত্তরপ্ৰদেশ সরকার তিন মাসের মধ্যে এ-রকম ছয়টি ধৰ্মান্তরণজনিত অভিযোগের মধ্যে পাঁচটার নাকি কোনেও প্ৰমাণই খুঁজে পায়নি। কাজেই অসভ্য পুরুষ কর্তৃক বিক্ষিপ্তভাবে এখানে-সেখানে সংগঠি ঘটনাবলিকে ষড়যন্ত্ৰ বলা যেতে পারে না।
২০১৭ সালে কেরল উচ্চ আদালত লাভ জিহাদের ষড়যন্ত্ৰ করে জনৈক মুসলমান ব্যক্তি কর্তৃক হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করার ঘটনাকে অবৈধ বলে ঘোষণা করায় সেই মুসলিম পরিবারটি সর্বোচ্চ আদালতে আবেদন করে। এর পর সর্বোচ্চ আদালত লাভ জিহাদ সংক্রান্ত সমসাময়িক এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ ঘটনাগুলির তদন্ত করার জন্য জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ-কে দায়িত্ব দেয়। সেদিন একটি টিভি চ্যানেলের স্টুডিওয় আমন্ত্ৰিত অতিথিকে লাভ জিহাদ সম্পর্কে এক প্রসঙ্গ তুলতেই অ্যাঙ্করকে ধমক দিয়ে বললেন, অসমের কোথায় লাভ জিহাদ রয়েছে? আপনারা সম্প্ৰীতি বিনষ্ট করছেন।
কমলা হ্যারিসের মা ভারতীয়। যেহেতু কমলা আমেরিকার উপরাষ্ট্ৰপতি, কাজেই আমাদের বুক গৰ্বে ফুলে ওঠে। আর আমাদেরই বোনেরা যখন লাভ জিহাদের শিকার হয় তখন আমাদের মধ্যে কোনও উদ্বেগই দেখা যায় না। এ-ই হল আমাদের স্বভাব।
হিন্দুজাগরণ মঞ্চের সচেতনতা অভিযানের পরও বিগত দেড় বছরে অসমে যে লাভ জিহাদের তথ্য পাওয়া গেছে তা ভাবার বিষয়। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, অসমের নলবাড়িতে ২১, মরিগাঁওয়ে ১৮, বরপেটায় ১৯, যোরহাটে চার, শিবসাগরে দুই, একটি করে নগাঁও এবং গোলাঘাটে। ভুয়ো পরিচয় দিয়ে হিন্দু যুবতীদের অপহরণ করে, মৃতের ভান করে তাদের নিয়ে পালিয়ে যাওয়া এবং রহস্যজনক মৃত্যুর খবর সংবাদপত্ৰে সবিস্তারে প্ৰকাশ হয়েছে। মেয়েগুলি দাস, মেধি, কলিতা, মিশ্ৰ, রাজবংশী, দেবী, ডেকা, শইকিয়া, বরদলৈ, বোড়ো, তালুকদার ইত্যাদি উপাধির। অপহরণকারী অথবা ভুয়ো পরিচয় দিয়ে সম্পর্ক স্থাপনকারীরা হল আলি, উদ্দিন, হক, হুসেন, খান, বাদশাহ, ইসলাম।
মুসলমান যুবকের স্বৰ্গীয় প্ৰেম হিন্দু মেয়েদের সঙ্গে হয় নাকি? তার চেয়েও বড় কথা, স্বৰ্গীয় প্ৰেমের জন্য এখানে ভুয়ো পরিচয়ের কেন দরকার হয়? এখানে কি নারীর স্বাধীনতা, অভিব্যক্তি অক্ষুণ্ণ থাকে? লাভ জিহাদের বিরুদ্ধে আইন করে প্ৰেমকে ধৰ্মীয় রূপ দেওয়া হয়েছে বলে সাম্প্রতিককালে বিতর্ক চলছে। আসলে এই আইন হল বলপূৰ্বক ধৰ্ম পরিবৰ্তনের বিরুদ্ধে এবং পরোক্ষভাবে নারীর স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখার জন্য।
