নিলামবাজারে রাজ্যের দুই যুবতীকে গণধর্ষণ, জড়িত ছয়জনই গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিনিধি, চুরাইবাড়ি, ১৫ নভেম্বর৷৷ প্রায় ৪২ ঘণ্টার মধ্যে নিলামবাজারে লোমহর্ষক দলবদ্ধ ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত সব ধর্ষককে জালে তুলতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ৷ ধৃতদের আহাদ উদ্দিন, সামসুল উদ্দিন, আবু বক্কর, আমির আলি, আনোয়ার হুসেন এবং সুমন আলি বলে পরিচয় পাওয়া গেছে৷ ঘটনার দুদিনের মধ্যেই সব কয়কটি ধর্ষককে গ্রেফতার করায় নিলামবাজার থানা তথা করিমগঞ্জের পুলিশ বাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন মহল৷ তবে তাদের যাতে ফাস্টট্র্যাক আদালতে বিচার সম্পন্ন হয়, তার জন্যও দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে৷
এদিকে করিমগঞ্জের পুলিশ সুপার মায়াঙ্ক কুমার জানিয়েছেন প্রাথমিক তদন্তে গ্রেফতার ছয় অপরাধীর মধ্যে পাঁচ জনের ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার সূত্র পাওয়া গেছে৷ নাম উল্লেখ না করে পুলিশ সুপার বলেন, গ্রেফতার এক অপরাধী ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কোনও ক্লু এখনও পাওয়া যায়নি৷ তবে তদন্ত প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে৷ এই কাণ্ড নিয়ে সমাজে যাতে কোনও ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার সৃষ্টি না হয়, সে ব্যাপারে পুলিশ প্রশাসন কড়া নজর রেখেছে৷ জেলায় শান্তি-সম্প্রীতি বজায় রাখতে জেলাবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মায়াঙ্ক কুমার৷ অপরাধীদের আইনানুযায়ী উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে বলেও আশ্বস্ত করেছেন পুলিশ সুপার৷ সেই সঙ্গে ঘটনার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অপরাধীদের গ্রেফতার করতে পারায় পুলিশ প্রশাসন কৃতিত্বের দাবি রাখে বলেও উল্লেখ করেন পুলিশ সুপার মায়াঙ্ক৷


শনিবার রাতে ঘটনাস্থল থেকে গ্রেফতার দলবদ্ধ ধর্ষণ কাণ্ডের মূল অভিযুক্ত আব্দুল আহাদ প্রদত্ত বয়ানের সূত্র ধরেই নিলামবাজার পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সব কয়টি অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে সমর্থ হয়েছে৷ সিআই আনোয়ার হুসেন চৌধুরী জানান, রবিবার সকাল আনুমানিক পৌনে পাঁচটা নাগাদ নিলামবাজার থানা এলাকাধীন নলুয়া গ্রাম থেকে সমসুল হক, সাড়ে পাঁচটা নাগাদ একই থানা এলাকাধীন থামুয়া গ্রাম থেকে আবুবক্কর এবং পার্শবর্তী রাজ্য ত্রিপুরার চোরাইবাড়ি এলাকার বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় পুলিশের সহযোগে অভিযান চালিয়ে আমির আলি, আনোয়ার হুসেন ও সুমন আলিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ৷ ধর্ষণ কাণ্ডে ব্যবহৃত কেএ ০৩ এএ ৬৯৪৫ নম্বরের একটি ইন্ডিকা কার আমির আলি, আনোয়ার হুসেনদের হেফাজত থেকে পুলিশ বাজেয়াপ্ত করেছে৷

দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার উত্তর ত্রিপুরার বাসিন্দা দুই যুবতী তাঁদের সঙ্গে সংগঠিত দুষ্কর্মের বৃত্তান্ত জানিয়ে গতকাল প্রথমে বাজারিছড়া থানায় একটি এফআইআর দায়ের করেছিলেন৷ পরবর্তীতে ওই দিনই তদন্তের সুবিধার্থে এফআইআরটি নিলামবাজার থানায় স্থানান্তরিত করা হয়৷ নিলামবাজার থানায় ২৯০/২০২০ নম্বরে ভারতীয় ফৌজদারি দণ্ডবিধির ১২০(বি)/৩৭৬(ডি)/৩৭৯ ধারায় মামবা নথিভুক্ত করে পুলিশ দুরন্ত গতিতে তদন্তে নামে৷ করিমগঞ্জের পুলিশ সুপার মায়াঙ্ক কুমার নিলামবাজার থানায় ঘাঁটি গেড়ে সম্পূর্ণ বিষয়টি তদারকি করছেন৷ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জ্যোতিরঞ্জন নাথ এবং ডিএসপি (সদর) সুধন্য শুক্লবৈদ্য, নিলামবাজার থানার ওসি রাজেন পাও রংমাই সহ জেলা পুলিশের পদস্থ আধিকারিকগণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিষয়টির উপর সজাগ দৃষ্টি রেখে চলেছেন৷


