নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ২১ জানুয়ারী৷৷ রাজ্যের অধিকাংশ মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতিতে খয়রাতী থেকে উত্তরণ অত্যন্ত

প্রয়োজন বলে মনে করেন রাজ্যপাল তথাগত রায়৷ তাই খয়রাতীর বদলে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে রাজ্যের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি সুনিশ্চিত হলে তিনি আনন্দিত হবেন বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন৷ শনিবার আগরতলায় পূর্ণরাজ্য দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কৃষিমন্ত্রী অঘোর দেববর্মা এবং রাজস্বমন্ত্রী বাদল চৌধুরী ভাষণের পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্যপাল এইভাবেই রাজ্য সরকারকে সারা দেশে একটি আদর্শ সরকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দিশা দেখিয়েছেন৷
এদিন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ক্ষোভের সুরে রাজস্বমন্ত্রী বাদল চৌধুরী বলেন, উন্নয়নের প্রশ্ণে কেন্দ্র ও রাজ্য গুলির মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে৷ পাশাপাশি বলেন, দেশে সবকটি রাজ্য একসাথে এগিয়ে যেতে পারছে না৷ ১১টি রাজ্যের জন্য বিশেষ শ্রেণীভুক্ত রাজ্যের মর্যাদা ছিল সেটাও তুলে নেওয়া হয়েছে৷ শুধু তাই নয়, অনেক স্কিম কমিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ যেগুলো রয়েছে তাতেও নতুন নতুন শর্ত আরোপ করা হচ্ছে৷ তিনি বিমুদ্রাকরণের সমালোচনা করে বলেন, দেশে ৩০ কোটি মানুষ নিরক্ষর, এই পরিস্থিতিতে প্রস্তুত না হয়ে বিমুদ্রাকরণ এবং নগদহীন লেনদেন চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কোন মতেই মেনে নেওয়া যায় না৷ তিনি দাবি করেন, রেগায় শ্রমদিবস সৃষ্টি করতে ত্রিপুরা শীর্ষ স্থানে রয়েছে৷ তাছাড়া দাবি করেন, সন্ত্রাসবাদ দমন করে সারা দেশে ত্রিপুরা সরকার নজির স্থাপন করেছে৷ তাতে তিনি পুরো কৃতিত্বটা রাজ্য সরকার এবং উপজাতি অংশের মানুষের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন৷ তার মতে, উপজাতিরা এগিয়ে না আসলে সন্ত্রাসবাদ দমন সম্ভব হত না৷ কৃষিমন্ত্রী অঘোর দেববর্মাও দাবি করেন, দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে পূর্ণরাজ্যের মর্যাদা মিলেছে৷ এরজন্য ত্রিপুরার মানুষকে ধাপে ধাপে আন্দোলন করতে হয়েছে৷ তিনি দাবি করেন, ১৯৭৮ সালের পর থেকে অবস্থার পরিবর্তন শুরু হয়৷ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে সরকার কাজ করতে শুরু করে৷ তখন থেকে এখন পর্যন্ত মানুষের ভাবনাকে মর্যাদা দিয়ে সরকার কাজ করে চলেছে৷ কিন্তু একাংশ উন্নতি হোক, সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় থাকুক চায় না, তারা প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্র করে চলেছে৷ এই ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করেই এগিয়ে যেতে হবে বলে তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেন৷ তাতে তাঁর ইঙ্গিত, কেন্দ্রীয় সরকার নানাভাবে বঞ্চনা করে চলেছে রাজ্যের সাথে৷ ফলে, রাজ্যের উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষেরও সঠিকভাবে উন্নতি হচ্ছে না৷
রাজ্য মন্ত্রিসভার দুই সদস্যের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্যপাল রাজ্যের মানুষের উন্নতি সঠিকভাবে না হওয়ার জন্য রাজ্য সরকারকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন৷ রাজ্যে এখন পর্যন্ত অনেক কিছু হয়েছে, সে কথা বললেও রাজ্যপাল মনে করেন, অর্থনৈতিক উন্নতির প্রশ্ণে সঠিক দিশায় হাঁটেনি রাজ্য সরকার৷ তাঁর মতে, অর্থনৈতিক উন্নতি সুনিশ্চিত করতে হলে খয়রাতীর মাধ্যমে সেটা সম্ভব নয়৷ তার জন্য প্রয়োজন মানুষকে নিজেদের পায়ে দাঁড়াবার সুযোগ করে দেওয়ার৷ তিনি মনে করেন, মানুষ যাতে স্বনির্ভর হতে পারে সেটা প্রথমে নিশ্চিত করতে হবে৷ এদিন তিনি কটাক্ষের সুরে বলেন, খয়রাতী করে যেরকম প্রচেষ্টা কিছু কিছু সময় নেওয়া হয়েছে তাতে করে কোন দীর্ঘস্থায়ী সমাধান মিলবে না৷ রেগা প্রকল্প রাজ্যের গ্রামীণ এলাকার মানুষের অর্থনীতিতে যথেষ্ট