নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ১৯ অক্টোবর৷৷ রাজ্যে আরেক দুর্নীতির তথ্য সামনে এসেছে৷ পরিবহণ দফতরে বাস কেলেঙ্কারির ভিজিলেন্স তদন্ত শুরু হয়েছে৷ প্রায় ২৭ কোটি টাকার কেলেঙ্কারি হয়েছে বলে পরিবহণ দফতর দাবি করছে৷ ওই কেলেঙ্কারিতে প্রাক্তন পরিবহণ মন্ত্রী এবং আরবান ট্রান্সপোর্টের প্রাক্তন এমডি জড়িত ছিলেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে৷ এ-বিষয়ে পরিবহণ মন্ত্রী প্রণজিৎ সিংহরায় জানিয়েছেন, ওই কেলেঙ্কারির জন্যই জনগণের সুবিধার্থে রাস্তায় বাস নামানো যাচ্ছে না৷

প্রসঙ্গত, ২০০৯ সাল থেকে জেএনএনইউআরএম প্রকল্পে ১৭৩টি বাস ক্রয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল৷ দুর্নীতির সূচনাও ওই সময়েই হয়েছিল বলে দাবি পরিবহণ মন্ত্রীর৷ তাঁর কথায়, ১৭৩টি বাসের মধ্যে বর্তমানে ৯০টি রাস্তায় চলাচল করছে৷ বাকি ৩০টি বাস পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছে এবং ৫০টি বাস টিআরটিসিকে হস্তান্তর করা হলেও সেগুলি মেরামত করতে কালঘাম ছুটছে৷ তাঁর দাবি, ওই ৫০টি বাস সারাইয়ের জন্য ইতিমধ্যে টিআরটিসিকে ৩৫ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছে৷
পরিবহণ মন্ত্রী জানিয়েছেন, ত্রিপুরা আরবান ট্রান্সপোর্ট কপর্োরেশন লিমিটেডের এমডি পদে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অধিকারিরকরা দায়িত্ব সামলেছেন৷ সে-বিষয়ে এক তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০১০ সাল থেকে কেডি চৌধুরী, আরসি পোদ্দার, শম্ভু নমশূদ্র, আর রিয়াং, রতন বিশ্বাস, দশরথ দেববর্মা, সন্তোষ কর্মকার এবং কেশব কর উচ্চ পদে ছিলেন৷ তাঁদের মধ্যে রতন বিশ্বাস ১ নভেম্বর ২০১৪ থেকে ১৫ মার্চ ২০১৮ পর্যন্ত একটানা চার বছর ওই সংস্থার এমডি পদে দায়িত্ব সামলেছেন৷
এদিন তিনি জানান, জেএনএনইউআরএম প্রকল্পে ১৭৩টি বাস কেনা হলেও সমস্ত বাস ক্রয়ের কাগজপত্র খোঁজে পাওয়া যায়নি৷ তাঁর কথায়, ত্রিপুরায় সরকার পরিবর্তন হতেই আরবান ট্রান্সপোর্টের পূর্বতন এমডি রতন বিশ্বাস বদলি নিয়ে অন্যত্র সরে যান৷ কিন্তু, দফতর গাড়ির সঠিক তথ্য দিতে পারেনি৷ তিনি জানান, বাস ক্রয়ে বিরাট অনিয়ম হয়েছে সন্দেহ হতেই ১৭৩টি বাস খোঁজার কাজ শুরু করে পরিবহণ দফতর৷ এতে ১৭১টি বাসের হিসাব পাওয়া যায়৷ তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, বামফ্রন্ট সরকারের আমলে পরিবহণ দফতর দুটি বাস কিনে কোম্পানির কাছ থেকে সেই বাসগুলি হস্তান্তর নেয়নি৷ ফলে, বিক্রেতার গুদামে পড়ে থেকে বাসগুলি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে৷
পরিবহণ মন্ত্রী জানান, ১৭১টি বাসের মধ্যে ৩৮টি গাড়ি অপারেটররা কাগজে-কলমে দফতরের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে৷ কিন্তু বাস্তবে ওই বাসগুলির হস্তান্তর হয়নি দফতরের কাছে৷ কারণ সম্প্রতি বাসগুলি পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছে৷ তিনি জানান, ২০১৭ সালে ৬ জন অপারেটর ৩৮টি বাস বকেয়া রেখে কাগজে-কলমে ফিরিয়ে দিয়ে ব্যাঙ্ক গ্যারান্টির টাকাও বুঝে নিয়েছেন৷ তাঁর কথায়, নিয়ম অনুযায়ী বকেয়া থাকলে ব্যাঙ্ক গ্যারান্টির টাকা ফেরত দেওয়ার বিধান নেই৷
