রাজনীতির পালা বদলের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রনায়কদের জীবনেও উপেক্ষার ইতিহাস রচিত হইতে থাকে৷ গণতন্ত্রের গৌরব এইভাবেই মানুষের মনে প্রশ্ণ চিহ্ণ আনিয়া দেয়৷ আজ যিনি জনপ্রিয়তার মধ্যগগনে কাল তিনি জনধিকৃত হইতে থাকেন৷ রাজনীতিতে এই উত্থান ও পতন হামেশাই ঘটিতে থাকে৷ ভারতের রাজনীতির ইতিহাসে এমন নেতা নেত্রী রহিয়াছেন যাহাদের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ নিন্দা যেমন আছে তেমনি কৃতিত্বের কাহিনীও তো আছে৷ তাহাদের জন্ম ও মৃত্যু দিনটিও সরকারী কর্মসূচীতে ঠাঁই পায় না৷ সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের আদর্শে প্রাণীত কৃতি লোকদের পাদ প্রদীপের আলোতে নিয়া আসা হয়৷ যাহারা অন্য সরকারের আমলে উপেক্ষা অবহেলার মাঝে চলিয়া যাইতেন৷ সেই উপেক্ষিতরাই আজ নতুন করিয়া উদ্ভাসিত হইয়াছেন৷ পক্ষান্তরে, এক সময় যাহারা পাদপ্রদীপের আলোতে ছিলেন তাহাদের একবারে পিছনের সারীতে ঠেলিয়া দেওয়া হইয়াছে৷ ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী, লালবাহাদূর শাস্ত্রী আরও অনেক নেতা নেত্রীরা দেশ শাসন করিয়াছেন৷ তাঁহাদের শাসনে সাফল্যের খতিয়ান কি কম? পাকিস্তান টুকরো করিয়া বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম ঘোষণার উজ্জ্বল নেত্রী তো ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী৷ ব্যাংক জাতীয়করণ ও রাজন্য ভাতা বিলোপের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত সমুহ কার্য্যকর করিয়া ইন্দিরা দেশের রাজনীতিতে অভাবনীয় সাফল্য পাইয়াছেন৷ আজকের জীবন তো কম্পিউটার ছাড়া অচল৷ সেই কম্পিউটারের জন্য প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী যে উল্লেখ যোগ্য উদ্যোগ নিয়াছিলেন৷ ব্যাংক সহ প্রায় সর্বত্র কম্পিউটার চালু করিয়া তখন তিনি সমালোচিত হইয়াছেন৷ এই কম্পিউটারের বিরুদ্ধে সবচাইতে বেশী প্রতিবাদী হইয়াছিল সিপিএম৷ আজ তাহারাও কম্পিউটার ছাড়া চোখে পথ দেখে না৷ ইন্দিরা, রাজীব কেন৷ প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীই দেশে প্রতিরক্ষা ও কৃষিতে নবযুগ আনিয়াছিলেন৷ জয় জওয়ান, জয় কৃষাণ আওয়াজ তুলিয়া ভারত এক উল্লেখযোগ্য মাত্রায় পৌঁছিয়া যায়৷ এই রকম বহু ঘটনা আছে যেখানে বহু নেতা নেত্রীর ভূমিকা ছিল রীতিমতো উল্লেখযোগ্য৷ ইতিহাস বিখ্যাত৷ তাহাদেরকে তো ভুলিয়াও স্মরণ করিতে চায় না রাষ্ট্র৷ এই রাজনীতিকরণ আমাদের গণতন্ত্রের মহিমাকে খাটো করিয়াই দিতেছে৷
এই ট্রেডিশান চলিতে থাকিলে এক দল ক্ষমতায় আসিলে আরেক দল উপেক্ষিত হইবে৷ ইহাই সবচাইতে বেশী দুর্ভাগ্যের৷ দুর্ভাগ্যের বলা হইতেছে এই কারণে যে, দেশের জন্য যাঁহারা নিজের জীবন বলি দিয়াছেন, দেশবাসী যাহাদের দেশনায়ক হিসাবে অভিষিক্ত করিয়াছেন তাহারা উপেক্ষিত হইলে গণতন্ত্রের উদারতাই হারাইয়া যায়৷ কেন্দ্রের ক্ষমতায় কংগ্রেস যখন মাঝ আকাশে তখন বহু নেতা সমাজ কর্মী উপস্থিত হইয়াছেন৷ বিজেপি তাঁহাদের স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন৷ ইহা গণতন্ত্রের পক্ষে বড়ই অশুভ কান্ড৷ গণতন্ত্র তখনই আরও বেশী প্রাণবন্ত হইয়া উঠিবে যেখানে সমস্ত মত ও পথের মানুষকে প্রাপ্য মর্য্যদায় ভূষিত করা হইবে৷ ইতিহাসের বহু আকাবাঁকা পথ বহিয়া এই ভারতবর্ষ অগ্রসর হইয়াছে৷ বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যই এই দেশের মর্মবাণী৷ আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করিয়া তাঁহার সেনাপতিকে বলিয়াছিলেন ‘সত্যি সেলুকাস কী বিচিত্র এই দেশ৷’ বহুবার ভারত আক্রান্ত ও লুন্ঠিত হইয়াছে তবু এই দেশ স্বমহিমায় আগাইয়া যাইতেছে৷ ৭৬ সালে ভয়াল মন্বন্তর কয়েক হাজার মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলিয়া দিয়াছিল৷ সেই দুর্ভিক্ষের চরম দুঃসহ দিনগুলির পরও দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ৷ দু’টাকা কেজি চালও দেওয়া হয়৷ আজ দেশের সামনে সর্বনাশা থাবা বসাইয়াছে কালোবাজারীর দল ও কালো টাকার থলি৷ এই কালোবাজারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত কার্য্যকর করিয়া প্রধানমন্ত্রী এক কঠিন চ্যালেঞ্জ নিবার মতো দুঃসাহস দেখাইয়াছেন৷ এই সংগ্রামের সাফল্যই আনিয়া দিতে পারে শক্তিশালী ভারত৷ এই চ্যালেঞ্জ নিবার হিম্মত যে মোদিজির আছে সেখানে আরও বেশী উদারতাই মানুষ চাহিতেছে৷ আর এই উদারতাই পারে গণতান্ত্রকে মজবুত ভিতের উপর দাঁড় করাইতে৷