নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ১৪ অক্টোবর৷৷ দুর্নীতির মামলাকে ঘিরে দিনভর টানা নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে৷ প্রাক্তন পূর্তমন্ত্রীকে নিয়ে পুলিশের দৌড়ঝাপকে ঘিরে মনে হয়েছে লুকোচুরি খেলা চলছে৷ অবশেষে রাতে আদালতের অন্তর্বর্তী জামিন মঞ্জুরে প্রাক্তন পূর্তমন্ত্রী তথা বর্তমান বিধায়ক বাদল চৌধুরী যেন হাফ ছেড়ে বেঁচেছেন৷ তাই দিনভর নিজেকে লুকিয়ে রাখলেও রাতে পশ্চিম থানায় স্বশরীরে হাজিরা দিয়ে বন্ডে সাক্ষর করলেন তিনি৷

এদিন, দুর্নীতি মামলায় অন্তর্বর্তী জামিন পেয়েছেন প্রাক্তন পূর্ত মন্ত্রী বাদল চৌধুরী৷ তবে, প্রাক্তন পূর্ত কর্তা সুনীল ভৌমিককে এক দিনের জেল হেপাজতে পাঠিয়েছে আদালত৷ আগামীকাল ফের তাঁকে আদালতে তোলা হবে৷ সোমবার রাতে বাদল চৌধুরী পশ্চিম আগরতলা থানায় গিয়ে বন্ডে দস্তখত করেছেন৷
প্রসঙ্গত, দুর্নীতি মামলায় প্রাক্তন পূর্তমন্ত্রী তথা সিপিআইএম বিধায়ক বাদল চৌধুরীকে হন্যে হয়ে খুঁজলেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ৷ তাঁর বিরুদ্ধে পশ্চিম আগরতলা থানায় মামলা হয়েছে৷ একই মামলায় পুলিশ সোমবার ভোররাতে পূর্ত দফতরের প্রাক্তন ইঞ্জিনিয়ার ইন চিফ সুনীল ভৌমিককে গ্রেফতার করেছে৷ এছাড়া, ওই দুর্নীতি ইস্যুতে পূর্ত দফতরের প্রাক্তন প্রধানসচিব তথা প্রাক্তন মুখ্যসচিব ওয়াই পি সিংহের বিরুদ্ধেও পুলিশ এফআইআর দাখিল করেছে৷ বিরোধী দল সিপিএম এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে শাসক দল বিজেপি এবং রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির অভিযোগ এনেছে৷
২০০৮-০৯ অর্থ বছরে বিভিন্ন নির্মাণ কাজে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে৷ তার মধ্যে আগরতলায় উড়ালপুল নির্মাণ-সহ পূর্ত দফতরে দুর্নীতির ভিজিল্যান্স তদন্ত চলছে৷ ওই মামলায় প্রাক্তন পূর্তমন্ত্রী ভিজিল্যান্স জেরার মুখোমুখি হয়েছিলেন৷ কিন্তু এখন পুলিশ দুর্নীতির ঘটনায় মামলা নিয়েছে৷ পশ্চিম জেলার পুলিশ সুপার অজিত প্রতাপ সিংহ জানিয়েছেন, পূর্ত দফতরে সংগঠিত দুর্নীতির ঘটনায় প্রাক্তন পূর্তমন্ত্রী তথা বর্তমান বিধায়ক বাদল চৌধুরী, পূর্ত দফতরের প্রাক্তন ইঞ্জিনিয়ার ইন চিফ সুনীল ভৌমিক এবং পূর্ত দফতরের প্রাক্তন প্রধানসচিব তথা প্রাক্তন মুখ্যসচিব ওয়াই পি সিংহ-এর বিরুদ্ধে ভারতীয় ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪১৮, ৪২০, ২০১, ১২০বি এবং দুর্নীতি বিরোধী আইনের ১৩ নম্বর ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে৷ মামলা নম্বর ২৫১/১৯৷ তিনি জানান, রাজ্য পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ ওই মামলার তদন্ত করছে৷
এদিকে, রবিবার পুলিশ মামলা নিতেই শুরু হয়ে যায় ধরপাকড়৷ সোমবার ভোর আনুমানিক চারটা নাগাদ ক্রাইম ব্রাঞ্চের অফিসাররা আগরতলার রামনগরে তাঁর নিজের বাড়ি থেকে পূর্ত দফতরের প্রাক্তন চিফ ইঞ্জিনিয়ার সুনীল ভৌমিককে গ্রেফতার করেছে৷ আজ তাঁকে রিমান্ড চেয়ে আদালতে সোপর্দ করেছে পুলিশ৷ কিন্তু, আদালত তাঁকে আগামীকাল পর্যন্ত জেল হেপাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছে৷ পাশাপাশি, তাঁর জামিনের আবেদনও আজ খারিজ করে দিয়েছে আদালত৷
অন্যদিকে, ক্রাইম ব্রাঞ্চ সারা রাজ্যে বাদল চৌধুরীর খোঁজে তল্লাশি শুরু করেছিল৷ আগরতলায় তাঁর নিজের বাড়ি, দুই বিধায়ক আবাসন, বিলোনিয়াতে তাঁর পৈতৃক বাড়ি, বিভিন্ন সিপিএম নেতার বাড়ি, এমনকি বিমানবন্দরেও তাঁকে পুলিশ খুঁজেছে৷ দুপুরে মেলারমাঠে সিপিএম পার্টি সদর দফতরেও তল্লাশি চালাতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছে পুলিশ৷ সার্চ ওয়ারেন্ট ছাড়াই পুলিশ সিপিএম পার্টি অফিসে গিয়ে প্রতিরোধের মুখে পড়েন৷ প্রাক্তন পরিবহন মন্ত্রী মানিক দে পুলিশ আধিকারিক এবং ডিসিএমকে সার্চ ওয়ারেন্ট আনলে তবেই তল্লাশি করা যাবে বলে সাফ জানিয়ে দেন৷ মানিক দে’র কথায়, পার্টি অফিসে তল্লাশিতে কোন আপত্তি নেই৷ কিন্তু সার্চ ওয়ারেন্ট ছাড়া তা সম্পূর্ণ বেআইনি৷ তা কোন ভাবেই বরদাস্ত করা হবে না৷