প্রভাব রেখেছে৷ কিন্তু রাজ্যপাল মনে করেন, রেগা বাস্তবে একটা খয়রাতী ব্যবস্থা৷ তাঁর মতে, রেগার মাধ্যমে টাকা পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে যাতে মানুষ অনাহারে অর্ধাহারে কষ্ট না পান৷ এর জন্য তিনি রাজ্য সরকারকে সাধুবাদও দেন৷ কিন্তু তার সাথে রাজ্য সরকারকে মনে করিয়ে দেন, এর চেয়ে উচিত কাজ হল রেগার উপর নির্ভরশীলতা থেকে উত্তরণ করে মানুষকে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া যাতে মানুষ নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন, এমনকি সরকারের ওপরও নির্ভরশীল না হন৷
মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি সুনিশ্চিত করার বিষয়ে চিন্তাভাবনার কথাও বলেন রাজ্যপাল৷ তিনি মনে করেন, কর্মসংস্থানের চেয়ে প্রয়োজনীয় আর কিছুই নেই৷ কারণ, একমাত্র কর্মসংস্থান হলেই মানুষ নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন৷ তাতে খয়রাতীর থেকে উত্তরণ ঘটতে পারে৷ তাই তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এই খয়রাতী থেকে উত্তরণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়৷ আর সেটা রাজ্য সরকার নিশ্চিত করতে পারলে খুবই আনন্দিত হবেন বলেও জানান৷
সন্ত্রাসবাদ দমন প্রসঙ্গে রাজ্যপাল কৃতিত্বের অংশীদার বর্তমান বাংলাদেশ সরকার এবং দুদেশের মধ্যে কূটনীতিকেও করতে চেয়েছেন৷ তাঁর মতে, ত্রিপুরা যেহেতু তিনদিকে বাংলাদেশ সীমান্ত বেষ্টিত, ফলে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বন্ধুসুলভ আচরণ না হলে সন্ত্রাসবাদ দমন সম্ভব হত না৷ তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বলেন, রাজ্যে যে সময় মান্দাই ঘটনা, জাতি উপজাতির মধ্যে সংঘর্ষ ঘটেছিল তাতে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের একটা অংশের, সরকারের এমনকি একটা দলের অবদান ছিল৷ ২০০১ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে যে সরকার ছিল তারা ভারতকে শত্রু হিসেবে ভাবত৷ এরাজ্যের উগ্রপন্থীরা তখন তাতে উৎসাহ পেত৷ এমনকি তারা তখন বাংলাদেশে আত্মগোপন করে থাকার যথেষ্ট সুযোগ পেত৷ কিন্তু সে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে৷ আর সেটা দুদেশের মধ্যে কূটনীতির ফলেই সম্ভব হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন৷ তাঁর বক্তব্য, দুদেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে মৈত্রীর সম্পর্ক সুদৃঢ় করার উদ্দেশ্যই এরাজ্যে উগ্রপন্থার সমস্যা দমনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে৷ বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের তাতে বিরাট অবদান রয়েছে৷
কেন্দ্র-রাজ্য দূরত্ব নিয়েও অনেকটা চওড়া সুরে মত ব্যক্ত করেন রাজ্যপাল৷ তাঁর মতে, সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুকরণে ভারতে যোজনা কমিশন গঠিত হয়েছিল৷ যে রাষ্ট্র মুছে গেছে তাদের অনুকরণে কোন কিছু টিকিয়ে রাখা স্বাভাবিকভাবেই কোন মানে রাখে না৷ যোজনা কমিশন মুছে গেলেও পিছিয়ে পড়া রাজ্যের জন্য কেন্দ্র গভীরভাবে চিন্তা করছে৷ ব্রডগেজে রেল পরিষেবা, ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ এর মাধ্যমে রাজ্যের আরো প্রভূত উন্নতি সম্ভব বলে রাজ্যপাল দাবি করেন৷ আর এরজন্য কোন যোজনা কমিশনের প্রয়োজনীয় হয়নি বরং কেন্দ্রই রাজ্যের চিন্তা করে উদ্যোগ নিয়েছে বলে রাজ্যপাল কটাক্ষ করেন৷ এসমস্ত কিছুর পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্যপাল এখন পর্যন্ত যে সমস্ত কাজে সফলতা পাওয়া গেছে তাতে আত্মসন্তুষ্টিতে না ভোগে আরো এগিয়ে যাওয়ার জন্য রাজ্য সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন৷ পাশাপাশি তিনি কর্মসংস্থান এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে আরো জোর দেওয়ার জন্য বলেছেন৷ কারণ, রাজ্যে যেসমস্ত পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে সেগুলিকে ব্যবহার করে বিরাট পর্যটন শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব বলে তিনি দাবি করেন৷ তাতে প্রচুর কর্মসংস্থানের পাশাপাশি আর্থিক প্রগতি সম্ভব বলেও তিনি মনে করেন৷