এ প্রসঙ্গে শতাব্দি-পুরনো ইতিহাসের ঘটনার অবতারণা যেতে পারে। ১৪৯৮ সালে ভাস্কো-ডি গামা কলকাতায় এসেছিলেন। তিনি এসে দেখলেন দুই লক্ষ খ্রিষ্টানকে কেউ গুরুত্ব দেয় না। সপ্তদশ শতাব্দিতে ব্রিটিশরা ভারতে এল। খ্রিষ্টান ধৰ্ম প্ৰচার অৰ্থাৎ ধৰ্মান্তরণের সুযোগ লাভ করে ১৮৩৬ সালে ভারতে ব্রিটিশর সাম্ৰাজ্য প্ৰতিষ্ঠা হয়। এর পর খ্রিষ্টান ধৰ্মে ধৰ্মান্তরণের বিরুদ্ধে প্ৰথমবারের জন্য বোম্বাইয়ের (অধুনা মুম্বাই) পার্শিরা আদালতে আবেদন জানান। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার ওই আবেদনে কোনেও গুরুত্বই দেয়নি। অবশেষে ১৯৪০ এবং ১৯৫০-এর দশকে বেশ কয়েকজন স্থানীয় রাজা ধৰ্ম পরিবৰ্তনের বিরুদ্ধে আইন প্ৰণয়ন করেন। স্বাধীন ভারতে বহু চেষ্টা করেও আইন প্ৰণয়ন করা যায়নি।
১৯৫৪ সালে একটি আইন প্রণয়নের প্ৰস্তাব দেওয়া হয়েছিল। যদি সেই আইন গৃহীত হতো, তা-হলে মিশনারি কর্তৃক ধৰ্ম পরিবৰ্তনের জন্য পঞ্জিকরণ করতে হতো। কিন্তু আইনটি গৃহীত হয়নি। ১৯৬০ সালে হিন্দু ধৰ্মের পশ্চাদপদ তথা তফশিলি জাতি, ইহুদি, পার্শি, ইসলামধর্মীদের ধৰ্ম পরিবৰ্তন করার বিরুদ্ধে একটি অর্ডিন্যান্স জারি করা হয়। বলপূৰ্বক ধৰ্মান্তরণের বিরুদ্ধে প্ৰথম আইন প্ৰণয়ন করেছিল ওড়িশা (১৯৬৭ সালে) এবং মধ্যপ্ৰদেশ (১৯৬৮ সালে)। তার পর ধৰ্মীয় স্বাধীনতার জন্য অরুণাচল প্রদেশে ১৯৭৮ সালে আইন প্ৰণয়ন করা হয়। ২০০২ সালে বলপূৰ্বক ধৰ্মান্তরণের বিরুদ্ধে তামিলনাডুতে যদিও একটি আইন প্ৰণয়ন করা হয়েছিল, কিন্তু ২০০৪ সালে সেই আইন খারিজ করা হয়। ২০০৩ সালে গুজরাতে, ২০০৬ সালে হিমাচলপ্ৰদেশে এবং ২০০৮ সালে উত্তরাখণ্ডে এই আইন প্ৰণয়ন করা হয় এবং এখনও তা বলবৎ রয়েছে।
১৯৭৭ সালে মধ্যপ্ৰদেশ সরকারের বিরুদ্ধে এই আইনকে চ্যালেঞ্জ করে রেভারেন্ড স্ট্যালিনস্লাস নামের এক পাদ্ৰি সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন। সুপ্ৰিমকোৰ্ট ওই মামলার রায়ে বলেছিল, যেহেতু ধৰ্ম পরিবৰ্তন মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে না, কাজেই রাজ্য সরকার নিজস্বভাবে আইন প্ৰণয়ন করতে পারে। ইতিমধ্যে ওড়িশা, গুজরাত, মধ্যপ্ৰদেশ, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড এবং অরুণাচল সহ মোট নয়টি রাজ্যে বলপূৰ্বক ধৰ্মান্তরণ-বিরোধী আইন বলবৎ হয়েছে। এটি রাজ্যের অধিকার, সুতরাং উত্তরপ্ৰদেশ বা অসম সরকারকেও আইন প্ৰণয়ন করার অধিকার ভারতের সংবিধান দিয়েছে। কাজেই তথাকথিত সেকুলার প্ৰগতিশীলদের যুক্তিতেই নারীর স্বাধীনতা সংরক্ষণের জন্য এ ধরনের আইন প্ৰণয়ন করা দরকার বলে দাবি করা উচিত। বলপূৰ্বক যে-কোনও বিষয়, তা-সে ধৰ্মান্তরণই হোক কিংবা বিবাহ, সভ্য প্ৰগতিশীল সমাজ মেনে নিতে পারে না।
তাছাড়াও যদি এই কাজ ষড়যন্ত্ৰমূলক বা চক্ৰান্ত বলে রাষ্ট্ৰদ্ৰোহের উদ্দেশ্যে করা হয়, তা-হলে গণতান্ত্ৰিক দেশ হিসেবে আইনের দ্বারাই তা রোধ করতে হবে। তা না-হলে ক্রিয়ার প্ৰতিক্ৰিয়া হলে কোনও আইন বা আদালতই তার সমাধান করতে পারবে না। সেজন্যই প্ৰেম বন্ধনের জন্য সরকারি আইনের অতি প্ৰয়োজন। সুতরাং অতি শীঘ্ৰ আইন প্ৰণয়ন করে তা কার্যকর করা-ই হল সময়ের আহ্বান।