অন্যদিকে বাদল চৌধুরীর আইনজীবী পুরোষোত্তম রায়বর্মন জানিয়েছেন, আদালতে আগাম জামিনের আবেদন জানানো হয়েছে৷ পশ্চিম ত্রিপুরা জেলা দায়রা জজ আদালতের বিচারক চূড়ান্ত রায় ঘোষণার আগে বাদল চৌধুরীকে গ্রেফতার করা যাবে না বলে নির্দেশ দিয়েছেন৷ এদিকে, প্রাক্তন চিফ ইঞ্জিনিয়ার সুনীল ভৌমিকও জামিনের আবেদন জানিয়েছেন আদালতে৷
সিপিএম-এর রাজ্য সম্পাদক গৌতম দাস এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন৷ তাঁর কথায়, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে না পেরে বিরোধী দলের প্রতি প্রতিহিংসামূলক রাজনীতি শুরু করেছে শাসক দল বিজেপি ও ত্রিপুরা সরকার৷ তাঁর দাবি, রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধীদের কণ্ঠ রোধ করার জন্যই প্রাক্তন পূর্তমন্ত্রী তথা বর্তমান বিধায়ক বাদল চৌধুরী-সহ দুই প্রাক্তন আমলার বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ৷ তিনি এই পরিস্থিতির জন্য রাজ্য সরকারের সমালোচনা করে রাজ্যবাসীকে গর্জে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন৷ তাঁর সাফ কথা, আইনি এবং রাজনৈতিকভাবে সিপিএম এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করবে৷
আজ আদালত প্রাক্তন পূর্ত মন্ত্রী বাদল চৌধুরীকে অন্তর্বর্তী জামিন মান্যর করেছে৷ আগামী ১৬ অক্টোবর ওই মামলায় শুনানি হবে৷ ওইদিন পর্যন্ত তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পারবে না পুলিশ৷ তবে, ইঞ্জিনিয়ার ইন চিফ সুনীল ভৌমিকের জামিন মান্যর হয়নি৷ তাঁকে একদিনের জেল হাজতে পাঠিয়েছে আদালত৷ আগামীকাল পুনরায় তাঁকে আদালতে তুলবে পুলিশ৷
এদিন বাদল চৌধুরীর বিরুদ্ধে পুলিশী ব্যবস্থার প্রতিবাদে সিপিএম আগরতলায় বিক্ষোভ মিছিল সংগঠিত করেছে৷ ওই মিছিলে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা বিরোধী দলনেতা মানিক সরকার সহ সিপিএমের শীর্ষ নেতৃত্বরা পা মিলিয়েছেন৷
এদিন দিনভর পুলিশ এবং সিপিএম নেতৃত্বের কান্ডকারখানায় মনে হয়েছিল নাটক ভালই জমে উঠেছে৷ পুলিশ বাদল চৌধুরীর খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় তল্লাসী শেষে পার্টি অফিসে গিয়ে অনেকটাই নিরূপায় হয়ে গিয়েছিল৷ প্রাক্তন পরিবহণমন্ত্রী মানিক দে সার্চ ওয়ারেন্টের জন্য পুলিশকে নাজেহাল করে দিয়েছিলেন৷ আইনী নানা যুক্তি তর্ক তুলে ধরেও পুলিশ মানিক দে এবং সিপিএম নেতাদের বোঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন৷ পশ্চিম জেলার তিনজন এসডিপিও এবং একজন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটও এদিন সিপিএম নেতাদের কাছে রীতিমতো আত্মসমর্পণ করেছেন বলেই মনে হয়েছে৷ সিপিএম নেতাদের দৃঢ়তার কাছে এদিন পুলিশ পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে৷ তবে, আইন বিশেষজ্ঞদের মতেও এই বিষয়টি নিয়ে দ্বিমত রয়েছে৷ ফলে, সিপিএম নেতৃত্ব নাকি পুলিশ, এদিন আইনী পথে কারা ছিলেন সেই প্রশ্ণ উঠা স্বাভাবিক বলেই মনে হচ্ছে৷ কারণ, একাংশ আইনজীবী মহলের মতে তদন্তাধীন মামলায় পুলিশ অভিযুক্তের খোঁজে সার্চ করতেই পারেন৷ অন্যদিকে, আইনজ্ঞরাই বলছেন সিআরপিসি ধারায় অন্তত ম্যাজিস্ট্রেটের কাছ থেকে অনুমতি না নিয়ে কোথাও সার্চ করা বৈধ নয়৷ এমনকি প্রয়োজনে ওই ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ বিনামূল্যে সম্পত্তির মালিককে প্রদান করতে হবে৷ ফলে এদিনের ঘটনা রাজ্যের ইতিহাসে নজিরবিহীন বললে ভুল হবে না, এমনটাই দাবি তথ্যভিজ্ঞ মহলের৷

