নয়াদিল্লি, ১৯ আগস্ট (আইএএনএস): লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী চাইলে সদ্য সমাপ্ত বাদল অধিবেশনে বিরোধী সাংসদরা সংসদে হট্টগোল ও স্লোগান দিতেন না বলে মন্তব্য করেছেন কেন্দ্রীয় সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু। বুধবার আইএএনএস-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, রাহুল গান্ধীই কংগ্রেসের একমাত্র নেতা যিনি তাঁর দলের সাংসদদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
রিজিজু বলেন, রাহুল গান্ধীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছে এবং ফোনেও কথা হয়েছে। বিরোধী দলনেতা হিসেবে তিনি রাহুল গান্ধীকে যথেষ্ট সম্মান করেন বলেও জানান। তবে সংসদের কাজকর্ম স্বাভাবিক রাখতে সরকারের প্রচেষ্টা সফল হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন, “রাহুল গান্ধী চাইলে কংগ্রেস সাংসদরা হাউসের কার্যক্রম চলাকালীন গালিগালাজ, স্লোগান ও হট্টগোল করতেন না। কংগ্রেসে একমাত্র রাহুল গান্ধীই তাঁর সাংসদদের আচরণ সংশোধন করতে পারেন।”
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে নিয়ে কংগ্রেসের একটি অনুষ্ঠানে করা মন্তব্য প্রসঙ্গে রিজিজু বলেন, কোনও দেশের প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে কথা বলার সময় সম্মান বজায় রাখা উচিত। শীর্ষ সাংবিধানিক বা সরকারি পদকে অসম্মান করলে তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং দেশের জন্যও দুর্নাম বয়ে আনে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘দিমাগি নকশাল’ মন্তব্য প্রসঙ্গে রিজিজু বলেন, যারা দেশের এবং সংবিধানের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়েছে, তাদের প্রায় নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। তবে একই মতাদর্শের কিছু মানুষ এখনও শহর, প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, সেনা, সিআরপিএফ, আইটিবিপি, বিএসএফ, এসএসবি, এনএসজি বা সিআইএসএফের কোনও জওয়ান নকশালদের হাতে নিহত হলে এই ‘মাওবাদী মানসিকতার’ মানুষরা আনন্দ প্রকাশ করে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিরুদ্ধে কথিত অসংসদীয় মন্তব্যের জেরে রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে জারি হওয়া প্রিভিলেজ নোটিস প্রসঙ্গে রিজিজু বলেন, প্রত্যেকেরই প্রতিষ্ঠিত নিয়ম ও পদ্ধতিকে সম্মান করা উচিত। কেউ নিয়ম ভঙ্গ করলে নিয়ম অনুযায়ীই প্রিভিলেজ নোটিস জারি করা হয়।
ইন্ডিয়া জোটের বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা প্রসঙ্গে রিজিজু বলেন, বিরোধী শিবির বর্তমানে কিছুটা বিভক্ত এবং আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগছে। নির্বাচনে জিততে ব্যর্থ হলে তারা সংসদে নিজেদের হতাশা প্রকাশ করে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কংগ্রেস সংসদীয় দলের চেয়ারপার্সন সোনিয়া গান্ধীর ‘বন্দে মাতরম্’-এর পূর্ণ পরিবেশন নিয়ে আপত্তি প্রসঙ্গে রিজিজু বলেন, ‘বন্দে মাতরম্’ কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা ধর্মের গান নয়, এটি জাতীয় সংগীত। প্রত্যেক ভারতীয়েরই তা গাওয়া এবং সম্মান করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাদল অধিবেশনে অমিত শাহ সংসদের কার্যক্রমে অনুপস্থিত ছিলেন বলে বিরোধীদের অভিযোগ প্রসঙ্গে রিজিজু দাবি করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সংসদ চত্বরে থাকতেন। কিন্তু বিরোধীদের হট্টগোলের মধ্যে তাঁর পক্ষে কার্যক্রমে যোগ দেওয়া সম্ভব ছিল না। বিরোধীরা এ বিষয়ে গুজব ছড়াচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ভারতীয় ভূখণ্ডে চিনা অনুপ্রবেশ নিয়ে রাহুল গান্ধীর অভিযোগ প্রসঙ্গে রিজিজু বলেন, এই দাবি সঠিক নয় এবং এমন মন্তব্য করা উচিত নয়। অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় সীমান্ত সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে, তবে তার মূল কারণ বুঝতে হবে বলে জানান তিনি।
রিজিজুর দাবি, অরুণাচল প্রদেশে ভারত ও চিনের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত হয়নি। বহু এলাকায় সীমান্ত স্তম্ভ নেই এবং মাটিতে সুনির্দিষ্ট সীমারেখাও চিহ্নিত করা হয়নি। এই সমস্যা নতুন নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, আগে চিন সীমান্তের দিকে রাস্তা ও পরিকাঠামো তৈরি করলেও ভারতের দিকে পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ ২০১৪ সালের পর জোরদার হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নীতি পরিবর্তন করে সীমান্ত এলাকায় রাস্তা নির্মাণে গুরুত্ব দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর কথায়, তকসিং পর্যন্ত রাস্তা ২০১৯ সালে তৈরি করা হয়।
রিজিজু আরও বলেন, সীমান্তে ভারতীয় সেনা ও আইটিবিপির টহল বাড়ানো হয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। তবে বাংলাদেশ থেকে এসেছে বলে দাবি করে কোনও ভুয়ো ভিডিও ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা সশস্ত্র বাহিনীর মনোবলকে ক্ষতিগ্রস্ত করে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
চিনের অনুপ্রবেশ দেখাতে রাহুল গান্ধী ছবি নিয়ে এসেছিলেন—এই প্রসঙ্গে রিজিজু বলেন, সেনাবাহিনী দেশকে রক্ষা করে। কোনও সেনা জেনারেলকে ‘সড়ক কা গুন্ডা’ বলা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং কংগ্রেসের এ বিষয়ে আত্মসমীক্ষা করা উচিত।
ডিলিমিটেশন বিল নিয়ে রিজিজু বলেন, সরকার কংগ্রেসের সঙ্গে আলোচনা করতে চায়। কংগ্রেসের অবস্থানে পরিবর্তন এসে ইতিবাচক কিছু উঠে এলে বিষয়টি আরও বিবেচনা করা হবে।
কংগ্রেস ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবের মন্তব্য স্বাধীন মতপ্রকাশের আওতায় পড়ে কি না—এই প্রশ্নে রিজিজু বলেন, কোনও ব্যক্তিগত মন্তব্যের ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারবেন না।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, দিপকে আম আদমি পার্টির কর্মী। রাজনৈতিকভাবে পরাজিত হয়ে আপ এ ধরনের কৌশল অবলম্বন করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী মোদি ছাত্রদের উদ্বেগের কথা অবশ্যই শোনেন, তবে বিষয়টিকে রাজনৈতিক রং দেওয়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন রিজিজু।
ভারতে নেপাল বা বাংলাদেশের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে বিরোধীদের মন্তব্য প্রসঙ্গে রিজিজু বলেন, কংগ্রেস বা অন্য কোনও দলের এমন কোনও নেতাকে সমর্থন করা উচিত নয়, যিনি সংবিধানের বিরুদ্ধে কাজ করেন বা দেশে অরাজকতা তৈরির চেষ্টা করেন।



