পরিবহণ মন্ত্রী বলেন, জনৈক বাস অপারেটর অভিজিৎ পালের কাছে ৩টি গাড়ি ছিল৷ তিনি ২০১৭ সালে প্রতি গাড়িতে ১ লক্ষ ৩ হাজার ৮০০ টাকা বকেয়া রেখেই দফতরের কাছে হস্তান্তর করেছেন৷ তেমনি, উত্তম পালের কাছে ৬-টি, রনো সাহার কাছে ১৯টি, রঞ্জন শর্মার কাছে ৭-টি, কামাল সাহার কাছে ২-টি এবং দীপঙ্কর দেবের কাছে ১-টি গাড়ি ছিল৷ তাঁদের গাড়িগুলি পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছে৷ পরিবহণ মন্ত্রীর দাবি, ওই গাড়িগুলি ব্যবহারের উপযোগী নয়৷ অথচ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওই অপারেটরদের বকেয়া থাকা সত্ত্বেও তাদের ব্যাঙ্ক গ্যারান্টি ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ তাই তিনি কেলেঙ্কারি হয়েছে বলে দাবি করেছেন৷ বেআইনিভাবে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্যই ওই সময় দফতর বাস সমঝে না নিয়েই ব্যাঙ্ক গ্যারান্টির টাকা ফেরত দিয়েছে৷ তিনি এদিন স্পষ্ট ইঙ্গিত করেন, আরবান ট্রান্সপোর্টে রতন বিশ্বাস এমডি থাকাকালীন সমস্ত দুর্নীতি হয়েছে৷
এদিন তিনি জানিয়েছেন, ১৭৩টি বাসের মধ্যে ৯৩টি বাস রাস্তায় চলাচল করছে৷ বাকি ৩০টি বাস ব্যবহারের উপযোগী নয় এবং ৫০টি টিআরটিসির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে৷ তবে, ওই ৫০টি বাস সারাইয়ের পর চলাচলের উপযোগী হয়ে উঠবে৷ তাঁর কথায়, ইতিমধ্যে ওই বাসগুলি মেরামতের জন্য টিআরটিসিকে ৩৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে৷ ১৬টি গাড়ি ইতিমধ্যে সারাই হয়েছে৷ তাই, নতুন রুট খোঁজা হচ্ছে ওই বাসগুলি চালানোর জন্য৷ বাকি ৩৪টি বাসের মেরামতের কাজ চলছে, বলেন তিনি৷
তাঁর কথায় মনে হয়েছে, বামফ্রন্ট জমানায় পরিবহণ দফতরে প্রায় ২৭ কোটি টাকার বাস কেলেঙ্কারি হয়েছে৷ তাতে, প্রাক্তন পরিবহণ মন্ত্রী এবং আরবান ট্রান্সপোর্টের প্রাক্তন এমডিও যুক্ত রয়েছেন৷ পরিবহণ মন্ত্রী প্রণজিৎ সিংহরায় জানিয়েছেন, বিগত সরকারের আমলে জনগণের টাকায় কিছু মানুষের ভূরিভোজের ব্যবস্থা করা হয়েছিল৷ বিভাগীয় তদন্তে তার প্রমাণ মিলেছে৷ শুধু তা-ই নয়, ওই বাস ক্রয়ের সমস্ত হিসাব খুঁজে বের করার জন্য অডিট দফতরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল৷ কিন্তু তাতেও অনেক কাগজপত্র খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অডিট রিপোর্ট দিয়েছে৷ তাই, কেলেঙ্কারির তদন্ত করার জন্য ভিজিলেন্সকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে৷ তিনি বলেন, জনগণের যাতায়াতে সুবিধার্থে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট মজবুত করার ইচ্ছা ছিল ত্রিপুরা সরকারের৷ কিন্তু ওই কেলেঙ্কারির জন্য আপাতত তা সম্ভব হচ্ছে না৷