উল্লেখ্য, গত শুক্রবার শিলচর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মাকে দেখে উত্তর ত্রিপুরার শনিছড়ার বাসিন্দা দুই উপজাতি যুবতী একটি গাড়ি ভাড়া করে তাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিলেন৷ রাত প্রায় বারোটা নাগাদ দুই যুবতীকে নিয়ে গাড়ি চালক বারইগ্রামের পার্শবর্তী চেরাগিতে একটি ধাবায় উঠে৷ খাওয়াদাওয়া করে ধাবা থেকে বের হওয়ার পর সেখানে অপেক্ষারত আরেক দল দুষৃকতী দুই উপজাতি যুবতীকে জবরদস্তি করে তুলে অন্য এক কারে তুলে নিলামবাজার নিয়ে যায়৷ সেথানে স্থানীয় অগ্ণিনির্বাপক কেন্দ্রের পাশেই একটি নির্মীয়মাণ ভবনের ভূমিতলে এক যুবতীকে তিন এবং প্রথমতলে অন্য তিন দুষৃকতী অন্য যুবতীকে রাতভর দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে৷ শনিবার সামান্য ভোরের আলো ফুটলে আনুমানিক সাড়ে তিনটা নাগাদ সুযোগ বুঝে ধর্ষিতা দুই যুবতী সেখান থেকে পালিয়ে যান৷

তাঁরা নাকি একটি ট্রাকে উঠে প্রথমে বাজারিছড়া থানায় গিয়ে ঘটনার বৃত্তান্ত জানান৷ সেখানকার পুলিশ তাঁদের পাথারকান্দি থানায় সমঝে দেয়৷ পাথারকান্দি থানার ইনচার্জ ওসি উৎপল চন্দ ধর্ষিতা দুই যুবতীর কাছ থেকে ঘটনাস্থলের বিবরণ শুনে অনুমান করেন, ঘটনাস্থল নিলামবাজার হবে৷ তাই শনিবার সন্ধ্যার দিকে ওসি উৎপল চন্দ দুই যুবতীকে নিয়ে নিলামবাজার থানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন৷ দুষ্কর্মস্থল নির্মীয়মাণ ভবনের সামনে আসতেই দুই যুবতী ওসি উৎপল চন্দকে ঘটনাস্থলকে নিশ্চিত করেন৷ সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থামিয়ে ওসি উৎপল চন্দ তাঁর সঙ্গী পুলিশকর্মীদের নিয়ে ভবনটির গ্রাউন্ড ফ্লোরে প্রবেশ করেন৷ দুই যুবতীও পুলিশের সঙ্গে ভিতরে ঢুকেন৷ ভিতরে তখন অবস্থানকারী এক যুবককে দেখিয়ে যুবতীদ্বয় পুলিশকে জানায়, এই ব্যক্তির নেতৃত্বেই তাদেরকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল৷


ওসি উৎপল চন্দ তৎক্ষণাৎ আব্দুল আহাদ নামের ব্যক্তিকে আটক করে নিলামবাজার থানায় নিয়ে আসেন৷ পাথারকান্দি থানার ইনচার্জ ওসি উৎপল চন্দ ও দুই যুবতীর কাছ থেকে সম্পূর্ণ বিষয়টি অবগত হন৷ ইত্যবসরে ছুটে আসেন সিআই আনোয়ার হুসেন চৌধুরী৷ তিনি পুলিশের দল নিয়ে দুই যুবতীকে সঙ্গে নিয়ে ফের ঘটনাস্থলে যান৷ দুই যুবতীর কাছ থেকে তাদেরকে কীভাবে এখানে নিয়ে আসা হলো এবং তাদের সঙ্গে যে দুষ্কর্ম সংগঠিত হয়েছে তার বর্ণনা শুনেন৷ সে অনুযায়ী পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু আপত্তিজনক সামগ্রী উদ্ধার করে৷
ঘটনাস্থল থেকে গ্রেফতার মাস্টারমাইন্ড আব্দুল আহাদকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যণ পাঁচজনের নাম ঠিকানা জানতে পারে পুলিশ৷ সে অনুযায়ী সিআই আনোয়ার হুসেন চৌধুরী ও নিলামবাজার থানার ওসি রাজেন পাও রংমাই সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িত আরও পাঁচ ধর্ষককে গ্রেফতার করতে সক্ষম হন৷ পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা নাকি স্বীকার করেছে বলে জানা গেছে৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *