রেডিও’র জনপ্রিয়তা কমেছে, খরচ কমিয়ে আয় বাড়ানোর পরামর্শ দিলেন রাজ্যপাল

AIR Governorনিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ৩০ জানুয়ারি ৷৷ জনপ্রিয়তা যেখানে আগের তুলনায় অনেকগুণ কমে গেছে, সেখানে রেডিও’র বিরাট পরিকাঠামো ব্যবস্থায় খরচ কমিয়ে আয় বাড়ানোর জন্য পরামর্শ দেন রাজ্যপাল তথাগত রায়৷ সেই সাথে আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, বর্তমানে রেডিও কেউ শুনতে চান না, সেটা কাম্য নয়৷ সোমবার আকাশবাণী আগরতলা কেন্দ্রের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাজ্যপাল আকাশবানী আগরতলা কেন্দ্রের কর্তৃপক্ষকে সমস্ত বিষয় নতুন করে ভাবনার তাগিদ মনে করিয়ে দিয়েছেন৷
এদিন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাজ্যপাল অতীত দিনের স্মৃতি রোমন্থন করেন৷ তিনি বলেন, আগে বিনোদনের এবং দেশ-দুনিয়ার নানান খবর পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম ছিল রেডিও৷ শিল্পীরা রেডিওতে কাজ করেন বলতে গর্ব বোধ করতেন৷ ১৯৭০ সালে দেশে প্রথম টিভি’র আবির্ভাব হলেও রেডিও’র জনপ্রিয়তা বিন্দুমাত্র কমে যায়নি তখন৷ কারণ টিভিতে সম্প্রচারিত অনুষ্ঠান ছিল খুবই সাদামাঠা৷ ১৯৯০ সাল থেকে টিভি ক্রমেই আকর্ষনীয় হয়ে উঠলেও রেডিও’র জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি৷ কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে ক্রমেই আকাশবাণী জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে৷ এদিন তিনি অনেকটা কটাক্ষের সুরেই বলেন, বর্তমান সময়ে কাউকে বেতার সম্প্রচারের বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে উত্তর পাওয়া যায় রেডিও এখন কেউই শুনে না৷ রাজ্যপাল বলেন, এটা কখনই কাম্য নয়৷ আকাশবাণী কর্তৃপক্ষদের এবিষয়ে নতুন করে ভাববার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন৷
এদিন তিনি পুনরায় রেডিও’র জনপ্রিয়তা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট দিশা দেখিয়েছেন৷ তাঁর মতে, এফএম রেডিও চিত্তাকর্ষক করতে হবে৷ বর্তমান সময়ে এফএমএ’র জনপ্রিয়তা রয়েছে৷ কিন্তু তা কেবলই বেসরকারিস্তরেই সীমাবদ্ধ৷ অনেকটা অবাক হয়ে বলেন, আকাশবাণী কেন সে জায়গায় পৌঁছাচ্ছে না তা তিনি বুঝে উঠতে পারছেন না৷ তাই, এদিন কর্তৃপক্ষদের উদ্দেশ্যে রাজ্যপাল বলেন, রেডিও’র যে পরিকাঠামো ব্যবস্থা রয়েছে তার খরচ কমাতে হবে৷ সাথে এফএমএ’র আকর্ষণ বাড়াতে হবে৷ তাহলেই বিজ্ঞাপন মিলবে সাথে রেডিও’র আয় বাড়বে৷ এভাবেই রেডিও’র উত্তরণ সম্ভব বলে রাজ্যপাল মনে করেন৷ দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে জানান, কালের গতি অস্বীকার না করে তার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারলেই সাফল্য নিশ্চয়ই মিলবে৷ সেজন্যই ভাবতে হবে বেসরকারি সংস্থাগুলি এফএম চ্যানেলে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে৷ তাহলে ভাবতে হবে অতি প্রাচীন এই বেতার সম্প্রচার কেন্দ্র সেটা পারবেনা কেন৷
এদিকে সোমবার আকাশবাণী আগরতলা কেন্দ্রের সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনের উদ্বোধন করেন রাজ্যপাল তথাগত রায়৷ আকাশবাণী কেন্দ্রে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে এদিন রাজ্যপাল আকাশবাণী আগরতলার সংবাদ বিভাগের টুইটার একাউন্ট এবং ফেসবুক পেজ এর আনুষ্টানিক উদ্বোধন করেন৷ এই দুটি মিডিয়াতেই আজ থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যার বাংলা ও ককবরক সংবাদ বুলেটিন আপলোড করা হবে৷ ফেসবুক ও টুইটার হ্যান্ডেল এ ‘airnews agartala’ একাউন্ট সার্চ করে কিংবা ফলো করে আকাশবাণীর সান্ধ্য বাংলা ও ককবরক সংবাদ শোনা যাবে৷ কিছুদিনের মধ্যে সকালের সংবাদও এই দুটি সোশ্যাল মিডিয়াতে আপলোড করা হবে৷ স্মার্ট ফোন ব্যবহাকারীরাও তাদের ফোনে এই সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন৷
এদিন অনুষ্ঠানে আকাশবাণী আগরতলা কেন্দ্রের কারিগরি বিভাগের অধিকর্তা সুচিস্মিতা রায় ১৯৬৭ সালের ২৬ শে জানুয়ারিতে সূচনার সময় থেকে এই কেন্দ্রের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন৷ অনুষ্ঠানে সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষ্যে একটি স্মরণিকা প্রকাশ করেন রাজ্যপাল৷ অনুষ্ঠানে আকাশবাণী আগরতলা কেন্দ্রের প্রথম ঘোষিকা যুথিকা বসু ভৌমিক এবং রাজ্যের কৃতি মহিলা ফুটবলার লক্ষ্মীতা রিয়াংকে সংবর্ধনা জানানো হয়৷ এছাড়া সারাদিন ব্যাপী নানা অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়৷ অনুষ্টানে অন্যান্য অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আকাশবাণী, দিল্লির কারিগরি বিভাগের উপমহানির্দেশক নিলম সিং, আকাশবাণী উত্তরপূর্বাঞ্চলের কার্যালয়ের বরিষ্ঠ আধিকারিক রাজীব বড়ুয়া প্রমুখ৷
এই উপলক্ষ্যে বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনাচক্র৷ বিষয় ছিল নব্য মিডিয়ার চক্রব্যুহে রেডিও এর প্রাসঙ্গিকতা৷ অংশ নিয়েছেন, ত্রিপুরা হাইকোর্ট এর বিচারপতি শুভাশিস তলাপাত্র, বিশিষ্ট সমাজসেবী ফুলন ভট্টাচার্য, ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডক্টর অঞ্জন কুমার ঘোষ৷ সঞ্চালনা করেন অধ্যাপক ইন্দ্রনীল ভৌমিক৷ আলোচনাচক্রে উপাচার্য ডক্টর অঞ্জন কুমার ঘোষ বলেন, রেডিও এর প্রাসঙ্গিকতা যথেষ্ট রয়েছে, বরঞ্চ বলা ভাল রেডিওকে আমাদের শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা উচিত৷ কারণ, অনেক মানুষেরই পড়ার সুযোগ কমে গেছে, কাজেই শোনার মাধ্যমে পড়ার জন্য রেডিও ভূমিকা নিতে পারে, তিনি বলেন, আমাদের শোনানো হোক, শোনে শোনে শিক্ষা গ্রহণ অনেক বেশি কার্যকরী৷ অডিও বুক-এর মতো রেডিওর মাধ্যমে ক্লাসিক বই পড়ে শোনানো উচিত৷
ত্রিপুরা হাইকোর্ট এর বিচারপতি শুভাশিস তলাপাত্র বলেন, এই মাধ্যমকে শিক্ষা ভাবনার শিল্প নির্মাণের দিকটি নিয়ে এখন আরো ভাবতে হবে৷ যাতে শ্রোতার সাথে গভীরভাবে নৈকট্য তৈরি করা যায়৷ তিনি বলেন, গণতন্ত্র জনগণকে বেশি করে যুক্ত করার জন্য গণ পরিসর তৈরি করার দরকার এই ছিল রাষ্ট্রের নীতি, এটার জন্য রেডিওর ভূমিকা অনদ্যভাবে প্রতিফলিতও হয়েছে৷ কাজেই রেডিওর প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে যায়নি৷ একে আরো বিকশিত করার কথায় ভাবা উচিত৷ রেডিওর অনবদ্য দািিয়ত্ব পালনের কথা বলতে গিয়ে তিনি , ত্রিপুরায় জাতি উপজাতির সম্প্রীতি রক্ষায় এবং উপজাতির জাতিসত্ত্বা বিকাশে আকাশবাণী আগরতলা অনন্য ভূমিকা পালন করেছে বলে মন্তব্য করেন৷
আগরতলার পুর পরিষদের কাউন্সিলার, বিশিষ্ট সমাজসেবী ফুলন ভট্টাচার্য বলেন, রেডিওর ভিন্ন ধারার শিক্ষামূলক ও সাংসৃকতিক অনুষ্ঠান এখনো প্রাসঙ্গিক এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয়৷ রেডিও’র খবর সত্যতার জন্য এখনো সর্বাধিক গ্রাহ্য এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে রেডিও অনেক আগে থেকেই রয়েছে বলেও তিনি আলোচনাসভায় মন্তব্য করেন৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *