কলকাতা,২৫ জানুয়ারি : রবিবার জাতীয় ভোটার দিবস পালনের কর্মসূচি নিয়ে একের পর এক প্রশ্নের মুখে পড়ল নির্বাচন কমিশন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবারও কমিশনকে তীব্র আক্রমণ করেন। তিনি বলেন, “এই দিন উদযাপনের অধিকার নেই কমিশনের। এটি এক ধরনের প্রহসন মনে হচ্ছে।” মমতার অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকারের অঙ্গুলিহেলনে নির্বাচন কমিশন পরিচালিত হচ্ছে, এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে কমিশন ভোটাধিকার লুণ্ঠন করার কাজে ব্যস্ত।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক্স অ্যাকাউন্টে পোস্ট করে লেখেন, “ভারতের নির্বাচন কমিশন আজ জাতীয় ভোটার দিবস পালন করছে এবং সেটিকে একটি করুণ প্রহসনের মতো দেখাচ্ছে।” তিনি কমিশনকে হিজ মাস্টার্স ভয়েস (প্রভুর কণ্ঠ) হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, “কমিশন মানুষের ভোটাধিকার লুণ্ঠন করতে ব্যস্ত। তাদের ঔদ্ধত্য হচ্ছে জাতীয় ভোটার দিবস পালনের— আমি এতে স্তম্ভিত, বিস্মিত, বিচলিত।”
মমতা আরও বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ পালন করার পরিবর্তে কমিশন এখন লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি (তথ্যগত অসঙ্গতি) নামক নতুন অজুহাত তৈরি করছে। মানুষকে অত্যাচার করা হচ্ছে, তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে এবং তাঁদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।”
জাতীয় ভোটার দিবসের কর্মসূচিতে বিএলওদের (বুথ স্তরের আধিকারিক) মৃত্যুর প্রসঙ্গ উঠলে কমিশন প্রশ্নের মুখে পড়ে। সিপিএমের প্রতিনিধি প্রশ্ন তোলেন, “সংবাদমাধ্যমে ১২৬ জন বিএলওর মৃত্যুর খবর আমরা দেখেছি। তাঁদের মৃত্যুতে শোকজ্ঞাপন করে নীরবতা পালন করা গেল না?” এ বিষয়ে তৃণমূল ও কংগ্রেসের প্রতিনিধিরাও সমর্থন জানান।
এর পরেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার মনোজকুমার আগরওয়াল বলেন, “বিএলওদের মৃত্যু নিয়ে আমরা রিপোর্ট চেয়েছিলাম। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনও রিপোর্ট আসেনি। এমনকি, ময়নাতদন্তের রিপোর্টও পাঠানো হয়নি।” তিনি আরও বলেন, “সরকারি ভাবে জেলাশাসক এবং পুলিশের রিপোর্ট আসার কথা। এই বিষয়ে কমিশনকে বলা হয়েছে। আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা রয়েছে, তবে আমাদের কাছে কোনো ফান্ড নেই।”
এছাড়াও, তৃণমূল ও কংগ্রেসের প্রতিনিধি ক্ষতিপূরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। তারা বলেন, “ক্ষতিপূরণের কথা বাদ দিন, কাজ করতে গিয়ে তাঁরা মারা গিয়েছেন। তাঁদের জন্য কি একফোটা চোখের জল ফেলা যেত না?”
উত্তরে সিইও মনোজকুমার আগরওয়াল বলেন, “ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নয়, আমাদের রেকর্ডে তথ্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্যজুড়ে ৯২ হাজার বিএলও রয়েছেন। তাঁদের কিছু হলে আমাদের জানা দরকার।” তিনি বিএলওদের মৃত্যুর তথ্য দিতে বলেন এবং জানান, “বিএলওরা নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তাদের তথ্য জানানো প্রয়োজন।”
কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গেছে, যার বেশিরভাগই মৃত ভোটার। তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সি জানিয়ে দেন, “দেড় কোটি নাম বাদ দেওয়া হতে পারে বলছেন কমিশন।” সিইও মনোজকুমার আগরওয়াল জানান, কমিশন কোথাও দু’কোটি নাম বাদ যাবে এমন কিছু জানায়নি। তবে ৫৮ লক্ষ নাম বাদ দেওয়ার বিষয়ে প্রতিটি বুথে বিএলওদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে এবং রাজনৈতিক দলগুলির বুথ লেভেল এজেন্টদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে।
এছাড়া, লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি নিয়ে কমিশনকে প্রশ্ন তোলা হয়। অতিরিক্ত সিইও দিব্যেন্দু দাস জানান, “তথ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে, এক নামের ব্যক্তিকে ৩৫০ জনের বেশি ভোটার বাবা হিসেবে দেখিয়েছেন, যা অবাস্তব নয়, শুধু পরীক্ষা করা হচ্ছে।”
এদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, নির্বাচন কমিশন একের পর এক ভুল করছে এবং ভারতীয় গণতন্ত্রের ভিত্তিতে আঘাত করছে। তিনি বলেন, “কমিশন তাদের প্রভু বিজেপির হয়ে বিরোধীদের ধ্বংস করতে চাইছে।”
প্রশ্নের মুখে কমিশন, এই দিনের কর্মসূচি বাস্তবে কিছুই অর্জন করতে পারছে না বলে দাবি করেছেন মমতা। আগামী দিনে নির্বাচন কমিশনের নীতির সংস্করণ না হলে তার পরিণতি অশুভ হতে পারে, এমনটাই আশঙ্কা করেছেন রাজনৈতিক মহল।

